ওনারা আসলে অতীত থেকে শিক্ষা নেননি। আবারো এক যুদ্ধবাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একটি সার্বভৌম দেশকে হাঁটু গেড়ে বসাতে চেয়েছেন। আবারো মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত দাবি ছড়িয়েরও হামলার পক্ষে সাফাই হামলার পক্ষে সাফাই গাইছেন। এ ধরনের কূটনীতি আসলে পরিকল্পিত আগ্রাসনকে আড়াল করছে মাত্র। হামলার আগে মিত্রদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন ও জনমতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এ হামলার গণতান্ত্রিক সম্মতিও নেই। অতীতের আগ্রাসী অনেক হামলার মতো এবারো সফলতার স্পষ্ট লক্ষ্য নেই, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেই।
অতীতের যেকোনো সময়ের মতো এবারো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নতুন ও বিধ্বংসী এ আগ্রাসনের ফল তাৎক্ষণিক। বিস্তৃত পরিসরে ছড়াবে অরাজকতা। বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর হার বাড়বে, অনেক শিশু হবে অনাথ, অনেক পরিবার হবে বিপর্যস্ত। পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। তাদের প্রত্যুত্তর হিজবুল্লাহ ও হুথি মিত্রদের সমর্থন পেতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়বে, গোটা বিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজারে আতঙ্ক ছড়াবে। আবার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নতুন করে ঘৃণার জন্ম নেবে, সন্ত্রাসবাদী প্রতিশোধের বীজ বপন হবে। তাতে পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুরা আনন্দিত হবে। এতকিছুর পরও স্থায়ী কোনো ইতিবাচক ফল আসবে না। আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যর্থ হস্তক্ষেপের ফলও ছিল এমনই তিক্ত। আজ সেই ঝড়ের মুখে তেহরান।
বিষয়টি রীতিমতো হতাশাজনক। অতীত থেকে যে শিক্ষা নেয়া হয়নি, এ বিষয়টি অমার্জনীয়। বিস্ময়কর সত্য হলো, একুশ শতকে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনো মনে করেন বন্দুকের নল দেখিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা কার্যকর, গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিক। কীসের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন আচরণ করে?
২০০৩ সালে ইরাকে জর্জ ডব্লিউ বুশের আক্রমণের নির্দেশের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান অবরোধের বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। দুটো ঘটনাই ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৫৩ সালের সিআইএ নেতৃত্বাধীন ইরান অভ্যুত্থান পর্যন্ত ব্যর্থ ও ব্যয়বহুল মার্কিন হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। ট্রাম্প বিদেশে অযথা যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, যারা এমনটি ভাবেন তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদী অহংকারের ইতিহাস দেখে নিতে পারেন। সেদিক থেকে ট্রাম্প অতীতের কর্তৃত্ববাদীদেরই উত্তরসূরি।
ট্রাম্প একটু ভিন্ন কারণ তিনি ‘স্বাধীনতা রক্ষা’র মতো প্রচলিত অজুহাত বেশি ব্যবহার করেন না। ভেনিজুয়েলায় হামলার সময় তিনি খোলাখুলি বলেছিলেন, তিনি তেলের দখল চান। এ পার্থক্য থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে অতীতের অনেকের মিল পাওয়া যায়। বুশের মতো ট্রাম্পও মিথ্যার ভিত্তিতে সংকট তৈরি করেছেন এবং নিজেই তার ফাঁদে পড়েছেন। গত বছর ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার দাবি করেছিলেন। এখন সেই দাবির ভারে তিনি নিজেই বন্দি। বুশ ও টনি ব্লেয়ার যেমনটি করেছিলেন, ট্রাম্পও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি এ বিষয়টিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জাহির করছেন। ভিত্তিহীনভাবে তিনি দাবি করছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘শিগগিরই’ মার্কিন ভূখণ্ডে পৌঁছতে পারে। তার এ দাবি সাদ্দাম হোসেনের কথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে মার্কিন ও ব্রিটিশ রাজনীতিকদের ওই মিথ্যা দাবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ইসরায়েলের ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’র দাবিও বিভ্রান্তিকর। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এবার ইরান আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বরং গত জুনে দেশটির ওপর ভয়াবহ হামলার পর শান্তি বজায় রাখতে ইরান মরিয়া ছিল। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান বারবার পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তবতা আসলে উল্টো। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দায়িত্বশীল প্রত্যেকেই গত ২০ বছর ধরে প্রকাশ্যে জানিয়ে আসছেন, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় না। ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, ‘ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের পরিদর্শক কিংবা ইসরায়েলের কট্টর নেতা বেনয়ামিন নেতানিয়াহু, এদের কেউই ইরানে পারমাণবিক বোমা তৈরি হচ্ছে এমন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
এবার হামলার আগে ট্রাম্প তার লক্ষ্য স্পষ্ট করেননি। তবে আরব ও ইউরোপীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ভেঙে দেয়া (অথবা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ) এবং আঞ্চলিক মিত্র শক্তিগুলোকে নির্মূল করার বিষয়ে ট্রাম্প অতীতে যেসব দাবি করেছিলেন সেগুলো এখন অসার মনে হচ্ছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু একটি সত্য বলেন না। ইরানে যদি সরকারকে সরাতেই হয় তাহলে ইরাক ও আফগানিস্তানের মতোই স্থলসেনা পাঠাতে হবে। সেখানে বহুদিন বিদেশী দখল থাকবে। আবার দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ছাড়াই বা কীভাবে ইরানকে সরকার পতনের পর স্থিতিশীল রাখা যাবে তাও স্পষ্ট করে ট্রাম্প বলছেন না। এখানে অতীতের আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা জরুরি। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ইরাকিদের বিদ্রোহে উৎসাহ দিলে সাদ্দামের বাহিনী শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। ইরানেও এমন কিছু হবে না তার নিশ্চয়তা কী? ট্রাম্প বলেছেন, ‘এটাই হয়তো দীর্ঘ প্রজন্মের ইতিহাসে তোমাদের সামনে থাকা সুবর্ণ সুযোগ।’
প্রশ্ন হলো অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা কেন ইরানের বিষয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেননি? তার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ আছে। কারণ এটি সফলতা নয় বরং অরাজকতা ও ধ্বংসের আমন্ত্রণ। এতে ইরান ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়বে। এমন হলে দায় ট্রাম্পেরই। এ হামলার পর বারাক ওবামার সাবেক উপদেষ্টা বেন রোডস লিখেছেন, ‘ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য আরো বড় বিপদ। তিনি আমেরিকার অতীতের সবচেয়ে খারাপ প্রবণতাগুলোর প্রতিফলন। আমেরিকার আত্মম্ভরী ব্যতিক্রমবাদ আবারো মাথাচাড়া দিচ্ছে।’ রোডস প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কীসের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যা তাদের আধিপত্য মানতে চায় না?’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আবারো প্রয়োজনের ভেকে আগ্রাসনের এক নতুন পর্বে প্রবেশ করছি।’ ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্প গোপনে হামলার পরিকল্পনা নিয়েছেন। জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনা ছিল প্রহসন। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য ঘোষণা করার পর সহজে থামবেন, এমন লক্ষণ আপাতত নেই। থামলে এ অন্যায্য হামলার ব্যর্থতা স্বীকার করতে হবে। ট্রাম্প আসলে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময়কার মার্কিন অপমানের প্রতিশোধ নিতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটি ‘জয়’ চান। একই সঙ্গে ইসরায়েলের দেয়া শর্তে ইরানবিরোধী কট্টরপন্থী নেতানিয়াহুকে স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে চান। এ বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ যে কোথায় শেষ হবে তা এখন আর স্পষ্ট নয়।
বোমা হামলা করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে পশ্চিমবিরোধী মনোভাবও দূর করা যায় না। খামেনির উত্তরসূরিরা ক্ষমতায় থাকলে দমননীতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা চলতেই থাকবে। তবু এখনো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি গড়ার সুযোগ আছে। গণতন্ত্র, স্বনিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত অধিকার ও নৈতিকতার ধারণা ট্রাম্পের মতো নিয়ন্ত্রণপন্থী শাসকদের অপছন্দ হতে পারে। কিন্তু দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের কাছ থেকে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য চান। নিজ দেশের নাগরিকদের কাছ থেকেও তিনি একই ভীতিপ্রদ আনুগত্য আশা করেন। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারেননি। একই কথা ইরানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ দুই ভূখণ্ডের মানুষেরই সাধারণ শত্রু স্বৈরাচার। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। এসব বিবেচনায় এ মুহূর্তে যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই।
স্বত্ব: দ্য গার্ডিয়ান
সাইমন টিসডল: ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কূটনীতিবিষয়ক লেখক। এর আগে তিনি একই পত্রিকায় আন্তর্জাতিক বিভাগের সম্পাদক এবং যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন










