গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এ কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে হলে জনপ্রশাসন এবং পুলিশের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা অপরিহার্য। স্বাধীন পুলিশ ও জনপ্রশাসন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের পেশাগত আচরণ বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয় না। এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ সম্ভব ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে জনপ্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা বরাবরই বিতর্কিত। বিশেষত বিগত সরকারের শাসনামলে জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তারা জনগণের সেবক না হয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের সহযোগী হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদী কাঠামো টিকিয়ে রাখতে তারা তৎপর ছিল। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে জনগণের প্রত্যাশা ছিল জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে আমূল সংস্কার হবে। এ লক্ষ্যে জনপ্রশাসনে সংস্কার আনতে অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের। পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশনগুলো পাঁচ-ছয় মাস আগে সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী সংস্কারে গঠিত কমিশনের কোনো মৌলিক সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। বরং নির্বাচন ও সংস্কারের নানা ডামাডোলে এ দুই প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মৌলিক দাবি চাপা পড়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জনপ্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার ছাড়া সরকারের ফ্যাসিবাদ দমনের চেষ্টা সফল হবে না। কারণ ফ্যাসিবাদী সরকার তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জনপ্রশাসন ও পুলিশকেই ব্যবহার করে থাকে। এ দুই প্রতিষ্ঠান যদি সংস্কার না করা হয়, তাহলে তারা ফ্যাসিবাদী সরকারের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করতে থাকবে। জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে তারা ক্ষমতাসীনদের সহযোগী হয়ে জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালাবে। জনপ্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার বিলম্বিত হলে জনবান্ধব, জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ প্রশাসন ও পুলিশ গঠন সম্ভব হবে না, বরং গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়া আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। এমনকি সরকারের অন্যান্য উদ্যোগও কার্যকর ফল দেবে না। তাই ফ্যাসিবাদ দমনে জনপ্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করার ঘোষণা দেয়। এ সরকার যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে তার মধ্যে দুটি হচ্ছে ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন’ ও ‘পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন’। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন শতাধিক সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটির সংস্কার প্রস্তাবগুলোর লক্ষ্য ছিল জনপ্রশাসনকে জনমুখী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা। যদিও এ প্রতিবেদন জমা পড়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো মৌলিক কোনো সুপারিশেরই বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে বিগত সরকারের ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান কিংবা বিরোধী মতের মানুষকে দমন-পীড়নে বড় ভূমিকায় ছিল পুলিশ বাহিনী। গত বছরের গণ-আন্দোলনে সারা দেশেই পুলিশ সদস্যরা এবং তাদের স্থাপনাগুলো ব্যাপক মাত্রায় জনরোষের শিকার হয়। পুলিশকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে গত ১৫ জানুয়ারি সংস্কার প্রস্তাব, সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রায় ছয় মাসেও পুলিশে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি।
গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো সময়মতো সুপারিশ দিলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব আরো শক্তিশালী হয়েছে। পুলিশ ও জনপ্রশাসন রাজনীতিকীকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। পুলিশ সংস্কারে আংশিক অগ্রগতি থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব, বিশেষ করে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এখনো ঝুলে আছে। এতে প্রশাসন ও পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরছে না।
বিগত সরকারের সময়ে দেশের জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ভোটারবিহীন নির্বাচন, বিরোধী রাজনৈতিক মত দমন ও বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি নিপীড়ন পুলিশের প্রতি জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। সরকারের অনুগত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দলীয় স্বার্থরক্ষা করেছেন, যা এ দুই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এছাড়া প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকাণ্ডে জবাবদিহির অভাব রয়েছে। হেফাজতে নির্যাতন, বেআইনি গ্রেফতার, গুম এবং মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার—এ সবই ছিল পুলিশের ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’র ফল। জনপ্রশাসনেও একইভাবে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনসেবায় অনাগ্রহ বিদ্যমান। সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো গঠন না করা গেলে এ প্রবণতা আরো বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে।
বর্তমানে সচিবালয়কেন্দ্রিক প্রশাসনের যে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন চলছে, তা জনপ্রশাসনের সংস্কারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘সিনিয়র সচিব’ পদমর্যাদার মতো সুবিধা ধরে রেখে বিগত সরকারের সময়কার প্রশাসনিক প্রভাব আজও বহাল রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সংস্কার উদ্যোগকে বারবার আটকে দিয়েছে। বাস্তবতা হলো, কোনো সরকারই এ বলয়ের বাইরে যেতে চায় না। ফলে প্রশাসনিক সংস্কার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন কখনো গড়ে উঠবে না।
শুধু কাঠামোগত সংস্কার নয়, পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। পুলিশের শৃঙ্খলাগত ও নীতিগত বিষয় সংস্কার করা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে পুলিশকে বের করে আনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে পারলে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। মানুষ এমন একটি কাঠামোর প্রত্যাশা করে যেখানে জনগণ ও পুলিশের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে ও পারস্পরিক আস্থা গড়ে উঠবে। যেহেতু গণতন্ত্রে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, তাই পুলিশকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এভাবেই একটি দায়িত্বশীল, মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পুলিশ ও প্রশাসন জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কাজ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের মেলবন্ধন হয়েছে, তা জনবিচ্ছিন্ন এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি তৈরি করেছে। এ সংস্কৃতির অবসান ও টেকসই গণতন্ত্রের ভিত গড়তে হলে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য। তা না হলে ভবিষ্যতেও যেকোনো রাজনৈতিক সরকার এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে, আর জনগণ বঞ্চিত থাকবে ন্যায্য সেবা ও সুবিচার থেকে।
বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের বাস্তবায়ন করতে হলে জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার অনিবার্য। শুধু উপসর্গের চিকিৎসা নয়, শিকড়ে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন। এর জন্য চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ও জনমুখী নীতিকাঠামোর বাস্তবায়ন। এ সংস্কার এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।










