প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ বছর অতিক্রম করলেও দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতির তেমন উন্নয়ন ঘটেনি। এখানে বহুমাত্রিক পণ্যের বিকাশ হয়নি। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে কোম্পানির তালিকাভুক্তি থেকে শুরু করে বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেরিভেটিভস ও কমোডিটির বৈচিত্র্যপূর্ণ বাজার গড়ে ওঠেনি। যে কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা ও গুণগত মানও কম এবং পুঁজিবাজার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি। অন্যদিকে নানামুখী সমস্যায় ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তিও বাড়ানো সম্ভব হয়নি। অথচ পুঁজিবাজার উন্নয়নে অন্যতম অনুষঙ্গ ভালো কোম্পানি। বরং বিগত সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে দেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির নামে অসংখ্য অনিয়ম হয়েছে। এ সময়ে যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে এসেছে তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এরই মধ্যে দুর্বল হয়ে গেছে। তবে প্রত্যাশা ছিল, গত বছরের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারের অবস্থা ঘুরে দাঁড়াবে। ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বৃদ্ধিতে কাঠামোগত কিছু সংস্কার করা হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও দৃশ্যমান সংস্কার নেই পুঁজিবাজারে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজারে আইপিওর মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুসারে, আইপিওর মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে ৫২টি কোম্পানি ৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এক্ষেত্রে প্রতি বছর গড়ে আইপিওর মাধ্যমে ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার অর্থায়ন হয়েছে।

আইপিও না আসার ক্ষেত্রে সরকার বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দেশের অর্থনীতিতে লুটতরাজের কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এতে আইপিওতে আসার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। সরকারের যুক্তি উপেক্ষা করা যায় না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির আইপিও নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। সে বিষয়ে খুব বেশি অগ্রগতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের পুঁজিবাজারে এত দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও না আসার নজির বিরল। তবে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি বর্তমানে নিম্নমুখী। যে কারণে উদ্যোক্তারা কোম্পানির আইপিওতে আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না। আবার বিগত সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনাও এক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজারের অবস্থা পরিবর্তনে যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল সবার, সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। উপরন্তু দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো বিনিয়োগে যাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণে আইপিওতে আসছেন না কেউ।

এসবের বাইরেও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্ত না হওয়ার অন্যতম কারণ বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে শর্তসাপেক্ষে কর ব্যবধান মাত্র ৫ শতাংশ। সম্প্রতি ‘পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ: টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাঠামো’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায়ও বিষয়টির ওপর আলোকপাত করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসার ক্ষেত্রে শেয়ারের যৌক্তিক দাম পায় না। মাত্র ৫ শতাংশ কর সুবিধা পেতে ভালো কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসবে না। কারণ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কোম্পানিগুলোর নানা খাতে খরচ বেড়ে যায়। ফলে মাত্র ৫ শতাংশ কর সুবিধা পেতে সেই খরচ বাড়িয়ে কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হবে না। যে কারণে পাঁচ-ছয় বছরে ভালো কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসেনি।

এমন পরিস্থিতিতে আইপিও আনতে বা ভালো কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ভালো কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট যদি প্রধান সমস্যা হয়, তবে আস্থা ফেরানোয় মনোযোগী হতে হবে। সেজন্য সুশাসন নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়লে এমনিতে বিনিয়োগকারীরা ভরসা পাবেন। সেক্ষেত্রে ভালো কোম্পানি আকৃষ্ট করতে কিছু সুবিধা দেয়া যেতে পারে। যেমন কর কাঠামোর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ রয়ে গেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে তাদের উৎসাহ দেয়া প্রয়োজন। দূর অতীতে যেভাবে আইপিওর নামে অনিয়ম, কারসাজি ও প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে, তাতে পুঁজিবাজারে ভালো মানের কোম্পানির আসার আগ্রহ কমে গেছে। আবার বহু কোম্পানি আইপিও থেকে প্রাপ্ত অর্থের যথাযথ ব্যবহার না করে অন্য খাতে ব্যয় করেছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পুঁজিবাজারের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। এগুলো কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরির পেছনে বিগত সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার দায়ও রয়েছে। যে কারণে উদ্যোক্তাদের অনেকেই মনে করেন যে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ার ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়া অধিক লাভজনক ও নিরাপদ। এমনকি তারা বিনিয়োগের জন্য বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন। সুতরাং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাশাপাশি আইপিও প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সহজ ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বড় করপোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে প্রণোদনাভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। যেসব কোম্পানির ব্যাংক ঋণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি, তাদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া সরকারি কোম্পানিগুলোর অংশীদারত্ব বিক্রির মাধ্যমে বাজারে তারল্য বাড়ানোর পাশাপাশি পুঁজিবাজারে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে টেকসই শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার অপরিহার্য। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইপিও বন্ধ থাকা এবং পুঁজিবাজারের প্রতি উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন।