২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসবে, যার মধ্যে ব্যয়সাশ্রয়ী বাজেট ও দক্ষভাবে বাজেট বাস্তবায়নের প্রত্যাশাও ছিল। বিশেষ করে সরকারি ব্যয়ে লাগাম টেনে, অপচয় কমিয়ে এনে জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ ব্যয়কে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। কিন্তু এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের বাজেট বাস্তবায়নের তথ্যে।

অর্থ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়কৃত অর্থের প্রায় ৮৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে। বিপরীতে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫৭ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৩ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারণী মহলের একটি বড় অংশ সরকারি ব্যয়ের লাগাম টানার সুপারিশ করে আসছিলেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে তৎকালীন সরকারকে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। সে সময় বাজেট বক্তৃতায়ও রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং বৈষম্যহীন কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সে দর্শনের সঙ্গে বাজেট ব্যয় কাঠামোর একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে।

প্রথম নয় মাসে পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এটি শুধু একটি ব্যয়ের খাত নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কারণ ঋণের সুদ এমন একটি ব্যয়, যা অর্থনীতিতে নতুন উৎপাদন, কর্মসংস্থান বা সম্পদ সৃষ্টি করে না। বরং অতীতের দায় পরিশোধে বর্তমান সম্পদ ব্যয় করতে হয়। ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক খাতের জন্য আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে।

এর বিপরীতও ঘটতে পারত, যদি রাজস্ব আয় ক্রমেই বাড়ানো যেত। কিন্তু একদিকে পরিচালন ব্যয়ের আধিক্য, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা বাজেট বাস্তবায়ন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ লাখ কোটিরও বেশি কম হয়েছে। ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রভাবিত করার বড় একটি কারণ। এমনিতেই ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি একপ্রকার স্থবির হয়ে আছে। উপরন্তু সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের অর্থায়নের সুযোগ আরো সংকুচিত করেছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোয় বজায় আছে। অন্যদিকে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। প্রতি বছরই দেখা যায় অর্থবছরের প্রথম দিকে ব্যয়ের গতি ধীর থাকে এবং শেষ প্রান্তিকে এসে ব্যয়ের হিড়িক পড়ে যায়। এবারো নয় মাসে মোট বাজেটের মাত্র ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হওয়ায় শেষ তিন মাসে ৩ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যয়ের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় তখন কার্যকারিতার চেয়ে বরাদ্দ ব্যয়কে কেবল বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।

চলতি অর্থবছরের প্রায় শেষ দিকে এসে দেশের শাসনভার নিয়েছে বিএনপি সরকার। তাই চলতি অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের ভারও এ সরকারের ওপর বর্তায় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত হবে সামনে পরিচালন ব্যয়সাশ্রয়ী বাজেট নেয়া। বাজেট বাস্তবায়নের ধীরগতি, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয়ের আধিক্য এবং রাজস্ব ঘাটতি কোনো এক বছরের সমস্যা নয়। এগুলো দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। ফলে আগামী বাজেট প্রণয়নের সময় এ বাস্তবতাগুলোকে কেন্দ্র করেই সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশেষ করে পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সাশ্রয়ী হতে হবে। এজন্য ব্যয়ের খাতগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় ক্রয়, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অপচয় ও দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধে কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রতিটি টাকার বিপরীতে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, সেটিকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে।

একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। কারণ রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে শুধু ঋণনির্ভর ব্যয় বাড়ানো হলে সুদ পরিশোধের বোঝা আরো বাড়বে। এতে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সরকারি সেবা খাতে ব্যয় বাড়লে সেটি চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে। তাতে সমাজে বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভবিষ্যৎ বাজেট হতে হবে জনকল্যাণমুখী। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি দিচ্ছে জনগণের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষার জন্য। এগুলো বাস্তবায়নেও দক্ষভাবে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হলে বাজেট আকারে বড় হওয়ার চেয়ে সাশ্রয়ী ও ফলাফলনির্ভর হওয়া জরুরি। তাই বাজেট ব্যয় ও রাজস্ব আয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। এটি না হলে অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানো সম্ভব হবে না। আগামী বছরগুলোয় অর্থনীতি আরো বহুমাত্রিক চাপের মুখে পড়বে।