সুইস ব্যাংক সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে। সুইস ব্যাংকে কারো অ্যাকাউন্ট আছে শুনলেই ব্যাপারটি অনেক অভিজাত বলে মনে হয়। প্রথমেই বলে রাখা ভালো, সুইস ব্যাংক বলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক নেই। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং নীতিমালার অধীনে পরিচালিত তিন শতাধিক ব্যাংক মিলেই সুইস ব্যাংক নামে অভিহিত। সুইস শব্দটি এসেছে সুইজারল্যান্ড থেকে। সুইস ব্যাংক হলো সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি ব্যাংকিং সিস্টেম। মূলত গোপনীয়তা রক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সুইস ব্যাংক সারা বিশ্বে জনপ্রিয়।

সুইস ব্যাংকগুলো সাধারণত আর্থিক কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে প্রকারভেদে কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন ইউনিভার্সাল ব্যাংক, প্রাইভেট ব্যাংক, রিটেইল ব্যাংক, ক্যান্টন ব্যাংক ইত্যাদি।

ইউনিভার্সাল ব্যাংক: এ ব্যাংকগুলো সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত। এগুলো রিটেইল ব্যাংকিং, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং, করপোরেট ব্যাংকিং, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টসহ একটি বিস্তৃত ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকে।

প্রাইভেট ব্যাংক: এগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক বিত্তশালী গ্রাহকদের বিনিয়োগ পরামর্শ প্রদান, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, এস্টেট পরিকল্পনা, আর্থিক সমস্যার সমাধান ইত্যাদি সেবা দিয়ে থাকে।

রিটেইল ব্যাংক: খুচরা বা রিটেইল ব্যাংকগুলো সাধারণ জনগণকে পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট, সেভিংস অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড ও অন্যান্য মৌলিক ব্যাংকিং সেবাগুলো দিয়ে থাকে।

ক্যান্টন ব্যাংক: এ ধরনের ব্যাংকগুলো সাধারণত বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকিং সেবা দিয়ে সাহায্য করে এবং অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম টাকা নির্ভর করে কোন ব্যাংকে এবং কোন ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলা হবে তার ওপর। সুইজারল্যান্ডের নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম জমার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বিদেশী নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম আমানত জমা রাখতে হয় এবং তা তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে। সুইস ব্যাংকগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, গ্রাহকদের গোপনীয়তা রক্ষা করা আর এজন্যই বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও সম্মানিত ব্যাংকিং গন্তব্য হিসেবে সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয়।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা নগরীতে জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স (দ্য গ্লোবাল কম্পেক্ট লিডার্স’ সামিট) উপলক্ষে দেশটি ভ্রমণ করি। আর তখনই তাদের অর্থনীতি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় আমার। সুইজারল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত একটি ছোট রাষ্ট্র, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত নয়। সুইজারল্যান্ডের মুদ্রার নাম সুইস ফ্রাংক। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে স্থিতিশীল মুদ্রা। অর্থাৎ সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি পৃথিবীর অন্যতম স্থিতিশীল অর্থনীতি। দেশটির রাজনৈতিক অবস্থাও খুব ভারসাম্যমূলক ও সুস্থির। সুইস সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি এর রাষ্ট্রপতি পরিবর্তিত হয়। ছয় বছরের জন্য গঠিত মন্ত্রিপরিষদের একজন মন্ত্রী পালাক্রমে এক বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব প্রতিপালন করেন।

সুইজারল্যান্ড কখনো কোনো যুদ্ধে জড়ায় না, নিরপেক্ষ থাকার ব্যাপারেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর এজন্যই রাষ্ট্রটিকে অত্যন্ত নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই ব্যাংক ব্যবস্থাও এখানে খুব নিরাপদ। গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ করার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা থাকায় সারা বিশ্বের ধনীদের অর্থ জমানোর জনপ্রিয় উৎস হলো সুইস ব্যাংক। বিশ্বের নানা দেশের রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে বহু বিত্তশালী ব্যক্তি সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হলো, অনেকেই গোপনীয়ভাবে টাকা রাখতে গিয়ে তার পরিবারের কাছেও সুইস ব্যাংক-বিষয়ক কোনো তথ্য দেন না। ফলে এমন ব্যক্তির মৃত্যুর পর কেউ জানতেই পারে না যে তার সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে। সে দেশের নিয়ম অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি কোনো উত্তরাধিকারী সম্পত্তি দাবি না করেন তবে সুইস সরকার সে সম্পত্তি তাদের কোষাগারে জমা করেন।

ফিলিপাইনের একসময়ের প্রভাবশালী শাসক মার্কোস তীব্র গণআন্দোলনের মুখে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ক্ষমতা ছাড়ার আগে ফিলিপাইন থেকে মোটা অংকের ডলার সুইস ব্যাংকে পাচার করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর এসব ডলার সুইজারল্যান্ডের সরকারি কোষাগারে চলে যায়। একইভাবে লিবিয়ার তৎকালীন শাসক গাদ্দাফি ও মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে।

সরকারিভাবে সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীরা সুইস নামে পরিচিত। রাজধানী বার্ন। অন্যতম দুটি শহর হলো জেনেভা ও জুরিখ। আল্পস পর্বতমালা ও প্রশস্ত হ্রদ সুইজারল্যান্ডকে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভূষিত করেছে। বিশ্বের পর্যটকদের জন্য এটি একটি অন্যতম আকর্ষণীয় দেশ।

সুইজারল্যান্ডে সুইস ব্যাংক ছাড়াও আরেক ধরনের ব্যাংক রয়েছে যার নাম ‘টাইম ব্যাংক’। বিশ্বের আর কোথাও এ ধরনের ব্যাংক আছে বলে আমার জানা নেই। সুইজারল্যান্ডের এ টাইম ব্যাংকিং সিস্টেম আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। ব্লাড ব্যাংকের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। টাইম ব্যাংক অনেকটাই ব্লাড ব্যাংকের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। ব্লাড ব্যাংকে যেমন ব্লাড সংরক্ষণ করা হয় বা জমা রাখা হয়, ওই একইভাবে টাইম ব্যাংকেও টাইম জমা রাখা হয়।

টাইম ব্যাংক মূলত: সুইস ফেডারেল মিনিস্ট্রি অব সোশ্যাল সিকিউরিটি কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি অবসরকালীন ভাতা প্রকল্প। এতে কম বয়সীরা কর্মক্ষম অবস্থায় নিজেদের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অসুস্থ বয়স্ক মানুষকে যতটা সময় ধরে সেবা প্রদান করেন সেই সময়টা টাইম ব্যাংকে জমা থাকে। যেমন বয়স্ক মানুষের জন্য বাজারঘাট করা, ঘরদোর পরিষ্কার করা, তার জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, তাকে রোদে নিয়ে যাওয়া, তার সঙ্গে গল্প করা ইত্যাদি যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘‌ওল্ড অ্যাজ সাপোর্ট’।

টাকা-পয়সার মতো টাইম জমিয়ে রাখার লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বেশির ভাগ মানুষ সে দেশের টাইম ব্যাংকে সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাকাউন্ট বা টাইম ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন। আর এই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ওই ব্যাংক তাকে ‘‌টাইম ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড’ ইস্যু করেন যা দ্বারা তিনি পরবর্তী সময়ে বার্ধক্য সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

সুইজারল্যান্ড ধনী দেশ। আর তাই অবসরকালীন তাদের পেনশনও বেশ ভালো। শেষ বয়সে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের তেমন একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও বার্ধক্যের সময়টা তারা আরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে টাইম ব্যাংকে টাইম জমান। সেবা প্রদানকারী ব্যক্তি যখন নিজেও বয়োবৃদ্ধ হবেন, আগের মতো নড়াচড়া করতে পারবেন না, তখন তার ক্রেডিট কার্ডের রেফারেন্স দিয়ে টাইম ব্যাংককে দরখাস্ত করলেই তাকে দেখভাল করার জন্য তারা সেবা কর্মী পাঠাবেন। সুইজারল্যান্ডে টাইম ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করে সেখানকার বার্ধক্য সেবা প্রদান প্রকল্প দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে সে দেশের মানুষের অবসরকালীন খরচ কমার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সামাজিক সমস্যারও সমাধান হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু যে হারে বেড়েছে, সে হারে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার বয়স বাড়েনি। ফলে অনেককেই শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্ত থাকার পরও অবসরকালীন বাসায় বসে বেকার সময় কাটাতে হয়। এমনকি দেখা যায় অনেকের সন্তানরা বিদেশে বসবাসের কারণে তারা আরো একাকিত্বে ভোগেন। অনেকের সঙ্গী মারা যাওয়ার কারণেও একা হয়ে পড়েন। ফলে তাদের সময় কাটানো যেন একটা বিশাল কষ্টের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তাই তাদের নিঃসঙ্গ জীবন হয়ে ওঠে যন্ত্রণাদায়ক ও অস্বস্তিকর। এ ধরনের ব্যক্তি সংসারে ও সমাজে নিজেকে অপাঙ্‌ক্তেয় ভাবতে শুরু করেন।

যেহেতু গড় আয়ু বাড়ছে, সেহেতু অনেকেই অবসরে যাওয়ার পর অন্য কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত করতে চান। কেউ কেউ হয়তো পেয়েও যান, আবার অনেকেই কাজ পান না। যারা কাজে থাকেন তারা সুস্থ থাকেন, যারা একেবারেই কাজে থাকেন না তাদের অনেকেই ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর তখনই প্রয়োজন হয় সেবাশুশ্রূষার। তাই তো বর্তমান সময়ে একটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে ‘টাইম ব্যাংক’, যেখানে টাকার মতো সময় জমা রাখা যায় এবং প্রয়োজনে সময়কে ব্যবহার করা যায়। এমন ধারণা থেকেই সুইজারল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে টাইম ব্যাংক। মূলত বয়স্ক মানুষের কথা চিন্তা করেই নির্মিত হয়েছে এ ব্যাংক।

এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে বার্ধক্যের হার ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি ১০ জন লোকের মধ্যে একজন বৃদ্ধ। ২০৫০ সালের পর প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন বৃদ্ধ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।৷ সুইজারল্যান্ড সেই সময়ের কথা মাথায় রেখেই এ অভিনব পদ্ধতি চালু করে। বর্তমান যুগে এ পৃথিবীতে এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের মানবিক প্রকল্প গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিশেষভাবে বার্ধক্যকালীন সেবা একদিকে যেমন কার্যকর হতে পারে, ঠিক একইভাবে খুলে যেতে পারে বার্ধক্যদের সাহায্যের দুয়ার।

ড. ইউসুফ খান: সাবেক ব্যাংকার ও চেয়ারপারসন, ব্যুরো বাংলাদেশ