দেশের মোট জিডিপিতে রাজধানী ঢাকার অবদান এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। মোট কর্মসংস্থানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অবদান রাখছে মেগাসিটি ঢাকা। যদিও অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, অপরিকল্পিত আবাসন, অসহনীয় যানজট, পরিবেশ দূষণ, মৌলিক সুবিধাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে ঢাকা অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। পরিকল্পিত রাজধানী গড়ে তুলতে একের পর এক পরিকল্পনা আর মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেগুলোর প্রায় সবই থেকে গেছে নিষ্ফল। বিপরীতে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারছে না। অথচ একটি বিষয়ে দেশের বিশেষজ্ঞদের প্রায় সবাই একমত পোষণ করছেন যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে ঢাকার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানো অপরিহার্য।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাধীন অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের অর্থনীতির আকর্ষণীয়তার একটি সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করে। গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স-২০২৫ এ ঢাকার স্থান ৪৮২তম। বিশ্বের এক হাজার শহরের মধ্যে ঢাকার এ অবস্থান শুধু হতাশাজনক নয় বরং উদ্বেগজনক। অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনমান, পরিবেশ ও শাসন ব্যবস্থা এ পাঁচ সূচকে ঢাকার অবস্থান প্রমাণ করে যে উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, বরং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক সেবার ভিত্তিতে বিবেচ্য।

শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ-সংস্কৃতির কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকায় জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উচ্চহারে। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সীমিত জায়গায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস হলেও নগরীর আবাসন, যোগাযোগ, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আনুষঙ্গিক সব অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাস করছে ঢাকাবাসী, যেগুলোয় নাগরিক পরিষেবা পেতে পদে পদে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। তীব্র যানজটে কমেছে শহরের মানুষের গতি। ঢাকার ফুটপাতও পথচারীবান্ধব নয়। স্বাস্থ্য অবকাঠামো অপ্রতুল। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও অপর্যাপ্ত; নেই খেলার মাঠও।

প্রতিবেদনে মানবসম্পদ সূচকে ঢাকার অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো দেখালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শ্রীলংকা বাংলাদেশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম শ্রমশক্তি রফতানি করেও তিন-চার গুণ বেশি রেমিট্যান্স আয় করছে। এর মূল কারণ তাদের শ্রমশক্তি অধিক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত। বিপরীতে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের একটি বড় অংশ অদক্ষ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন গ্র্যাজুয়েটরাও রয়েছে। দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে দিন দিন শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে। যদিও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখনো যথেষ্ট নয়। ফলে মানবসম্পদকে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে অত্যন্ত প্রকট। নদীভাঙন, পানির সংকট, কৃষিতে বিরূপ পরিবর্তনসহ নানা কারণে বহু মানুষ তাদের গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে। ফলে ঢাকায় প্রতিদিনই জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভোক্তার সংখ্যাও। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে ঢাকায় যেকোনো ব্যবসা চালু করলে কোনোভাবে টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হয়। জনসংখ্যার এ ঘনত্ব ও বাজারের প্রসার ঢাকার অর্থনৈতিক গুরুত্বকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তুলেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হচ্ছে না। কারণ শহরের উন্নয়নে নেই সুপরিকল্পিত নীতি। আর যেটুকু পরিকল্পনা আছে, সেটিও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এসব কারণে বরং ঢাকার পরিবেশগত সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকা। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজ এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ক্যান্সারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুর মতো নদীগুলোয় বর্জ্য ও শিল্পবিষাক্ত পদার্থ ফেলা হচ্ছে নিয়মিত। স্যুয়ারেজ ও অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ায় দূষিত হচ্ছে পানি। এতে জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে এবং বিশুদ্ধ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ ও জনবহুল এলাকার কোলাহলে শব্দদূষণ মারাত্মক মাত্রায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ঢাকায় শব্দদূষণ অনেক বেশি। ফলে মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও শিশুদের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ঘরোয়া, বাণিজ্যিক ও চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পরিবহন বা নিষ্পত্তি করা হয় না। বর্জ্য স্তূপে জীবাণু ছড়ানো, মশা-মাছির বিস্তার এবং পচা গন্ধ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে উন্মুক্ত মাঠ, বৃক্ষ ও উদ্যান হারিয়ে যাচ্ছে। এটি শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বাতাসের বিশুদ্ধতা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নালা-নর্দমার দখল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটিই মূল কারণ। এতে যানজট বাড়ছে, জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে ও পানিবাহিত রোগ ছড়াচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও নজরদারির অভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

রাজধানী হিসেবে ঢাকা সুপরিকল্পিত হওয়া অতীব জরুরি ছিল। কেননা যেকোনো দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রাজধানী থেকেই পরিচালিত হয়। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম হলেও এখনো বেশির ভাগ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র ঢাকা। তাই ঢাকা যদি আরো সুসংগঠিত হতো তাহলে সেটি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারত। আবার এখানে পর্যটন শিল্প বিকাশের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানো যেত, বিশেষত যখন ঢাকার আছে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানী পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু যানজটের ঢাকায় নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় দেশী-বিদেশী পর্যটকদের।

আগামী বছর বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জোরালো প্রস্তুতি প্রয়োজন। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপান্তর করতে হলে ঢাকার অর্থনৈতিক আকর্ষণ বাড়ানো জরুরি। এজন্য ঢাকার পরিবেশ বাণিজ্য-বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। ঢাকাকে অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শহরে পরিণত করতে হলে সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। নগর ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা ও সুশাসন—চারটি প্রধান ক্ষেত্রের উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া উচিত। সুশাসন ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, টেকসই অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, বিনিয়োগ ও রফতানি উৎসাহ, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও উদ্যোগসহ অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের নজর দেয়া উচিত। এমন একটি দূরদর্শী, একীভূত ও কার্যকর কৌশল প্রয়োজন, যেখানে সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজ একযোগে কাজ করবে।