চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার একটি সংকোচনমূলক বাজেট পেশ করেছিল। সেখানে সামগ্রিক কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যনিরাপত্তা খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতিসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা সংস্থার মতে, এ বরাদ্দ বর্তমান সংকট উত্তরণে যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির রক্ষাকবচ এবং সুষম উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি খাত। ২০২৬ সালের বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনের নানামুখী ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের প্রত্যক্ষ অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। দেশের শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশেরও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে এর পরোক্ষ প্রভাব আরো ব্যাপক। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহ, রফতানি আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, দারিদ্র্য কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে কৃষির কোনো বিকল্প নেই। এ প্রেক্ষাপটে কৃষি বাজেটকে কেবল প্রথাগত উৎপাদন বৃদ্ধির বৃত্তে আটকে না রেখে টেকসই প্রযুক্তি, আধুনিকীকরণ ও কৃষকের আয় সুরক্ষায় ঢেলে সাজাতে হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে কৃষি ও কৃষি ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। যেমন (ক) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং সারের কাঁচামালের দাম চড়া। ডলারে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে বাংলাদেশেও ডিজেল, বিদ্যুৎ ও সারের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তাই উৎপাদন খরচ কমিয়ে চাল ও সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ ভর্তুকি আবশ্যক। (খ) বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ফ্রন্টলাইনে রয়েছে। অসময়ে বন্যা, তীব্র তাপদাহ, খরা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ টন ফসল নষ্ট হচ্ছে। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে জাতীয় ফসল বীমা (Crop Insurance) চালু করা দরকার, যার জন্য বাজেটে বড় তহবিল প্রয়োজন। (গ) মৌসুমে ফসল ওঠার পর পরই দেশের কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না, অথচ ভোক্তাদের চড়া দামে কিনতে হয়। এর মূল কারণ সরকারি পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড চেইন বা হিমাগার এবং সাইলোর অভাব। টমেটো, আলু, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপনে বড় অংকের উন্নয়ন বরাদ্দ (এডিপি) দেয়া জরুরি। (ঘ) ড্রোন প্রযুক্তি, আইওটি-ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি কৃষিতে যুক্ত করতে না পারলে আমাদের উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়বে। কৃষিতে টেকসই প্রযুক্তি বাড়াতে গবেষণা খাতে জিডিপির অন্তত ১ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া উচিত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে একটি উৎপাদনমুখী ও কৃষিবান্ধব বাজেট হিসেবে রূপান্তর করতে সরকারকে কিছু নীতিগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন (১) ভুয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। সরকার যে ভর্তুকি বা নগদ প্রণোদনা দেয়, তা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। (২) দেশের অভ্যন্তরে কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ করতে এবং রফতানি বাজার ধরতে অঞ্চলভিত্তিক এগ্রো প্রসেসিং জোন তৈরি করতে হবে। শাকসবজি ও ফলমূল রফতানির জন্য বিমানবন্দর ও বন্দরগুলোতে কোয়ারেন্টাইন ল্যাব ও কোল্ডস্টোরেজ সুবিধা উন্নত করতে হবে। (৩) সেচ মৌসুমে কৃষকরা যাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে ডিজেল পান, তা নিশ্চিত করা বাজেটের অন্যতম বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রয়োজনে সেচ পাম্পগুলোকে সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধায় সৌরবিদ্যুতের (সোলার ইরিগেশন) আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। (৪) বর্তমানে দেশের মোট বিতরণকৃত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের মাত্র ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ কৃষি খাতে যায়, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বাড়িয়ে গ্রামীণ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ১০ টাকা অ্যাকাউন্টের বিপরীতে জামানতবিহীন স্বল্পসুদে কৃষি ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে।

বিগত বেশ কয়েক বছর কৃষিতে প্রদত্ত ভর্তুকি মূল বাজেট বরাদ্দ ছাড়িয়ে গেছে। যেমন ২০২১-২২, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ সালে মূল বরাদ্দ যথাক্রমে ১০ হাজার ৯৯, ১৬ হাজার ৫২৭, ১৭ হাজার ৫৩৩, ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা থাকলেও প্রয়োজনের নিরিখে সংশোধিত বাজেটে তা দাঁড়ায় যথাক্রমে ১২ হাজার ৬৯০, ২৬ হাজার ৬৯৩, ২৫ হাজার ৬৪৪ ও ২৭ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায়। কৃষি অর্থনীতিবিদরা ২০২৬-২৭ সালের জন্য প্রস্তাবিত কৃষি ভর্তুকি কাঠামোর আওতায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন যা তাদের মতে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রয়োজন হবে। কৃষিতে বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে আর্থিক সহায়তা, প্রণোদনা তথা নামান্তরে আবশ্যিক বিনিয়োগের যথার্থতার নিরিখে প্রস্তাবিত ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিভাজন হতে পারে: রাসায়নিক সার ভর্তুকি ১৫ হাজার কোটি, ডিজেল ও সেচ সহায়তা ৫ হাজার কোটি, কৃষি বিদ্যুৎ ভর্তুকি ৩ হাজার কোটি, কৃষি যন্ত্রপাতি ভর্তুকি ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, উন্নত বীজ ও চারা সহায়তা ২ হাজার ৫০০ কোটি, কৃষি ঋণে সুদ ভর্তুকি ১ হাজার ৫০০ কোটি, জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও কৃষি বীমা ১ হাজার ৫০০ কোটি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও কোল্ড স্টোরেজ সহায়তা ৫০০ কোটি, গবেষণা ও প্রযুক্তি সহায়তা ১ হাজার কোটি, ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট কার্ড ৫০০ কোটি টাকা।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে মূলত কৃষিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ হাজার কিমি খাল কাটার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ২০২৬-২৭ সালে ১ হাজার ৫০০ কিমি খাল খনন ও পুনঃখনন করতে বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন হবে। ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা প্রাপ্তি, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রাপ্তিসহ ১০ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কৃষক কার্ড প্রবর্তন করেছে এবং পাইলটিংয়ের জন্য ২০২৬-২৭ সালে প্রায় আট লাখ কৃষককে কার্ড দেয়া হবে। এ যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজন। এছাড়া অন্যান্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, যেমন কৃষি বীমা চালুকরণ, বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, কৃষিপণ্য রফতানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠাকরণ, বরেন্দ্র এলাকায় কৃষি পুনর্জাগরণ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত উন্নয়ন প্রভৃতির জন্য অর্থ প্রয়োজন।

জাতীয় সংসদ সম্প্রতি দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আইন হিসেবে পাস করেছে, যার একটি হলো ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এবং অন্যটি হলো স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর বা দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন ও জনসংখ্যার চাপের কারণে দেশের উর্বর আবাদি জমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি ভূমি সুরক্ষার জন্য ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন করা, ভূমি জোনিং করা এবং ভূমি জোনিংয়ের ভিত্তিতে কৃষিভূমি সুরক্ষার ব্যবস্থা করাসহ আইনের অন্যান্য বিধান প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের জন্য বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন। এ আইন বাস্তবায়ন যত বিলম্বিত হবে দেশের কৃষি ভূমি সুরক্ষা ততই বিঘ্নিত হবে। এ আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এ বছরের বাজেটেই রাখা দরকার।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি এখনো কৃষি। শিল্পায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষি ছাড়া কোনো অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে না। শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা ব্যতিরেকে শিল্পায়ন অসম্ভব। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ কৃষিতে বিনিয়োগ মানে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কৃষি ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বরাদ্দ অবশ্যই সুষ্ঠুভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। আজকের বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী কৃষি বাজেটই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।

সিকদার আনোয়ার: সাবেক সচিব ও সহসভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি