আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। এ শিক্ষা জাতি গঠনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য সারা বিশ্বেই প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। তাই সারা বিশ্বেই এটি বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও সবার জন্য শিক্ষার সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। সারা বিশ্বে প্রাথমিকে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে ১১ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পাঁচ ধরনের কারিকুলাম। ফলে সেখানে শিশুদের পড়ানো হয় ভিন্ন সিলেবাসে। সরকারির তুলনায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়। এতে শিক্ষায় বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা দুর্বলই থেকে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা যদি মজবুত না হয়, তাহলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হতে বাধ্য। প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারি অর্থায়নেই প্রাথমিক শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় নামমাত্র সুযোগ-সুবিধায় চলছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অবকাঠামোগত সংকট প্রকট। অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক বিদ্যালয়ে খেলাধুলার পর্যাপ্ত জায়গা, পরিচ্ছন্ন শ্রেণীকক্ষ তথা উপযুক্ত অবকাঠামো নেই। নেই মানসম্মত শিক্ষক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম। তাছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস ও পড়ানোর ধরন সচেতন অভিভাবকের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। ফলে অভিভাবকরা এসব প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাতে চান না। ঢাকায় অন্য মাধ্যমের বিদ্যালয়ের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধাও কম। শিক্ষার্থীদের প্রতি বেসরকারি মাধ্যমের শিক্ষকদের মতো যত্নশীল হবেন বা কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়লে আলাদাভাবে অতিরিক্ত সময় দেবেন এমন কোনো ব্যবস্থাও নেই। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ক্রমেই কমছে শিক্ষার্থী, যা খুবই উদ্বেগজনক প্রবণতা। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রাথমিক শিক্ষা পরিসংখ্যান (২০২৩) অনুযায়ী, ঢাকা জেলার প্রাথমিক পর্যায়ের মাত্র ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, ঢাকা জেলায় ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। ঢাকাসহ সারা দেশেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ঢাকায় এ প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে ঢাকা জেলায় অপরিকল্পিতভাবে প্রচুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসাসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের আকর্ষণ করতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়। তারা অভিভাবকদের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম সাজায়। ফলে সামর্থ্যবানরা সন্তানের জন্য কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। ঢাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে হলে অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার শিশুদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করতে হলে বিদ্যালয়গুলোয় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। অবকাঠামো উন্নত হতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীকে একই বই পড়ানো হয় এবং একই ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কারিকুলাম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। এছাড়া ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় শিক্ষায় বৈষম্য বাড়ছে। সামর্থ্যবানরা সন্তানকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো সুযোগ-সুবিধা থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তরা কোনো উপায় না পেয়ে সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু সেখানে শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ না থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশেনায় পিছিয়ে পড়ছে। এসব পার্থক্যের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায় শেষে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার স্তরে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য কমাতে হলে প্রাথমিকে একমুখী শিক্ষার প্রবর্তন করতে হবে। ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বন্ধসহ সরকারি প্রাথমিকে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, তা অনুধাবন করে ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে তৎকালীন সরকার। ফলে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক সরকারি কর্মচারীতে পরিণত হন। ২০১৩ সালে পুনরায় ২৬ হাজার বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। আগের তুলনায় শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা কিছুটা বেড়েছে। তবে তা বর্তমান বাস্তবায়তায় পর্যাপ্ত নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে নেই অভিভাবকদের আস্থা। তুলনামূলক সচ্ছল থেকে শুরু করে বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা যাচ্ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়ে। ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে হিমশিম খেলেও বাবা-মা সন্তানকে পাঠাচ্ছে না বাড়ির পাশেই অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর আশু সমাধানে তৎপর হওয়া উচিত।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা। এজন্য দরকার পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। কিন্তু আমাদের শিক্ষায় বাজেট পর্যাপ্ত নয়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ২০২২ সালে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০১৬-২২ সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে গড় ব্যয় ছিল ৪১টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে পঞ্চম সর্বনিম্ন। জিডিপির শতাংশীয় হিসেবে বাংলাদেশের গড় শিক্ষা ব্যয় আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়ে কম। প্রাথমিক যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োজন কঠিন।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে কিন্তু শিক্ষার মান বাড়েনি। প্রাথমিকের ১১ বছরে বাংলাদেশের শিশুরা যা শেখে, তা অন্য দেশের শিশুরা শিখছে সাড়ে ছয় বছরে। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। গত বছর প্রকাশিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫। এর মধ্যে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি ও এইচএসসি পর্যন্ত। নিয়মিত ক্লাস নিলেও শিক্ষকদের একটি বড় অংশই নিজেদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট নন। নিজেদের জ্ঞানের বিষয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস নেই। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে যে শিক্ষকরাই তার শিক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তাহলে শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষা কীভাবে পাবে? অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বলা হচ্ছে, প্রাথমিকে দক্ষ ও ভালো শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তখন অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন চলে আসে। সেটি হলো কেন প্রাথমিকে ভালো শিক্ষক নেই? এর পেছনে অন্যতম কারণ প্রাথমিক শিক্ষকদের নিম্ন বেতন কাঠামো এবং সামাজিক মর্যাদার অনেক অভাব। এশিয়ার দেশগুলোর সমাজ কাঠামোয় বিশেষ করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরে শিক্ষকদের অনেক সম্মানের চোখে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক কম এবং সুযোগ-সুবিধাও অপর্যাপ্ত থাকায় প্রাথমিকে শিক্ষক পেশাকে আকর্ষণীয় মনে করা হয় না। এ কারণে এ স্তরে মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিতরা আসতে অনাগ্রহী। প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকের বেতন ও মর্যাদা বাড়াতে কাজ করতে হবে। তাহলেই যোগ্যরা প্রাথমিকের শিক্ষকতা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হবেন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কারিকুলামকে যুগোপযোগী করা উচিত। শিক্ষার সুফল পেতে বিনিয়োগের হার বাড়াতে হবে সরকারকে। এ পেশায় মানসম্মত ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। অপরিকল্পিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বন্ধ করাও অতীব জরুরি।










