এয়ার ইন্ডিয়ার AI171 বিমান দুর্ঘটনার প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে ১১ জুলাই। অর্থাৎ দুর্ঘটনার এক মাস পর। সারা পৃথিবীর সব শীর্ষ মিডিয়া ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এ রিপোর্টকে পাইলট বনাম পশ্চিমা করপোরেট স্বার্থরক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখছে। এ প্রেক্ষাপটে নিচের লেখাটি একটি একাডেমিক আলোচনা মাত্র।

১২ জুন ২০২৫। নিজের গ্রাম লক্ষ্মীনগর থেকে আহমেদাবাদ শহরের বেড়াতে এসেছিল আরিয়ান আসারি। বয়স ১৭ বছর হলেও শহরে তার আসা এই প্রথম। উদ্দেশ্য দ্বাদশের বইপত্র কেনা। এর ফাঁকে সে হাজির হয় বিমানবন্দরে। কাছ থেকে দেখা হয়নি কোনো বিমান। কি সুবিশাল ডানায় ভেসে উড়ে চলে এ যন্ত্রপাখিগুলো—শখের মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে উড়ে যাওয়া একটা বিমানের মাত্র ২৪ সেকেন্ডের ভিডিও। আর তাতেই ধরা পড়ে আধুনিক ইতিহাসের এক বৈচিত্র্যপূর্ণ বিমান দুর্ঘটনা। ২৪২ যাত্রী নিয়ে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার AI171। উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি ইঞ্জিনের শক্তি হারিয়ে আহমেদাবাদের বিজে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মাত্র একজন ব্রিটিশ নাগরিক বের হয়ে আসতে পারে। প্রায় ১১৫ টন জেট ফুয়েলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ২৪১ মানুষ সমেত বিশাল বিমানটি।

বিমানের পাইলট ইন কমান্ড ছিলেন ৫৬ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন সুমিত সাবরওয়াল যার ছিল ৮ হাজার ৬০০ ঘণ্টা ড্রিমলাইনারেরসহ ১৫ হাজার ৬০০ ঘণ্টার উড়ার অভিজ্ঞতা। ১ হাজার ১০০ ঘণ্টা ড্রিমলাইনারেসহ ৩ হাজার ৪০০ ঘণ্টার অভিজ্ঞতা ছিল ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্ডারের, যে মাত্র জীবনের ৩২টা বছর পার করেছে। যেকোনো বিচারে এটি একটি চমৎকার কম্বিনেশন। অন্যদিকে ড্রিমলাইনার বা বোয়িং ৭৮৭ হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ এবং দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে সক্ষম বিমান। এত সুন্দরের মাঝে কেন বিমানটা উড্ডয়নের পরপর দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে নেমে পড়ল একটা বিল্ডিংয়ের ছাদে—এমন প্রশ্ন খুঁজছেন সবাই।

উড্ডয়নের পরপর সারা বিশ্বের পাইলট, বিমান সংস্থা এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলো নেমে পড়েছিল রহস্য উদ্ঘাটনে। এটাই স্বাভাবিক। এয়ার ইন্ডিয়া, ভারত, বিমান ডিজাইন ও নির্মাণকারী দেশের প্রতিনিধি হিসেবে NTSB (USA), AAIB-UK, GPIAAF-Portugal, Transport Canada, Boeing (বিমান প্রস্তুতকারী) ও General Electric-সহ (ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী) অনেক রাষ্ট্র বা সংস্থা নিজেদের মতো তদন্ত করতে শুরু করে। অবশেষে ১২ জুলাই অর্থাৎ ঠিক এক মাস পর ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা এয়ার অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাদের প্রাপ্ত ফাইন্ডিংস অবিশ্বাস্য:

উড্ডয়নের ৩ সেকেন্ড পর, দুটি ইঞ্জিনের ফুয়েল সুইচ “RUN” থেকে “CUTOFF” অবস্থায় চলে যায়। প্রথমটির ঠিক ১ সেকেন্ড পর দ্বিতীয় ইঞ্জিনের ফুয়েল সুইচ অফ করে দেয়া হয়। ফলে দুই ইঞ্জিনই জ্বালানি হারায় ও বিমানটি থ্রাস্ট হারিয়ে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। পাইলট কারণ আবিষ্কারের পর পরই ১৪ সেকেন্ডের মাথায় সুইচ দুটো “রান” পজিশনে নিয়ে আসে। এতে ধীরে ধীরে প্রথম ইঞ্জিন অন হলেও দ্বিতীয় ইঞ্জিন অন হতে ব্যর্থ হয়। ফলে ধীরে ধীরে বিমান তার উচ্চতা হারিয়ে ফেলে। ককপিট ভয়েস রেকর্ডার থেকে আসে অদ্ভুত এক আলাপ:

একজন পাইলট বলেন: ‘‌তুমি কেন বন্ধ করলে?’

অন্য পাইলট উত্তর দেন: ‘‌আমি করিনি’।

ফুয়েল সুইচ দুটো খুব শক্ত। একাকী অফ পজিশনে চলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। প্রথমে টেনে ওপরে তুলতে হবে। পরে শক্তি দিয়ে টেনে নিচে নামাতে হবে। এরপর দ্বিতীয় সুইচ। এতে অবধারিতভাবে বলা যায় যে দুজন পাইলটের একজন এ কাজ করেছে এবং সে মিথ্যাও বলেছে।

ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার থেকে জানা যায় যে বিমানটির পাইলট ফ্লাইং (পিএফ) অর্থাৎ বিমানটি চালাচ্ছিলেন কো-পাইলট ক্লাইভ কুন্ডার যা বিমান চালনার ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। সবচেয়ে ক্রুসিয়াল সময় হলো টেকঅফ যখন পাইলট ফ্লাইং দুহাতে কন্ট্রোল ধরে রাখে এবং সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এসব পাইলট মনিটরিং (পিএম) দুই পাইলট সিটের মাঝে থাকা পাওয়ার লিভার, ল্যান্ডিং গিয়ার, ফ্ল্যাপসহ অন্য কাজগুলো সম্পন্ন করে এবং পিএফকে অবহিত করে। ফলে চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় পিএম হিসেবে কাজ করা মূল পাইলট ক্যাপ্টেন সুমিত সাবরওয়াল কাজটি করেছেন। ফুয়েল সুইচ দুটো অফ করে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছেন।

১২ মাসে মধ্যে পুনঃতদন্ত রিপোর্ট হাতে আসার আগে আমাদের এ তথ্য নিয়েই চলতে হবে। এর মাঝে এয়ারক্রাফট বা ইঞ্জিনের কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। সেই সঙ্গে আবহাওয়া ছিল চমৎকার। আশপাশে কোনো পাখি ছিল না, যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই আপাতত বলা যেতে পারে কোনো একজন পাইলট এজন্য দায়ী।

একজন পাইলট হিসেবে আমি অন্য পাইলটকে দোষারোপ করতে পারি না যথাযথ প্রমাণ বা দলিলাদি ছাড়া। এয়ার ইন্ডিয়ার ঘটনায় ফুয়েল সুইচ কি ইচ্ছাকৃতভাবে অফ করা হয়েছিল এমন কনক্লুসিভ মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমার নেই। তাই হাতে পাওয়া এ রিপোর্ট এবং সাধারণ জ্ঞান থেকে বলতে পারি এটি কোনো এক পাইলটের ইচ্ছাকৃত কাজ হতে পারে। আমরা একটা সুইসাইড থিওরি নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

পাইলট ইচ্ছা করে একটি বিমানকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে অনেকবার ঘটেছে। যেমন—

৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮২ জাপান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৩৫০ বিমানটি ফুকুওকা থেকে টোকিও হানেদা বিমানবন্দরে অবতরণের সময় পাইলট কাপ্টেন সেও কোহাই হঠাৎ উড়ন্ত অবস্থায় থ্রাস্ট রিভার্স চালু করেন যা সাধারণত রানওয়েতে ব্যবহৃত হয় বিমান দ্রুত থামাতে। এতে বিমানটির গতি হঠাৎ কমে যায় ও রানওয়ের কাছেই টোকিও উপসাগরে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর তদন্তে জানা যায় যে পাইলট মানসিক অসুস্থতায় (paranoid schizophrenia) ভুগছিলেন। দুর্ঘটনায় ৩২৪ যাত্রীর মধ্যে ২৪ জন নিহত হলেও মানসিক অক্ষমতার কারণে আদালত তাকে মুক্তি দেয়।

২১ আগস্ট, ১৯৯৪ রয়্যাল এয়ার মরোক্ক ফ্লাইট ৬৩০ পাইলট বিমানটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিধ্বস্ত করেন এবং নিহত হন ৪৪ জন।

১৯ ডিসেম্বর, ১৯৯৭ সিল্ক এয়ার ফ্লাইট ১৮৫ বিমানটি ইন্দোনেশিয়ায় একটি নদীতে বিধ্বস্ত হয়। আমেরিকার NTSB এটিকে পাইলটের ইচ্ছাকৃত কাজ বলে ঘোষণা করে।

৩১ অক্টোবর, ১৯৯৯ ইজিপ্ট এয়ার ফ্লাইট ৯৯০ একজন পাইলট অটোপাইলট ডিসকানেক্ট করে ইঞ্জিন বন্ধ করেন। এতে বিমানটি সমুদ্রে পড়ে যায় এবং ২১৭ জনের মৃত্যু হয়।

২৯ নভেম্বর, ২০১৩ ল্যাম মোজাম্বিক এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৪৭০-এর ক্যাপ্টেন ককপিটে সহপাইলটকে ঢুকতে না দিয়ে নিজে বিমানটি ধ্বংস করেন যাতে নিহত হন ৩৩ জন।

২৪ মার্চ, ২০১৫ তারিখে জার্মান উইংস ফ্লাইট ৯৫২৫ কো-পাইলট ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানটিকে ফ্রেঞ্চ আল্পস পর্বতে বিধ্বস্ত করেন। এতে ১৫০ জন মারা যান।

মানসিক অবসাদ: পাইলটদের নীরব ঘাতক

মানসিক অবসাদ বা ক্লান্তি পাইলটদের কীভাবে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে বিশদ গবেষণা রয়েছে। ২০১৬ সালের ১ এপ্রিলে প্রকাশিত Suicide and Murder-Suicide Involving Aircraft (Christopher Kenedi, Susan Hatters Friedman, Dougal Watson, Claude Preitner) গবেষণাটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তারা দেখতে পেয়েছে যে উড্ডয়ন ইতিহাসে ৬৫টি পাইলটদের আত্মহত্যার ঘটনা এবং ছয়টি ঘটনা পাওয়া গেছে যেখানে যাত্রী বিমান থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। এছাড়া ১৮টি হত্যা-আত্মহত্যার (Murder-Suicide) ঘটনা পাওয়া গেছে যেখানে ৭৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা আরো বলে যে বিমান দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ছিল হত্যা-আত্মহত্যা (১৭ শতাংশ)। অন্যদিকে আরেকটি সূত্র বলছে, ১৯৯১-২০২০ সালের মধ্যে, আত্মহত্যাজনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেড়েছে, যেখানে দুর্ঘটনাজনিত কারণ কমেছে। বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে ২০১১-২০ সাল পর্যন্ত পাইলট হত্যা-আত্মহত্যা ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ। এমন প্রমাণ রয়েছে যে পাইলটদের আত্মহত্যা বা হত্যা-আত্মহত্যার মিডিয়া রিপোর্টের পর পাইলটদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। সব ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কারণগুলোর মধ্যে ছিল আইনি ও আর্থিক সংকট, পেশাগত দ্বন্দ্ব, মানসিক অসুস্থতা এবং সম্পর্কের টানাপড়েন।

পাইলটদের মধ্যে কঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রচলিত সব আইনের প্রতি সর্বোচ্চ মাত্রার কমপ্লায়েন্স কাম্য। প্রতি বছর তাদের মেডিকেল ফিটনেসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাশাপাশি সারা বছর ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা বা ফ্লাইট টেস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাদের জন্য সর্বাধুনিক সিমুলেটর ট্রেনিংয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সব এয়ারলাইনস খুব খুশি মনে এসব ব্যয়ভার বহন করে। পাইলটদের চোখ ধাঁধানো বেতন দেয়া হয়, বিভিন্ন শহরের সেরা হোটেলে রাখা হয় বা সেরা রেস্তোরাঁয় খাবারের ব্যবস্থা করে। কারণ এরাই বাণিজ্যলক্ষ্মী। এরা ব্যবসা ও ব্র্যান্ড দুটিই সচল রাখে।

আপাতদৃষ্টিতে চরম সুখী এয়ারলাইনস পাইলটদের পেছনে থাকে কষ্টের উদাহরণ যা তাদের আত্মত্যাগের ফসল। দীর্ঘ সময় ধরে তারা থাকে পরিবার বিচ্ছিন্ন। সামাজিক অনুষ্ঠান, মেলামেশা তারা জীবন থেকে মুছে ফেলে। বন্ধুরা যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে সামাজিক জীবনযাপন করে, তারা তখন পৃথিবীর আরেক প্রান্তে অপেক্ষা করে পরবর্তী ফ্লাইট ধরার জন্য। প্রথম দিকে অর্থ মূল শক্তি হলেও একসময় তারা পারিবারিক টান অনুভব করে প্রচণ্ডভাবে। দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে অনেক ক্ষেত্রে জন্ম নেয় অবিশ্বাস। প্রায় সবাই এ সমস্যা থেকে উতরালেও কেউ না কেউ নিজের অজান্তে মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়।

পাইলটরা সাধারণত দুই ধরনের ক্লান্তিতে আক্রান্ত হন। শরীরের ওপর চাপ বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে শারীরিক ক্লান্তি ঘটে, যা পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুমের মাধ্যমে দূর হয়। অন্যদিকে মানসিক ক্লান্তি হলো এক ধরনের মানসিক চাপ যা দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করা, অতিরিক্ত চিন্তা বা মানসিক অস্থিরতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, একঘেয়েমি জীবন ইত্যাদি দ্বারা সৃষ্টি হয়। ফলে কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হয়, স্মৃতিশক্তি আক্রান্ত হয় বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয়। মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও মানসিক ক্লান্তির কারণ হতে পারে। যখন ক্লান্তি দীর্ঘ সময় ধরে (যেমন ছয়মাস বা তার বেশি) স্থায়ী হয় এবং বিশ্রাম নিলেও দূর হয় না, তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বলে। এটি অনেক সময় ক্রনিক ফাটিগ সিনড্রোম (সিএফএস) বা মায়ালজিক এনসেফ্যালোমাইলাইটিসের (এমই) মতো গুরুতর অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। অধিকাংশ পাইলট এটা আগে থেকে ধরতে পারলেও হাতেগোনা কয়েকজন উতরাতে না পারাটা স্বাভাবিক।

মানসিক অবসাদের প্রভাবে পাইলটদের যেসব ক্ষতি হতে পারে তা হলো ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা হ্রাস, মনোযোগ এবং একাগ্রতার অভাব, প্রতিক্রিয়ার সময় বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে চাপ এবং কর্মদক্ষতার অবনতি ইত্যাদি। কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর অবসাদ পাইলটদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। ২০১৫ সালের জার্মানউইংস ফ্লাইটের ঘটনা এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ, যেখানে একজন কো-পাইলট তার গুরুতর অবসাদ গোপন রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে বিমান বিধ্বস্ত করেছিলেন, ফলে ১৫০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। প্রায় সব ক্ষেত্রে পাইলটরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকাশ করেন না। নিয়ম অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানালে তাদের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত হতে পারে। এ ভয়ে অনেক পাইলট তাদের সমস্যা গোপন রাখেন ফলে তারা সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।

অনেক সময় এয়ারলাইনসগুলো অতিরিক্ত ডিউটি চাপিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক আইনে ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশনস বা এফডিটিএল নামে একটা আইন আছে। এখানে পরিষ্কার উল্লেখ আছে পাইলটদের কত ঘণ্টা ডিউটি দেয়া যাবে বা কীভাবে বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। এয়ারলাইনগুলো পাইলট সংকটের অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে এসব নিয়মের ব্যত্যয় করে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিমান সংস্থার বিমান নেপালে বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে পাইলটদের অতিরিক্ত ডিউটিজনিত ক্লান্তির উদাহরণ আছে বলে প্রকাশ।

২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর এলএএম মোজাম্বিক এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৪৭০ নামের একটি যাত্রীবাহী বিমান নামিবিয়ার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ২৭ যাত্রী ও ছয়জন ক্রুসহ সবাই নিহত হন। দুর্ঘটনার পর নামিবিয়ার তদন্ত সংস্থা এবং অন্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ব্ল্যাকবক্স (ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডার) বিশ্লেষণ করে এক ভয়ানক সত্য উদ্ঘাটন করে যেখানে প্রমাণ হয় ক্যাপ্টেন হার্মিনিও ডোস সান্তোস ফার্নান্দেজ ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানটি বিধ্বস্ত করেন। তদন্তে জানা যায়, কয়েকদিন আগে তার ছেলে মারা গিয়েছিল এবং সেই সময় তিনি বিচ্ছেদ ও মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন।

এভিয়েশন জগতে মানসিক অবসাদ বা ক্লান্তির বিষয়টি এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময় হয়েছে। সেই সঙ্গে পাইলটদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা অফিশিয়াল চ্যানেল নয়, বরং সহকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে, যারা সবার আগে সবকিছু টের পান। সবার ওপরে আছে তো কঠোর শৃঙ্খলা যা আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই।

এয়ার ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো ক্যাপ্টেন সুমিত সাবরওয়ালের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা ভারতের পাইলট সমাজ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তবে ককপিটে পাওয়া কথোপকথন এবং টেকঅফের ১ সেকেন্ডের মধ্যে দুটি ফুয়েল সুইচ টেনে অফ করে দেয়া যে ভৌতিক কাজ নয়, তা অনায়াসে বলা যায়। বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের মাত্র ১১ মাস অপেক্ষা করতে হবে।

কর্নেল মো. সোহেল রানা: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও পাইলট