জার্মানির বার্লিন থেকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদন-২০২৪ প্রকাশ করেছে। দুর্নীতির মাত্রা কোন দেশে কেমন তা নিয়ে প্রতি বছরই প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআই। সিপিআই অনুযায়ী, দুর্নীতির ধারণার মাত্রাকে ০ (শূন্য) থেকে ১০০ (একশ)-এর স্কেলে নির্ধারণ করা হয়। এ পদ্ধতি অনুসারে স্কেলের ০ (শূন্য) স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বোচ্চ এবং ১০০ স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বনিম্ন বলে ধারণা করা হয়।
সিপিআইয়ের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বরাবর এসেছে বাংলাদেশের নাম। এবারো ব্যতিক্রম হয়নি। তবে স্কোরে পরিবর্তন এসেছে। তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ সূচকে দেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ২৩-এ যা আগের বছর ছিল ২৪। অর্থাৎ দুর্নীতি আরো বেড়েছে। এ সূচকে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম। স্কোর (২৩) হিসেবে ১৩ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। সমান স্কোর নিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে কঙ্গো ও ইরান। আর তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৫১তম অবস্থানে রয়েছে।
এর আগে দীর্ঘকাল সিপিআইয়ে বাংলাদেশের স্কোর ২৫-২৮-এ আবর্তিত হতে দেখা গেছে। এমন ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার নিচের দিকে এ দেশের অবস্থান বেশ উদ্বেগজনক। এতে দেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য যেমন বেড়েছে তেমনি আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুফল সমাজে সুষমভাবে বণ্টিত হয়নি। ব্যবসার পরিবেশ ও কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়েছে এতে। যদিও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ, বিশেষত টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা বিগত সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপের কথা শোনা গেছে। তবে সেগুলো যে লোক দেখানো মাত্র তা সিপিআই প্রতিবেদনের দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়।
২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রকাশ উপলক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করেছিলেন। মন্ত্রিসভা গঠনের পর তিনি মন্ত্রীদের দুর্নীতি সম্পর্কে সাবধান করেছিলেন। পরবর্তী সময় জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে দুর্নীতিবিরোধী সুনির্দিষ্ট চারটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যারা দুর্নীতিতে জড়িত, তাদের আত্মশুদ্ধি চর্চা করতে হবে; আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে; তথ্যপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পরে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে শুদ্ধি অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের দলের নেতাকর্মীসহ কাউকে ছাড় দেয়া হবে না মর্মে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সূচকে অনেকে বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতি আশা করেছিল, কিন্তু তা হয়নি। কারণ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ধরে রাখা যায়নি।
বরং ‘যে রক্ষক সেই ভক্ষক’ হিসেবে বিগত সরকারই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নির্ভয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গেছে, যার ক্ষত দেশের আর্থিক ও ব্যাংক খাতে স্পষ্ট। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। জালিয়াতি ও ঋণখেলাপির কারণে জর্জরিত এ খাতের বোঝা সাধারণ জনগণকে বইতে হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা লিপ্ত হয়েছেন সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতিতে। এমনকি পতিত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও কর্তাব্যক্তিরা নানা দুর্নীতি-অনিয়ম ও অর্থপাচারে লিপ্ত হয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে (টিআইবি) সিপিআই-২০২৪ তুলে ধরার সময়ও এসব বিষয়ে আলোকপাত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকার মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও বাস্তবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে এবং দুর্নীতি সংঘটনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেছে। যে কারণে লুটপাট, দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে তোষণ, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা এবং সার্বিক কাঠামোগত দুর্বলতায় বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাবনতি হয়েছে। এসব চিত্র একটি বিষয়কেই স্পষ্ট করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদদের সততা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি। যাদের হাতে রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের ক্ষমতা থাকে, তাদের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিপূর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি দুর্নীতি নির্মূলে গঠিত প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী হওয়া, যাতে সে দুর্নীতি রুখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি দমনের জন্য ২০০৪ সালে দেশে গঠন করা হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু দুর্নীতির চিত্র প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে প্রায়ই ‘নখদন্তহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২০ বছরে দুদকের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। সেগুনবাগিচার আধুনিক ভবনসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় গড়ে উঠেছে দুদকের কার্যালয়। কিন্তু দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সাফল্য প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে পারেনি। বরং দুদক নিজেই একাধিকবার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। এছাড়া দেখা গেছে, অভিযোগের তুলনায় অভিযান ও অনুসন্ধানে গতি কম দুদকের। তাদের স্ব-উদ্যোগে অনুসন্ধানের তৎপরতা দেখা যায় না। যদিও ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’-এর ১৭(গ)-তে ‘দুর্নীতি সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ স্ব-উদ্যোগে বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান’-এর কথা উল্লেখ রয়েছে। গত বছর বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, কেউ অভিযোগ করুক বা না করুক নিজ উদ্যোগে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামতে ২০২২ সালে একটি গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল দুদক। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় গেলেও প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি গাইডলাইন তৈরির জন্য গঠিত কমিটি। অর্থাৎ দুর্নীতি দমন দূরের কথা, পর্যাপ্ত অনুসন্ধানের জন্য নিজস্ব গাইডলাইনও প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করতে পারেনি।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দুর্নীতি রুখতে দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এ কাজে সরকারকে প্রকৃতপক্ষে আন্তরিক হতে হবে। দুদককে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাপমুক্ত করতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায়। পাশাপাশি অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সাদা চোখে দেখা যায়, দুর্নীতি পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটলে কোনো সংস্কার সেভাবে টেকসই হবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে, সে সরকারের কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে সেজন্য দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা আবশ্যক। এজন্য দুদক সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব করেছে, সেগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের এ কাজে মনোযোগী হওয়াটা জরুরি। তবে সর্বোপরি, দুর্নীতি দমনে সর্বস্তরের ব্যবস্থাপকদের নৈতিকতার অনুশীলন দরকার। এরপর আসবে আইনের প্রয়োগ। নৈতিকতা না থাকলে আইনের ফাঁকফোকরে দুর্নীতির ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই আইনের কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এসব নিয়েও সরকারকে কাজ করতে হবে।










