দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতার মধ্যে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি। ফলে নতুন কর্মসংস্থানও সৃজন হচ্ছে না। নতুন কর্মসংস্থান সৃজন না হওয়ায় দেশে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত ৫ আগস্ট নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়, যার মূলে ছিল এ দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী। তবে শুরুটা ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া। যাতে দেশে বেকারত্বের মাত্রা কমানো যায়। যদিও পরে এ আন্দোলনে সরকার পতন হয়। এ আন্দোলন অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, কেড়ে নেয় অনেক শিক্ষার্থীর চোখ, পঙ্গুত্ববরণ করেন অনেকেই। এখনো অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের আত্মত্যাগের কারণে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল নতুন বাংলাদেশের। বেকারত্ব দূর করার জন্য আগে বেকারত্বের সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণ করা জরুরি। এরপর বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান সৃজন করতে হবে। তা না হলে তরুণ প্রজন্ম বেকারত্বের মরণ ছোবল থেকে রক্ষা পাবে না।

দেশে প্রকৃত বেকার সংখ্যা কত—এর কোনো সঠিক হিসাব নেই। সরকার বেকারের যে হিসাব দেয়, তা প্রায় অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ডিসেম্বর শেষে ১৯তম আইসিএলএস অনুযায়ী ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৭ লাখ ৩০ হাজার বেকার। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ২৪ লাখ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার। যদিও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। সরকারের দেয়া পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাদের মতে, সরকার যে হিসাব দেয়, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। তারা মনমতো কাজ পান না। তারা পড়াশোনা করেন না, কাজেও নেই, তারা ছদ্মবেকার। কোনো রকম জীবনধারণের জন্য কাজ করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। এক মাস ধরে কাজপ্রত্যাশী এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি ১ ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ না পান, তাদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সংজ্ঞা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ অসম্ভব। উন্নত দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। উন্নত দেশের মানুষ সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করলে মজুরির পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তাদের বেকার ভাতা পায়। ফলে জীবনধারণের খরচ জোগাতে তাদের খুব বেশি সমস্যা হয় না।

বাংলাদেশে বেকার আছে কি নেই বা কর্মসংস্থানের বাস্তব অবস্থা কী—সেটা এখন বিতর্কের বিষয় নয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসসহ (বিসিএস) যেকোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরির বিপরীতে আবেদনপত্রের সংখ্যা দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি পদের বিপরীতে অনেক প্রার্থী আবেদন করে থাকেন। বেকারত্ব বাড়ার কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকা ও ব্যাংক ঋণের সুদহার বেশি হওয়ায় বেকারত্ব বেড়েছে। বিগত সরকারের সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অর্থনীতির আকার বড় দেখানো হয়েছে। ফলে অর্থনীতির আকার যে হারে বেড়েছে বলে ওই সময় প্রতীয়মান হয়েছে সেভাবে কর্মসংস্থান বাড়তে দেখা যায়নি। এক দশক আগে বিভিন্ন খাতে যে হারে নতুন চাকরির সুযোগ ছিল, এখন আর সেই ধারা নেই। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ কমে গিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা।

দেশে সরকারি-বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকেই থাকতে হচ্ছে কর্মহীন। আবার দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়লেও শিল্প-কারখানার মালিকরা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী পান না। এর কারণ শিল্প-কারখানার চাহিদা অনুসারে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যক্রম তৈরিতেও কোনো গুরুত্ব দেয় না। সরকারের সঠিক নীতি-পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর অনেকেই চাকরি না পেয়ে রাষ্ট্রের জন্য বড় বোঝা তৈরি হচ্ছে। বেকারত্ব নিরসনে দরকার বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার বিকাশ। কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজন আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংকট চলছে। দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থের সরবরাহ কমানো। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ায় চাপে রয়েছে উদ্যোক্তারা। উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমেছে। ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কর্মসংস্থান গড়ে উঠছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকায় নতুন কর্মসংস্থানও সৃজন হচ্ছে না। কিন্তু তার বিপরীতে প্রতি বছর

শেষে কর্মক্ষম বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরির বাজারে যুক্ত হচ্ছে, যাদের একটি বড় অংশই কাজ না পেয়ে বেকার থাকছে।

অর্থনীতির প্রতিটি শাখা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। একটিকে বাদ দিয়ে বা পেছনে ফেলে অন্যগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিরিখে দেখতে হবে বেকারত্বের বিষয়টি। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে উদ্যোগ নিতে হবে। বেকারত্ব কমাতে হলে নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে হবে, যেখানে বেকার তরুণরা কাজ পাবেন।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে বর্তমানে বড় একটি অংশ তরুণ, যাদের মধ্যে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশে বেকারত্ব কমিয়ে আনতে প্রয়োজন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। কীভাবে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায় সে বিষয়ে সরকারকে সঠিক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। পাশাপাশি বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও যোগ্য করে তুলতে প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বিগত সময়ে দেখা গেছে, কর্মসংস্থান বাড়ানোর নামে কিছু অপরিকল্পিত বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। আসন্ন বাজেটে সে ধরনের পরিকল্পনা থেকে সরকারকে বেরিয়ে এসে নতুন চাকরির বাজার তৈরি করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হলো বেসরকারি খাত। শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে খাতটিকে ঋণবঞ্চিত করা হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যবসায়ীরা আরো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন কোনো প্রকল্প নেয়ার কথা কেউ ভাবছে না। তাই বেসরকারি খাতকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে।