দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি শিল্প খাত। এ খাত মূলত গ্যাস ও বিদ্যুৎনির্ভর। অথচ দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এর প্রধান কারণ কোনো ধরনের জ্বালানির সংস্থান না করেই ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছরে খাতটি জনবিমুখ ও আমদানিনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলেছে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে দ্বিগুণ। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। অলস বসিয়ে রেখে প্রতি বছর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভাড়া বাবদ গুনতে হচ্ছে জরিমানা। ফলে খরচের চাপ সামলাতে ভোক্তা পর্যায়ে দফায় দফায় বেড়েছে বিদ্যুতের দাম এবং দায় বেড়েছে সরকারের। অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে ডেকে আনা হয়েছে দেশের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি। এছাড়া বিনষ্ট করা হয়েছে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতার বাজার। ফলে মুনাফা লুফে নিয়েছে দেশের সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। অর্থ সংকটের কারণে বিগত সরকারের মতোই অন্তর্বর্তী সরকারকেও বন্ডের মাধ্যমে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুপাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় সামান্য গরমেই বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সংস্কারের কথা বলছে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)। সরকার এ উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরে ১২০ কোটি ডলার বা ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবে বলে সংস্থাটির দাবি। এ সাশ্রয় খাতটিতে সরকারের দেয়া ভর্তুকি হ্রাসেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। সুতরাং এ খাতের ব্যয় সাশ্রয়ে পদক্ষেপ নেয়া হোক।
২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বার্ষিক ১ দশমিক ৮ গুণ রাজস্ব বৃদ্ধির বিপরীতে বিপিডিবির বার্ষিক ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ৬ গুণ। ফলে সরকারকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিপিডিবি। আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ভর্তুকি কমাতে সরকারকে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেক জাতীয় গ্রিড থেকে মেটাতে হবে। নতুন করে তিন হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। এর সঙ্গে বছরে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণে অপচয় ৮ শতাংশের মধ্যে রেখে এ অর্থ বাঁচাতে পারে বিপিডিবি।
দেশে ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল ২৭টি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৭ হাজার ৭৯১ মেগাওয়াট। গতকাল দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল সাড়ে আট হাজার থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট। আর উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে আট হাজার থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ দেশে একটা সময়ে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল না। এখন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বিগত সরকার নিজস্ব জ্বালানি—গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে কম গুরুত্ব দিয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে। আগে গ্যাস ও কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল না। আর এখন যন্ত্রপাতি থাকলেও গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কম। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও সক্ষমতার ভাড়া বাবদ ঠিকই জরিমানা গুনতে হচ্ছে।
আবার আর্থিক লোকসান ও সংকটের কথা বলে দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। যার চাপ পড়েছে ভোক্তা পর্যায়ে। এর পরও ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান করে বিপিডিবি। আবার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার জন্যই বিপিডিবির ভর্তুকির বোঝা ক্রমেই ভারী হয়েছে। সরকারি কোষাগার থেকে সংস্থাটিকে ভর্তুকি হিসেবে দেয়া হয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিগত সরকারের মতোই অন্তর্বর্তী সরকারকে বন্ডের মাধ্যমে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ এক ঋণ পরিশোধে অন্য ঋণের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে সরকারকে। এটি যদি নিয়মিত চর্চা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তা উদ্বেগের কারণ। ভবিষ্যতে এ ঋণের বোঝা আরো বাড়বে। বন্ডের মাধ্যমে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ বকেয়া পরিশোধ করা কোনো টেকসই সমাধান নয়।
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশকে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। এর মধ্যে শুধু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। চালানো যায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে বাকি সক্ষমতা ব্যবহার করা যায় না। জ্বালানি তেলভিত্তিক ৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেও উচ্চমূল্য ও জ্বালানি সংকটে সেগুলোও দেড়-দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি ব্যবহার করা হয় না। তবে বাংলাদেশের এখনো নবায়নযোগ্য ক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগ্রহ কম। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ব্যয়ও পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৮৯৩ মেগাওয়াট। আইইইএফএ বলছে, ২০৩০ সালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২৫ হাজার ৮৩৪ মেগাওয়াট হতে পারে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা হলেও ৩৫ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকবে। এতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসহ অতিরিক্ত সক্ষমতা ৩৬ শতাংশে নেমে আসবে। আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল—এমন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাদ দিলে এটি হবে ২০ শতাংশ। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে এটি তুলনীয় হবে। নবায়নযোগ্য ক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের যে সংকট তৈরি হয়েছে তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যাবে। জীবাশ্ম জ্বালানির বিভিন্ন উৎস যেমন প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ তেল ইত্যাদি ব্যবহারের ফলে নিঃশেষিত হয়ে যায়। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস যেমন সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ ইত্যাদির ব্যবহার সহজে নিঃশেষিত হয়ে যায় না। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে উত্তরণের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আর্থিক সাশ্রয়, জনস্বাস্থ্যের ওপর অনুকূল প্রভাব, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস প্রভৃতি সুবিধা রয়েছে। নবায়নযোগ্য ক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জ্বালানি আমদানি বাবদ বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার উভয় ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে, যা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। নবায়নযোগ্য শক্তি প্রসারে বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। জনগণকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নেট মিটারিং, ফিড-ইন-ট্যারিফ ও কার্বন ক্রেডিটের মতো প্রণোদনা দিতে হবে। শিল্প-কারখানাগুলোকে পুরোপুরি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে হবে। গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতি থেকে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে স্থানান্তর হওয়া উচিত। গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে বিদ্যুচ্চালিত বয়লার ব্যবহার করতে পারে শিল্প। এতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ পাবে পিডিবি।
সার্বিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গ্যাস ও কয়লার আমদানিনির্ভরতা উচ্চাভিলাষী ও বাস্তববিমুখ পরিকল্পনা। আমরা এখনো প্রাথমিক জ্বালানির বিষয়টি নিয়ে একটা পরিপূর্ণ সমাধানে আসতে পারিনি। অথচ এর সমাধানও রয়েছে। আমরা সেদিকে অগ্রসর হচ্ছি না। গোষ্ঠী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেছি। অথচ এর খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। সর্বোপরি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের একটি সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে এবং বছরওয়ারি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনাগুলোর একটি বাস্তবভিত্তিক প্রাক্কলন দাঁড় করাতে হবে এবং তার ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যের অস্থিরতা, ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, ভর্তুকি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তা মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার বারবার এবং বিপুলভাবে জ্বালানি গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়েছে। এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসা ও জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ঘটিয়ে অর্থনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ খাতকে যত দ্রুত সম্ভব স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি কমিয়ে সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ খাতকে ব্যয়সাশ্রয়ী খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।










