অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন। সেটি হলো, কবে নাগাদ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সম্প্রতি এ অনিশ্চয়তার কিছুটা হলেও অবসান ঘটেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন সরকারের পক্ষ থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠানো হবে। প্রত্যাশা রয়েছে এ ঘোষণায় উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ‘সুষ্ঠুভাবে’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণকালে প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। তাই নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজিত হলে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা হবে। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক চর্চার পথে দেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি ঘটবে তা হলো দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা পাবে, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যকীয়।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অনুষ্ঠিত তিন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সেই সঙ্গে ছিল বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। জনগণের কাছে সেগুলো প্রহসনের নির্বাচন হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। নাগরিকের ভোটাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ বা কর্মীদের গুম-খুনের নজিরও মিলেছে। এমনকি যেকোনো নাগরিকের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ভিন্নমত দমনে নানা কায়দায় দমন-পীড়ন চালিয়েছে বিগত সরকার। দেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতিসহ প্রায় সব খাতে গত দেড় দশকে একপ্রকার রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চালিয়েছিল এ সরকার, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে তাদের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটেছে। তাই স্বাভাবিকভাবে তাদের পতনের পর জনমনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে দেশের দায়িত্ব নিয়েছে। তারা অনেক ক্ষেত্রে বেশ ভালো প্রভাব রেখেছে। বিশেষত ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বড় কোনো বিপর্যয়ের দিকে যাওয়া আটকেছে। কিন্তু রাজনৈতিক, সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি, যার বিরূপ প্রভাব ব্যবসা-বিনিয়োগে পড়েছে। তাছাড়া নির্বাচিত সরকার ব্যতীত নীতি ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। সব মিলিয়ে পুরো দেশই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে চেয়ে আছে বলা যায় এবং সেটি যত দ্রুত আয়োজন করা সম্ভব হবে তত দ্রুত দেশ স্থিতিশীলতামুখী হবে বলে আশা করা যায়।
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্র মেরামত বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের সংস্কার ঘিরে। সংস্কার কার্যক্রমের জন্য সময় চেয়েছিল এ সরকার। তবে বাস্তবতা এই যে সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও বটে। তাই চাইলেও সব সংস্কার তাদের পক্ষে করে যাওয়া সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে সরকার এমন কোনো পথনকশা তৈরি করে যেতে পারে, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য হবে অনুসরণীয়। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা বিরাজমান তা কাটিয়ে উঠতে হলে নির্বাচনের বিকল্প নেই। স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত একাধিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয়েছে দেশ। যার অর্থ একাধিকবার দেশ গণতন্ত্রচর্চার পথ থেকে ছিটকে গেছে। দেশে বারবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। ফলে জনগণকে আন্দোলনে নামতে হয়েছে একনায়ক বা স্বৈরাচারী সরকারকে গদিচ্যুত করতে। এভাবে বারবার সরকার পরিবর্তন দেশের টেকসই অগ্রগতির অন্যতম অন্তরায়। তাই কেবল নির্বাচন দিলেই হবে না, সেটি হতে হবে যেকোনো প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। জনগণের ভোটে সরকার গঠন না হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রধানতম ভিত্তি। বহু বছর নাগরিকরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নিজের পছন্দের সরকার বেছে নেয়ার প্রক্রিয়ায় তারা প্রতারিত হয়েছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া প্রয়োজন।
আবার বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একটি বড় বাধা হয়ে উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ী সমাজ বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, যার অন্যতম কারণ নীতির অনিশ্চয়তা। ব্যবসা এমনিতেও সবসময় ঝুঁকির কাজ। কথায় বলে ঝুঁকি ছাড়া ব্যবসা হয় না। বেশির ভাগ সময় বিনিয়োগ করা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকেন ব্যবসায়ীরা। এমন অবস্থায় নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণ না ঘটলে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হবে না। অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না। সে কারণেও দ্রুত নির্বাচন হওয়া আবশ্যক। দ্রুত নির্বাচন হলে অর্থনীতিতে কিছু নিশ্চিত দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। দেশের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীজনরাও নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। যত দ্রুত নির্বাচন হবে, তত দ্রুত আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নীতি ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব হবে, যা বিদেশী বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্য অপরিহার্য।
বর্তমান সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজ করেছে—জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যার বিচার ইত্যাদি। এসব সংস্কার টেকসই ও বাস্তবায়ন করতেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জরুরি। নয়তো এসব সংস্কারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে বলা হয়েছে— রাষ্ট্রকে এমনভাবে মেরামত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে। এ লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দ্রুত অগ্রগতি দরকার, যার কেন্দ্রে রয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বাস্তবতায় একটি নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন তাই জরুরি হয়ে পড়েছে। তেমন একটা নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক আবারো কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হবে- সেটি কাম্য নয়।










