গবেষণার মাধ্যমেই অর্থনীতির দুর্বলতা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত হওয়া যায়। কিন্তু সেই গবেষণা যদি বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা কিংবা আনুমানিক তথ্য (Guesstimate) ও উপাত্তের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় তাহলে অর্থনীতির সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। আর বিভ্রান্তিকর বা অর্ধসত্যের ওপর নির্ভর করে যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় তা কখনই কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারে না। তথ্যকে বলা হয় গবেষণার প্রাণ। আপনি কী তথ্য থেকে যুক্তি শুরু করছেন তার ওপর নির্ভর করছে উপসংহারে আপনি সত্য সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন কিনা। যেখান থেকে আপনার যুক্তি শুরু সেখানে যদি ভুল থাকে বা আনুমানিক পরিমাপ থাকে তাহলে আপনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন না। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে পলিসি গ্রহণ করবেন তাও সঠিকভাবে কাজ করবে না। অর্থাৎ গবেষণার তথ্য ভুল থাকলে প্রতিটি পর্যায়েই তার প্রভাব পড়তে থাকবে। মূলত সে কারণেই অর্থনৈতিক গবেষণার ক্ষেত্রে সঠিক ও সামগ্রিক মূর্ত তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। অবশ্য শুধু অর্থনৈতিক গবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, যেকোনো গবেষণার জন্যই সঠিক ও সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা খুবই সময়সাধ্য, কঠিন একটি কাজ—একদম অসম্ভব না হলেও। বাংলাদেশের প্রথিতযশা কতিপয় গবেষক মিলে সম্প্রতি ড. ইউনূস সরকারের জন্য প্রণয়ন করেছেন একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যসমৃদ্ধ শ্বেতপত্র—‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা: উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ’।

এ ধরনের প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের সময় আবার কিছু মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন তাদের মধ্যে উৎসের ব্যাপারে ও তথ্যের ধরনের ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব কাজ করে। পক্ষপাতমূলক মনোভাব নিয়ে বিশেষ উৎস থেকে বিশেষ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হলে সেখানে সঠিক চিত্র উঠে আসার সম্ভাবনা কম থাকে। বিশেষ করে সরকারি খাতের উৎস থেকে যারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে এ পক্ষপাতমূলক ভ্রান্তির বিষয়টি লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সরকারের চাওয়ার ওপর নির্ভর করেই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিতরণ এবং ব্যবহার করে থাকেন। তারা চেষ্টা করেন কীভাবে সরকারের কৃতিত্ব বেশি করে দেখানো যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইত্যাদি পরিসংখ্যান ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে বলে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ রয়েছে। আবার এর বিপরীতে মূল্যস্ফীতির হার, বেকারের সংখ্যা, অর্থপাচারের পরিমাণ, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে—এ অভিযোগ বা ধারণাও দেশীয় মহলে বহুল প্রচলিত। সরকারি মিথ্যাচারের এ ধরনের প্রবণতার পেছনের কারণগুলোর সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হলে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হতে পারে।

অনেক সময় একই বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে দুই রকম পরস্পর বিপরীত মতামত পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি মত আপনার মতের অনুকূলে বা পক্ষে। আর একটি মত আপনার মতের বাইরে বা বিপক্ষে। এখন কোন মতটি আপনি বিশ্বাস করবেন সেটা একটি সমস্যা। মানুষ সাধারণত তার মতের সঙ্গে মিলে যায় এমন তথ্য বিশ্বাস করতেই বেশি পছন্দ করে। এমন অবস্থার সৃষ্টি হলে যুক্তি-তর্কের আশ্রয় নিতে হয়। প্রয়োজনে নতুন করে আরো তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু অনেকেই কষ্ট করে অধিকতর তথ্য সংগ্রহ করে পুনরায় যাচাই-বাছাই করেন না। তারা তাদের পছন্দনীয় তথ্য ব্যবহার করে গবেষণাকার্য সম্পন্ন করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত রিপোর্ট প্রদানের জন্য অনুমাননির্ভর তথ্য প্রক্ষেপণ সংযোজন করে গবেষণাকার্য পছন্দসইভাবে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এ ধরনের গবেষণায় ভুল বা বিভ্রান্তিকর জননন্দিত তথ্য সংযোজিত ও প্রচারের আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই সম্ভব হলে একই বিষয়ে একাধিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ ও তা নিয়ে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি যে প্রতিবেদন সরকারের কাছে প্রদান করেছে সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিগত সরকার আমলে যেসব উন্নয়নের তথ্য-উপাত্ত প্রণয়ন এবং প্রকাশ করেছে তা ‘বানানো গল্প’ (Cooked up GDP growth Figure) বা ‘‌মিথ্যা বয়ান’ (False Narrative) ছাড়া কিছুই নয়।‌ ‘আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সম্পর্কে অনুযোগ করে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে এরাও এ মিথ্যা বয়ানের গ্রাহক ছিলেন। শ্বেতপত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিমাপ, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থপাচার ইত্যাদি বিষয়ে যেসব নতুন সম্ভাব্য পরিমাপ বা তথ্য উত্থাপন করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, অতীত সরকারি তথ্যগুলো বেশির ভাগই অসত্য। অর্থাৎ অতীত সরকার বাস্তব অবস্থাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে। এটা করা হয়েছিল মূলত সরকারের সাফল্যকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর জন্য। কিন্তু বিগত সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্য অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে—এটা মেনে নিয়েও সেই অতিরঞ্জনের পরিমাণ কেমন তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা ‌‘‌All or None’ এ রকম বাইনারি লজিকে চলতে চাচ্ছেন না তাদের জন্য অতিরঞ্জনের মাত্রা নির্ণয়ের কাজটা সহজ নয়। কেউ যদি বলেন, সরকার এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য প্রদর্শন না করে বেশি বা কম করে দেখিয়েছে তাহলেও তো তাকে প্রমাণ দেখাতে হবে প্রকৃত তথ্য থেকে তা কতটুকু মাত্রায় আলাদা বা কতগুণ কিংবা কত শতাংশ বেশি বা কম হতে পারে। কিন্তু সেজন্য একটি অতীতের ‘‌সত্য বেঞ্চমার্ক’ তাকে প্রথমে ধরে নিতে হবে। তারপর একটি যুক্তিসংগত অনুমানভিত্তিক পরিমাপ বা ‘‌প্রক্ষেপিত সত্য’ নির্ণয় করে তা সরকারি প্রদর্শিত সত্য থেকে কত বেশি বা কম তা নির্ণয়ের চেষ্টা করতে হবে। কাজটা কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত Beyer R., and Hussian z. (2021) ‘Validating GDP estimates in Bangladesh’ Bangladesh C.E.M background paper (Bangladesh country economic memoradiun- change of fabric) September, 2022. গ্রন্থটির মডেল ও স্টাডি ব্যবহার করে ২০২১ সালেই দেখানো হয়েছিল বা দাবি করা হয়েছিল যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার যতখানি অতীতে দেখানো হয়েছিল সরকারি পরিসংখ্যানে বাস্তবে তা হয়নি। সেজন্য বিশ্বব্যাংকের একটি স্যাটেলাইট তথ্য ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহারকারী অত্যাধুনিক ম্যাক্রো মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। সম্প্রতি এ মডেলের কিছুটা সমালোচনা ও মার্জনা করে Nick Lea (Former Depuaty Chief Economist, Foreign ComonWealth and Development Office) মন্তব্য করেছেন, “‍Firstly the claimed overestimation of GDP Should be treated with caution, but even if accurate, would lessen but not erase Bangladesh’s valuable long term growth... Nevertheless, if we propagate the model’s growth rates, we get a GDP (or GDP per capital) that is 32% less than the reported figure... hence even if correct, Bangladesh Would still be a middle- icome country, but with a true GDP per capital of around $1794 in 2024, rather than $ 2625. Since 1980, this means that GDP per capita would have nearly tripled rather than roughly quadrupled. Still a record that most developing countries would envy. [উৎস: Economic Policy Network, The Blavatnik School of Govt, University of Oxford]

২০২১-এর বিশ্বব্যাংকের মডেল থেকে প্রাপ্ত নিম্নের ২০২৪ সালের তালিকাটির বিভিন্ন পরিমাণগত দিক নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে মডেল অনুমিত প্রকৃত Bench Mark-গুলো যে সরকারি উপাত্তের চেয়ে সর্বদাই অনেক নিচে তা নিয়ে সম্ভবত বিতর্ক নেই। নিক লিয়াও তা স্বীকার করেছেন।

তালিকা-১

জিডিপি অনুপাতগুলোর সরকারি অতি স্ফীত/নিম্ন হিসাব ও মডেলের হিসাব (২০২৪)

Untitled-2

এছাড়া শ্বেতপত্রের খসড়ায় বিংশ অধ্যায়ে বিভিন্ন বছরে কী পরিমাণ অর্থ বাইরে পাচার হতে পারে সেটাও সাহসিকতার সঙ্গে পরিমাপের চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি রিপোর্ট (এফআইআর) থেকে নেয়া হয়েছে ২০০৯-১৩ এবং ২০১৫ সালের অর্থপাচারের পরিমাণটি। অবশ্য পাদটীকায় এ আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টের তথ্য ও পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষক ড. মুস্তাফিজুর রহমান লিখেছেন, ‘‌The GFIR methodology is not above criticism . However, in the absence of better data source we have used this as the basis of our estimation’. সুতরাং বলা যায় যে গড়ে ২০০৯-২৩ পর্যন্ত প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে গেছে বলে শ্বেতপত্রে যে চূড়ান্ত Sensational দাবি করা হয়েছে তার ভিত্তি হচ্ছে GFIR-এর পাঁচটি বার্ষিক রিপোর্ট ও তার ভিত্তিতে ১০ বছরব্যাপী সুদীর্ঘ প্রক্ষেপণ। সংশোধিত জিডিপির পরিপ্রেক্ষিতে এর কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হবে কিনা এখন সে প্রশ্ন নতুন করে উঠছে।

কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কত হয়েছে তার ভিত্তিতে অন্য নানা সংশ্লিষ্ট চলকের প্রবৃদ্ধির হার বিষয়ের অনুমান করা যায়। অর্থনীতির চলকগুলোর এসব সংশোধিত গতি বহাল থাকলে কী হারে জিডিপি ও অন্যান্য চলকের প্রবৃদ্ধি হতে পারে তাও অনুমান করা যায়। তা থেকে টাকা পাচারের আনুমানিক মাত্রার গতিপ্রবণতার অনুমানের ভবিষ্যতে কিছুটা রদবদল করা যেতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি ও পাচারের যেসব কেস স্টাডি প্রতিদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

সবশেষে জিডিপির পরিমাপ নিয়ে কিছু আশ্চর্যমধুর মন্তব্য। বিগত সরকার আমলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে—এটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই বর্ধনের হারটা কী পরিমাণ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশী-বিদেশী অনেকেই মনে করেন, বিগত সরকার আমলে জিডিপি বা মাথাপিছু আয় ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আমরা যদি ৩০ শতাংশ বাদ দিয়েই জিডিপি ক্যালকুলেট করি তাহলে যে সাফল্য প্রত্যক্ষ করা যায়, সেটা বিদেশী গবেষকদের মতে এর পরেও উপেক্ষণীয় নয়। বিগত সরকার আমলে আমরা যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের প্রাথমিক তালিকায় উত্তীর্ণ হয়েছি এটা প্রবৃদ্ধির গড় হার তিন ভাগের এক ভাগ কমিয়ে ধরলেও মিথ্যা হয়ে যায় না।

অতীতে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অমর্ত্য সেন প্রমুখ অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের গড় অর্জনগুলোকে অনেক উচ্চে তুলে ধরেছিলেন, সেটাও কেউ কেউ বলছেন। অবশ্য তখনো আমিসহ অনেকেই গড় উন্নতির ফাঁকির কথাও তুলে ধরেছিলাম। বলেছিলাম যে যেটুকু গড় উন্নতি হয়েছে তারও মূলে ছিলেন গ্রামের কৃষক, গার্মেন্ট শ্রমিক, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিক যারা কেউই সে সময় নিজেদের হিস্যা পাননি, তাদের আয় তুলনামূলকভাবে মোটেও ততটা বাড়েনি। তাই বৈষম্য ও বঞ্চনাবোধ রয়েই গেছে। তার ওপর গণতন্ত্রও ছিল না। তাই এবার আমাদের অর্থনৈতিক গবেষণার মনোযোগর বিন্দু হোক ‘‌কীভাবে বৈষম্য ও বঞ্চনা কমানো যায়?’ এবং ‘‌কীভাবে পাচারকারীদের শাস্তি বিধান করে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা যায়।’

ড. এমএম আকাশ: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অধ্যাপক,

অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়