দেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈষম্যমূলক ও সর্বজনীন করা যায়নি। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি দেখা গেছে, যার দরুন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে। এমনকি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও এ দেশে প্রায় ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে অন্তত পাঁচ ধরনের পাঠ্যক্রম চালু আছে। প্রাথমিকে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের বিষয়টি কেবল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-তেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, বাস্তবায়ন হয়নি। এতে দিন দিন অভিভাবকরা সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার জন্য বেছে নিচ্ছেন বেসরকারিভাবে স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা অবৈতনিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্যক্রমের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবৈতনিকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ বলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ৪৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। অভিভাবকদের অভিযোগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অবৈতনিক ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার কথা বললেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় সরকারি বিদ্যালয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অভিভাবকরা। শিক্ষাবিদদেরও মত, প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বজনীন ও বিনা ব্যয়ে পড়াশোনার শতভাগ সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সুতরাং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত না হলে শিক্ষা খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা কখনই পূরণ হবে না।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করতে হলে সরকারকে নির্দিষ্ট সমস্যা ধরে সমাধানের পথে এগোতে হবে। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় একটি অন্যতম সমস্যা শিক্ষক সংকট। শিক্ষার মান নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে এটি বিশেষভাবে দায়ী। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৩০। এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান (এপিএসসি) ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫। যেখানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫১৩ । এ হিসাবে সব শিক্ষার্থীর জন্য অবৈতনিক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক সংখ্যা এখনকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কতজন, সে অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োজন করা যেতে পারে।

এছাড়া আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষক সুপ্রশিক্ষিত নন। শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষকের মান বাড়াতে হলে মেধাবী ও যুগোপযোগী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু আধুনিক সময়ের উচ্চশিক্ষিত মানুষ এ পেশায় আসতে নারাজ। এর কারণ যেমন অন্য পেশায় জড়িত অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা, তেমনই সামাজিক অবস্থান বিচারে এ পেশাকে খাটো করে দেখা।

এক্ষেত্রে আরো কিছু সমস্যা জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘসময় ধরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চালু থাকে। যে কারণে অভিভাবকরা নিরুৎসাহিত হন সন্তানকে এ বিদ্যালয়ে পাঠাতে। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক কম সময় চালু থাকে। তাই অনেকে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেন।

আবার অনেক সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বেশ পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাশাপাশি খেলার মাঠ দখল করছে প্রভাবশালীরা। অথচ শিশুর মননশীলতার বিকাশে ও যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আবার নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবও রয়েছে। ফলে সরকারি বিদ্যালয় অনেকাংশে হয়ে গেছে সমাজের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া ধর্মীয় কারণে মাদ্রাসামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে চলমান সময়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন পিতা-মাতারা। কিন্তু সেখানে ভিন্ন কারিকুলাম ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার মান সমতায় পৌঁছাচ্ছে না।

এসব সমস্যার বিপরীতে জায়গা করে নিয়েছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়গুলো। প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে সরকারি বিদ্যালয়গুলো। শিক্ষার মান থেকে শুরু করে অভিভাবকদের আস্থা সব প্রশ্নেই বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আছে। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষা সর্বজনীন নয়। কেননা এটি বেশ ব্যয়বহুল। বিশেষ করে জেলা শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলো। সুতরাং এর শিক্ষায় প্রবেশের সক্ষমতা সমাজের সব আয়ের মানুষের নেই। কোনো বিত্তবান অভিভাবক যদি সন্তানকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়াতে চান তাহলে সে স্বাধীনতা তার থাকা উচিত। তবে সব বিদ্যালয়কে অবশ্যই একই পাঠ্যক্রমের আওতায় আনা প্রয়োজন ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার বৈষম্য দূর করা যায়। আর এটি রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানেই হতে পারে।

প্রয়োজনে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বাজেট থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রমে আনতে হবে পরিবর্তন। বরাদ্দ ও বিনিয়োগের হার বাড়াতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে বেতন স্কেল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষা ব্যবস্থার আরো অবনতি হবে, যেটি কাম্য নয়। সরকার দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট হবে এটিই প্রত্যাশা।