এ প্রযুক্তিগুলোর যথাযথ ব্যবহার আইসিটি সংস্কার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ দেবে। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পর্যাপ্ত অটোমেশন হলে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আর্থ-প্রশাসনিক ব্যবস্থা আইন-কানুন প্রণয়ন সংশোধনকল্পে, কর্মপদ্ধতি পরিবেশ আধুনিকায়নের নিমিত্তে গৃহীত হয়েছে বেশকিছু সংস্কার প্রকল্প। এসব সংস্কার প্রকল্পে সূচিত আধুনিকায়ন প্রয়াস বিশেষ করে অটোমেশন কতটা কার্যকর হয়েছে সে ব্যাপারে পর্যালোচনা বিচার বিশ্লেষণ প্রয়োজন হওয়াই স্বাভাবিক। এ ধরনের তাগিদ থেকে এনবিআরের সংস্কার প্রকল্পগুলো সম্পর্কে গণমাধ্যমে শিরোনাম দেখি, ‘সংস্কারের বেড়াজালে আটকা পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)’, ‘একের পর এক সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হলেও সে সফলতা নেই’ ইত্যাদি। বিশ্লেষণ এই যে গত তিন দশকের অধিককালে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার বা অটোমেশন প্রকল্প বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে এসব কর্মসূচি বাস্তবসম্মত ছিল না।

এখনো দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে পরিপূর্ণভাবে অটোমেশনের আওতায় আনা যায়নি এবং এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের অভাব রয়েছে। আবার অটোমেশনের বিষয়ে উদ্যোগ থাকলেও কার্যকর কিংবা টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতাও দেখা যায়নি। পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অভাব রয়েছে। এজন্য প্রকল্পগুলোকে স্থায়ী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের আঙ্গিকে নিয়ে আসা যায়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে শক্তিশালী করতে ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার নয়টি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এসব সংস্কার প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল এনবিআরকে একটি আধুনিক ও দক্ষ সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা। এনবিআরের সংস্কারসহ অটোমেশনের অর্থ হচ্ছে শুল্কায়ন ও করারোপের ক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন, করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃজন, কর প্রদান অটোমেশন কিংবা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে কর পরিশোধ প্রক্রিয়া ও শুল্কায়ন সহজীকরণ, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে গতিশীলতা আনয়ন, স্বেচ্ছাক্ষমতার যৌক্তিক প্রয়োগ ও জবাবদিহির পরিস্থিতিকে স্বচ্ছ করা। এসব লক্ষ্য অর্জনে নব্বই দশক থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বিভিন্ন নাম-শিরোনামে আজও চলছে। এ কথা মানতে হবে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট। বিগত সময়ে একটানা প্রায় ২৫ বছরে মাঠ পর্যায়ে জনবল নিয়োগ হয়নি। সংস্কার প্রকল্পগুলোর আওতায় উদ্ভাবিত বা সুপারিশকৃত কর্মপদ্ধতি বা প্রক্রিয়া জনবল সংকটের কারণে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি বা যাচ্ছে না এ কথাও যেমন ঠিক তেমনি এটাও ঠিক সংস্কার কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রার নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই পরিবর্তন নিশ্চিতকরণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও নিয়ন্ত্রকের ঘন ঘন পরিবর্তনও এর জন্য কমবেশি দায়ী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষেও প্রকল্পের ঈপ্সিত সংস্কার কার্যক্রমের যথাযথ মালিকানা আরোপ করা যায়নি। প্রকল্প শেষ তো যেন দায়িত্ব শেষ, ভাবনা শেষ। প্রকল্প পরামর্শকের সুপারিশ কিংবা উদ্ভাবিত সফটওয়্যার ব্যবহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা প্রয়োগ প্রবর্তন করার ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় সেগুলো লাপাত্তা হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রকল্পে যেটা দেখা যায় প্রকল্পের টাকায় প্রশিক্ষণ নেয়া ও দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের প্রকল্পের সুপারিশ বাস্তবায়নকালে যথাস্থানে পাওয়া যায় না। এটা সর্বজনস্বীকৃত যে সংস্কার সবার পছন্দের বিষয়ও নয়, ফলে মালিকানা নিয়ে যে সংশয় কিংবা অনাগ্রহ, বাংলাদেশের আর দশটার মতো এনবিআরের সংস্কার প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও কমবেশি তাই ঘটেছে।

সংস্কারের এ বিদ্যমান অবস্থার জন্য দাতাসংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের বিষয়টিও পর্যালোচনাযোগ্য। কেননা দাতাদের প্রেসক্রিপশনেই গ্রহণ করা সংস্কার প্রকল্পগুলোয় অনেক ক্ষেত্রে দাতাদের মনোভাবই প্রাধান্য পেয়েছে, দেশের বা এনবিআরের স্বার্থানুকূল না হয়েও। দাতাদের পরামর্শে নেয়া সংস্কার কর্মসূচির বেশকিছু সুপারিশ হয়তো কোনো কাজে আসেনি কিংবা পরে পিছু হটতে হয়েছে। অথচ সংস্কারের সুপারিশ আসা উচিত ছিল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, আমাদের সংস্কৃতি, পরিবেশ, বাস্তবায়ন যোগ্যতা বিবেচনা, প্রয়োজনের নিরিখে। এ মুহূর্তে রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার জরুরি। এর অধীনে সব বিভাগকে অটোমেশন না করলে কাজের দক্ষতা বাড়বে না, অনলাইনে না গেলে কর রাজস্ব আহরণে গতি আসবে না। কর বা শুল্ক আইনগুলো যুগোপযোগী সংশোধন করা না গেলে তা বাস্তবায়নের সুফল মিলবে না। বিভিন্ন সংস্কার প্রকল্পে বেশির ভাগ অর্থ খরচ হয়েছে পরামর্শক নিয়োগে। বাকি অর্থ খরচ করা হয়েছে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও লজিস্টিক কেনাকাটা ও প্রশিক্ষণে। প্রকল্প শেষ হতে হতে হার্ডওয়্যার ব্যবহার অনুপযোগী, সফটওয়্যার সেকেলে আর লজিস্টিক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায় আর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী পদায়িত হয়ে চলে যান ভিন্ন কাজে।

রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হলো রাজস্ব। নিরাপদ, স্বচ্ছ ও গতিশীল রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা বহুগুণে বাড়াতে সক্ষম। এতে স্বল্পসময়ে ও নিখুঁতভাবে অধিক রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব। তাই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব আহরণে তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন গৃহীত অটোমেশন প্রকল্পগুলোর প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল এসব প্রকল্পের অধীনে অনেক পাবলিকের টাকা খরচ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা এসব প্রকল্পে ঋণ/অনুদান দিয়েছে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে এ সংস্থাগুলো কখনই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে পরামর্শ কিংবা এ বিষয়ে আর্থিক সহায়তা দেয়নি। যদিও প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় তাদের ওপরও বর্তায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্ট দাতাসংস্থার কাছে প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ বের করার জন্য অনুদান হিসেবে আর্থিক সহায়তা চাইতে পারে। নতুন করে দাতাসংস্থার কাছ থেকে ঋণ/অনুদান গ্রহণ কিংবা নতুন প্রকল্পের শুরুর আগে অতীতের প্রকল্পের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জনগণের অর্থের অপচয় হয়।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নীতি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এ অটোমেশনের সঙ্গে সমন্বিত অবস্থায় পেতে গেলে একটি জাতীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ‌এরই মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে যেসব উদ্যোগ বা কার্যক্রম নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে তাদের ফলাবর্তনকে এ জাতীয় প্রকল্পের আওতার মধ্যে সংযুক্তকরণ প্রয়োজন হবে। অধিকন্তু অন্য যেসব কার্যক্রম, উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব পদ্ধতির উন্নয়ন প্রয়োজন হবে সেগুলোকে এ জাতীয় প্রকল্প যৌথভাবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নীতি বিভাগ বাস্তবায়ন করবে। বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো শনাক্তকরণকালে লক্ষ করা গেছে যে এর আগেকার বিক্ষিপ্ত প্রকল্পগুলোয় দাতাসংস্থার অর্থ বিনিয়োগ শর্ত মোতাবেক বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও ভেন্ডরের দ্বারা বাস্তবায়নকালে প্রায় ক্ষেত্রেই তা আটকে গেছে বা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এনবিআর সংস্কার-সংক্রান্ত দুটি কমিটির সুপারিশ প্রতিবেদনে যে ধরনের জাতীয় প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে তা বাস্তবায়নে দাতাসংস্থার অর্থায়ন প্রয়োজন হতে পারে। তবে সে অর্থায়নে তাদের শর্ত মোতাবেক বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও ভেন্ডর দ্বারা করতে গেলে ফল একই ধরনের হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। আমাদের দূর ও নিকট প্রতিবেশী দেশ ও অর্থনীতিতে সামগ্রিক অটোমেশন কার্যক্রমে স্ব-স্ব দেশের বিশেষজ্ঞ (কনসালট্যান্ট) এবং স্থানীয় আইটি কোম্পানিগুলোর দ্বারা সফলভাবে সম্পাদিত হয়েছে। এ কথা ঠিক বাংলাদেশে কিছুদিন ধরে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ ও আইটি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ছিল না বা গড়ে ওঠেনি; যার দরুন দাতাসংস্থা বিদেশী বিশেষজ্ঞ বা ভেন্ডরের ওপর নির্ভরশীলতার শর্ত দিয়ে আসছিলেন। বিদেশী ভেন্ডররা বাংলাদেশের রাজস্ব-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষা ও পর্যালোচনার নামে বা প্রোগ্রামিংয়ের নামে নিয়ে বিদেশে চলে গেছে, কাজ সমাপ্ত করেনি। বিদেশী বিশেষজ্ঞ ভেন্ডরকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় মুহূর্তে পাওয়া যায়নি এবং দাতা সংস্থার কর্তৃত্বে তাদের পুনর্নিয়োগে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দাতাসংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মেটানোর উপায় হিসেবে এসেছে। এটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং এর তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ বিড়ম্বনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। কমিটি দেশীয় প্রযুক্তি, দেশীয় বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় আইটি কোম্পানি সরবরাহকারীদের লভ্যতা, দক্ষতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে বেশ খোঁজখবর নিয়েছে। বেসিসসহ বিভিন্ন আইটি প্রতিষ্ঠান ও বুয়েটের অধ্যাপকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। তার ভিত্তিতে কমিটি এ সুপারিশ করেছে যে দেশের টেকসই ও কার্যকর অটোমেশন ও লাগসই প্রযুক্তি দেশ থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। দাতা সংস্থার কাছ থেকে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ক্রয়/সংগ্রহ উপলক্ষে ঋণ নেয়া যেতে পারে। জাতীয় স্বার্থে কষ্টকর হলেও স্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও ভেন্ডর নিয়োগে আর্থিক বিনিয়োগ দায়িত্ব বা সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারকে নিতে হবে। আগামী তিন-চার বছর সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (পরস্পর প্রযুক্ত গোটা ব্যবস্থাপনা) অর্জনে সরকারের দৃঢ়চিত্তে সিদ্ধান্ত নেয়া আবশ্যক হবে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)