২১ জুলাই আমাদের জন্য বয়ে এনেছে এক বেদনার্ত অধ্যায়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই মডেলের প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান কুর্মিটোলা ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের মাত্র ১২ মিনিট পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে আছড়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণীকক্ষে, যেখানে ক্লাস চলছিল। এক ভয়ংকর বিকট শব্দ, আগুনের হলকা, আতঙ্কিত চিৎকার, ধোঁয়ার ঘন ঘেরাটোপ আর মৃত্যু—সব একসঙ্গে নেমে এল ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। স্বপ্ন দেখানো ক্লাসরুমগুলো এক নিমিষেই রূপ নিল বিভীষিকায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিমানের পাইলট, শিক্ষিকাসহ এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৩১ জন। আহত হয়েছেন ১৬৯ জন, যাদের অধিকাংশই স্কুল শিক্ষার্থী। আহতদের অনেকেই জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালসহ (সিএমএইচ) বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে—ঝলসানো শরীর, আতঙ্কিত চোখ আর কাতর চিৎকার যেন আজ সমগ্র জাতির অন্তরে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এ দুর্ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দুর্ঘটনায় শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তাদের চিকিৎসা নিয়ে যেন কোনো অবহেলা না করা হয় সেদিকে রাষ্ট্রকে নজর রাখতে হবে। আর চিকিৎসা যেন কেবল প্রাথমিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্ব পায়, সেদিকেও মনোযোগ দেয়া উচিত।
ঘটনার পর পরই আহতদের উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তর, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এদিকে ২১ জুনেই আহত সবার চিকিৎসা সরকার করাবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, ‘সব বেসরকারি হাসপাতালে এ দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদানের জন্য নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। তবে যেকোনো ধরনের অপারগতায় রোগীকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’ এ ঘোষণা দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ নয়। বিনামূল্যে সুচিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে হবে সরকারকে। যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক কিংবা দেশে উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়, তাদের দ্রুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা দরকার। কোনো অবহেলায় যেন কোনো প্রাণ না ঝরে সেদিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। আর আহতদের কোনো পরিবার যেন অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক জটিলতায় না পড়ে, সে নিশ্চয়তাও সরকারকে দিতে হবে। শিশুদের ওপর এমন একটি দুর্ঘটনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তাই তাদের মানসিক চিকিৎসা সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। এত বড় ট্র্যাজিক দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরতে হয়তো সময় লাগবে। তবে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।
গত বছরের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় যারা আহত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসা নিয়ে যে অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে, তা অত্যন্ত লজ্জাকর। আন্দোলনে বহু সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছিলেন। কিন্তু অনেকেই তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সুবিধা পাননি বা হাসপাতালে গিয়ে নানা জটিলতার মুখে পড়েছেন। এমনকি কেউ কেউ পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ প্রেক্ষাপটে মাইলস্টোন কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আহত হওয়া শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় যেন এমন কোনো অব্যবস্থাপনা না হয়—সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা উচিত। দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত শয্যা, পোড়া রোগীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা—সবই নিশ্চিত করতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের দুর্ঘটনা নতুন নয়। গত তিন দশকে বিমান বাহিনীর অন্তত ২৭টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর কোনোটিতে পাইলট আহত বা নিহত হয়েছেন। কোনোটি বিধ্বস্ত হয়েছে জনবসতি থেকে দূরে। তবে এবারের মতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে একের পর এক প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার পরও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি বিমান বাহিনীর বহরে কিংবা নীতিনির্ধারণে। যুক্ত হয়নি আধুনিক যুদ্ধবিমান। পুরনো প্রযুক্তির এয়ারক্রাফট দিয়েই চলছে বাহিনীর কার্যক্রম। এ দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে তিনবারই ছিল এফ-৭ প্রশিক্ষণ বিমান। উত্তরায় বিধ্বস্ত হওয়া এফ-৭ সিরিজের বিমানটিও ছিল চীনের তৈরি জে-৭ তথা এফটি-৭ বিজিআই। এটি মূলত ১৯৬০-৯০ দশকের প্রযুক্তি। বর্তমানে এ ধরনের বিমানের দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেছে অ্যারোস্পেস গ্লোবাল নিউজ (এজিএন)। এজিএন বলছে, এ ধরনের জেট সারা বিশ্বেই আকাশ প্রতিরক্ষা, বহুমুখী অভিযান ও পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার হয়। তবে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চেয়ে এর দুর্ঘটনার হার বেশি। এর কারণ পুরনো নকশার এয়ারফ্রেম, সীমিত নিরাপত্তা, আধুনিক ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব। এভিয়েশনভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এফ-৭ কম স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধবিমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে একসময় মিগ-২১ বিমানে বেশ কয়েকজন পাইলট দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। পরে তারা তাদের সব বিমান পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছিল। আমাদেরও এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি। টেকসই প্রকিউরমেন্ট ও মেইনটেন্যান্স পলিসি আরো উন্নত করা দরকার। যেকোনো জিনিসই পুরনো হলে ঝুঁকি বাড়ে। তাই ঝুঁকি মোকাবেলায় নতুন এয়ারক্রাফট কেনা উচিত। সাধারণত দুই কারণে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে। টেকনিক্যাল ফল্ট ও হিউম্যান এরর। প্রশিক্ষণ বিমানেও ব্ল্যাক বক্স থাকে, সেটা অনুসন্ধান করে এগুলোর যথাযথ তদন্ত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
বিগত দিনের সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। এ ভঙ্গুরতা কেবল প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয়, জনজীবনের প্রতিটি স্তরে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। ফলে আমরা এখনো একটি কল্যাণমুখী, মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ। স্বাধীনতার এত বছর পরও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যেসব মৌলিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য ছিল, তা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। বরং প্রতিটি আপৎকালীন মুহূর্তেই আমরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। দুর্ঘটনা বা দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতির অভাব এতটাই প্রকট যে প্রতিবারই হিমশিম খেতে হয়, গড়ে ওঠে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা কখনই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। আমরা মূলত বিপদ দেখা দিলে তবেই সচেতন হই, আলোচনা করি, প্রতিকার নিয়ে মুখর হই; কিন্তু সংকট কেটে গেলে আবার সবকিছু ভুলে যাই। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
মাইলস্টোন কলেজের মতো দুর্ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে সেজন্য প্রশিক্ষণের স্থান ও ধরন নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। তবে আপাতত সবচেয়ে জরুরি হলো—আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, যাতে তারা সুস্থভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। আহত শিক্ষার্থীরা যেন যথাযথ চিকিৎসার অভাবে আরো বড় সংকটে না পড়ে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আহতদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি সব সংস্থা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।










