সম্প্রতি দুটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে জাতিপ্রশ্ন জনপরিসরে হাজির হয়েছে। এর মধ্যে একটি গর্হিত অপরাধমূলক কাজ, অন্যটি সংস্কার সুপারিশ। এক পক্ষের মিছিলে আরেক পক্ষ হামলা করে গুরুতর আহত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের সংস্কার প্রস্তাব সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে।

সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ঘটনার মধ্যে অবশ্য একটি যোগসূত্র আছে। বাংলাদেশী নাগরিক বিভিন্ন জাতিসত্তার শিক্ষার্থী ও অ্যাক্টিভিস্টদের মিছিলে হামলার পর জাতিপ্রশ্ন আবারো আলোচনায়। তদ্রূপ সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত সংবিধান সুপারিশে মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ বাদ দেয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে মূলনীতি হিসেবে ‘বহুত্ববাদ’ প্রস্তাব করা হয়েছে। বহুত্ববাদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী, বহু-জাতি, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

এ নিয়ে কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে।

বিদ্যমান সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করে যে মূলনীতির জাতীয়তাবাদ মূলত ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। বাহাত্তরের সংবিধানের জাতিবাদী পক্ষপাতিত্ব এর ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে খর্ব করে। একটি জাতিবাদী-সাম্প্রদায়িক সংবিধান কখনই নাগরিকদের প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ করতে সক্ষম হয় না। গত পাঁচ দশকের ইতিহাস আমাদের দাবির পক্ষে সাক্ষ্য হয়।

বাংলাদেশ এক জাতির দেশ নয়, বহু-জাতির দেশ। এখানে কেবল বাঙালিরা জাতি, বাকিরা সবাই ‘উপজাতি’—অভ্যুত্থানের পর এমন আওয়ামী জাতিবাদী রাজনীতির সুযোগ আর নেই। আসন্ন নতুন সংবিধানে বাংলাদেশে অবস্থিত সব জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকতে হবে। চাকমা জাতি, মারমা জাতি, সান্তাল জাতি হিসেবে তারা পরিচিত হবেন। আবার নাগরিকত্বের দিক থেকে সবাই বাংলাদেশী হবেন। বাংলাদেশী বাঙালি, বাংলাদেশী মান্দি, বাংলাদেশী গারো ইত্যাদি পরিচয়ে পরিচিত হবেন।

বিদ্যমান সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের জনগণকে জাতি হিসেবে ‘বাঙালি’ এবং নাগরিকদের বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবাঙালি জনগণকে জাতিত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জোরপূর্বক বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

ওই অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে বাংলাদেশী বলা হলেও কেবল বাঙালিদের জাতির সদস্য হওয়ার অধিকার দিয়েছে। অন্য কথায়, জাতি ও জনগণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে বাঙালি হওয়ার চাপ তৈরি করা হয়েছে। বাহাত্তরের মুজিববাদী জাতিবাদী সংবিধান জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়ার পর থেকে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

আমাদের অবশ্যই জনগণের বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করতে হবে। নাগরিকত্বের জন্য জনগণের সব অংশকে একই জাতির সদস্য হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একই রাষ্ট্রে একাধিক জাতিসত্তার মানুষ অভিন্ন নাগরিক পরিচয় বহন করতে পারে। এ কারণে অনাগত গণতান্ত্রিক সংবিধানের জন্য জাতীয় নাগরিক কমিটির তরফ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থিত সব জাতিসত্তার সাংবিধানিক পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশী হিসেবে পরিচিত হবেন। আশার কথা এই যে ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি’ কমিশন এ বর্ণবাদী ধারা বাতিলের সুপারিশ করেছে।

বাংলাদেশী বাঙালি, বাংলাদেশী চাকমা, বাংলাদেশী মান্দি, বাংলাদেশী সান্তাল—এমন যুগপৎ পরিচয়ে এ দেশের জনগণ পরিচিত হবেন। পাশাপাশি সব জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতি রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক এভাবেই বিকশিত হওয়ার রেওয়াজ।

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, যারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা চান, তারাই আবার বাহাত্তরের সংবিধানের জাতিবাদী-সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। জাতি-নিরপেক্ষতার ব্যাপারে তাদের কোনো অবস্থান দেখা যায় না। বাহাত্তরের সংবিধানের উগ্র বাঙালি জাতিবাদী ভাবাদর্শ এ দেশের সব নাগরিককে ‘বাঙালি’ হয়ে যেতে বলে। একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার টোকেনিজম; অন্যদিকে জাতিবাদী-বর্ণবাদ—এই মিলে বাহাত্তরের সংবিধান। ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ গেল বলে যারা উদ্বিগ্ন, বাহাত্তরের সংবিধানের জাতিবাদী ভাবাদর্শের ব্যাপারে তাদের সমালোচনা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

জাতি, জনগণ ও নাগরিক প্রশ্নে কী লেখা আছে বাহাত্তরের সংবিধানে? বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী। এর মাধ্যমে দ্বিস্তরের নাগরিকত্ব সৃষ্টি করা হয়েছে। এক পক্ষ জাতির সদস্য ও নাগরিক। অন্যপক্ষ জাতির সদস্য নয়; স্রেফ নাগরিক। অর্থাৎ জাতি ও জনগণের সদস্য হতে হলে আপনাকে বাঙালি হতে হবে।

এর সঙ্গে বিশ্বের আরেকটি রাষ্ট্রের নাগরিকতার মিল আছে। সেটি হচ্ছে অবৈধ দখলদার ইসরায়েল রাষ্ট্র। ইসরায়েল রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব দুই ধরনের। একটিকে বলা হয় হলো ন্যাশনাল সিটিজেন তথা ‘জাতীয় নাগরিক’। ইসরায়েলের ইহুদিরা, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে শ্বেতাঙ্গ ইহুদি নাগরিকরা সেখানকার ‘জাতীয় নাগরিক’। অন্যদিকে আটকে পরা ফিলিস্তিনি মুসলমান ও খ্রিস্টানরা ফরমাল বা কাগুজে সিটিজেন। তাদের তেমন কোনো নাগরিক অধিকার জোটে না। (এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত দেখুন: প্রকাশিতব্য বই ফিলিস্তিন: একুশ শতকের উপনিবেশের ইতিহাস, সারোয়ার তুষার)

এ রকম একটি জাতিবাদী সংবিধান নিয়ে বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ দেশের প্রগতিশীল সমাজ মোটাদাগে সন্তুষ্ট! এখন বহুত্ববাদ তথা প্লুরালিজম সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, এ অগ্রগতিকে অনেকে মানতে পারছেন না। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে হাহাকার লক্ষ করা যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে এ আবেগ যতটা না ‘সেক্যুলার’; তার চেয়ে অনেক বেশি ধর্মতাত্ত্বিক। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মূলত ধর্মতাত্ত্বিকতা। কথাটা প্যারাডক্সিক্যাল শোনালেও বাস্তবতা এমনই।

বহুজাতির বাংলাদেশের নাগরিকরা ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তায় বিন্যস্ত। এ বিপুল বৈচিত্র্যকে এক শব্দে ধরা মুশকিল। ‘বাঙালি’ বনাম ‘আদিবাসী’ এমন অহেতুক বিভাজন তৈরির সম্ভাবনাও কাম্য নয়। ‘আদিবাসী’ শব্দের ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকা সম্ভব। এর দ্বারা কারা আগে বা পরে এসেছে তা হয়তো নির্দেশ করা হয় না। তবু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেকের কাছে ‘আদিবাসী’ শব্দের অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে ‘আদি নিবাসী’। এ কারণে আমরা মনে করি, প্রত্যেকে বাংলাদেশী নাগরিক এবং তাদের নিজ নিজ জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকতে হবে। পাশাপাশি সবার ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির অধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকবে।

বাহাত্তরের গণপরিষদে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার অবস্থানের সঙ্গে আমাদের এ অবস্থান সংগতিপূর্ণ। তিনি শেখ মুজিবের ‘তরা বাঙালি হয়া যা’-এর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন—তার পূর্ব প্রজন্ম কখনই তাকে বলেনি যে তিনি ‘বাঙালি’। তিনি বাংলাদেশী নাগরিক এবং জাতিতে চাকমা।

জাতীয়তাবাদের যুগ ফুরিয়ে গেছে। কেবল দুই ক্ষেত্রেই ‘জনগণ’ ধারণাটা সদর্থক। এক. যখন সংঘবদ্ধ মানুষ কোনো নতুন রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। দুই. যখন সংঘবদ্ধ মানুষ কোনো বিদ্যমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; যে রাষ্ট্র এরই মধ্যে গণঅভিপ্রায় ও গণরায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে।

অন্যান্য সব ক্ষেত্রে, ‘জনগণ’ শব্দটি মূলত রাষ্ট্র, সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকলাপের সাফাই-গাতক হিসেবে এস্তেমাল করা হয়ে থাকে। এ কারণেই দার্শনিক আলাঁ বাদিউ মহাশয় যেকোনো ‘বিশেষণ + জনগণ’কে সন্দেহের চোখে দেখার ফরমায়েশ করেন। কারণ তা মূলত রাজনীতিবিদদের নিজেদের গণবিরোধী কর্মকাণ্ড জাতিগর্বের পর্দায় ঢেকে দেয়ার পাঁয়তারা মাত্র, যেমন ‘ফরাসি জনতা’, ‘বাঙালি জনতা’, ‘ভারতীয় জনতা’ ইত্যাদি। মূলত জাতিবাদী উন্মাদনা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এ ধরনের শব্দবন্ধনীর প্রয়োগ শাসক শ্রেণী করে থাকে।

তবু কথা থাকে। যদি কোনো ঔপনিবেশিক শক্তি কোনো জনগোষ্ঠীর ‘জনগণ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের হককে দমিয়ে রাখে কিংবা অস্বীকার করে; কেবল তখনই ‘বিশেষণ+জনগণ’ এস্তেমাল করা ন্যায্য হবে। কাজেই পাকিস্তানি নব্য-ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশী জনগণ’ এবং ফরাসি দখলদারদের বিরুদ্ধে ‘আলজেরিয়ান জনগণ’ ব্যবহার করার ন্যায্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না।

জাতিরাষ্ট্র ইউরোপের বিশেষ অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের ফসল। উপনিবেশ কায়েমের মাধ্যমে পৃথিবীতে তারা এ ধারণা চাপিয়ে দিতে পেরেছে। এক্ষেত্রে দুনিয়ার পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকে আমলে নেয়া হয়নি। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। রাষ্ট্র হবে একটি অধিপতি জাতির রাষ্ট্র—এমন সর্বনাশা ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী ধ্যানধারণা আজও প্রতাপ বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে। জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ছাপিয়ে একটি বিঔপনিবেশিক অ-জাতিবাদী রাষ্ট্রপ্রকল্প অনুসন্ধান করা প্রয়োজন যেখানে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ একই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে সহাবস্থান করতে পারবে। চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার প্রকল্প তেমন একটি গণতান্ত্রিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্রপ্রকল্পের সম্ভাবনা হাজির করেছে।

সারোয়ার তুষার: লেখক ও চিন্তক; যুগ্ম আহ্বায়ক,

জাতীয় নাগরিক কমিটি