দেশের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। বর্ধিত জনসংখ্যা তাদের নানা চাহিদা পূরণে প্রতিনিয়ত রাজধানী ঢাকায় ছুটছে। নগরায়ণের শুরু থেকেই এ শহরে জনসংখ্যার হার ক্রমে বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে জমির ওপর। আবাসন, যোগাযোগ অবকাঠামো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বৃদ্ধি করতে হয়েছে। কিন্তু তাতেও জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়ে গেছে ঢাকায়। বিশেষত আবাসন সংকট বেড়েই চলেছে। ঢাকায় ক্রমবর্ধমান আবাসনের চাপ মোকাবেলা করতেই একসময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প চালু করে। পূর্বাচল, ঝিলমিল কিংবা উত্তরা আবাসন প্রকল্প—এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ভিন্ন কিছু্। দেখা গেছে, রাজউকের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প পূর্বাচলের জমি সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারাই। প্রথম পর্যায়ের লটারির মাধ্যমে তাদের ১ হাজার ৬৩২টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক।
আবাসন প্রকল্পের প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া নিয়ে প্রায়ই এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষত বিগত পতিত সরকারের আমলে এসব প্রকল্প হয়ে উঠেছিল ক্ষমতাসীনদের বলয়ে থাকা ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার উপকরণ। বিগত দেড় দশকে বিশেষ বিবেচনায় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সরকারি আমলা, বিচারপতি, শিল্পী, এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের অনেককে দেয়া হয়েছে মূল্যবান প্লট ও ফ্ল্যাট। মূলত এসব ব্যক্তির মাধ্যমেই ওই সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আইন-নীতি তোয়াক্কা না করে, নগর পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবং জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পূর্বাচল প্রকল্পের মতো কেরানীগঞ্জে রাজউকের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পেও সে সরকারের অনুগত ও তোষামোদকারীদের মূল্যবান প্লট দেয়া হয়েছে। সরকারি চাকরি, জনসেবা ও সমজাতীয় খাতে জাতীয়ভাবে ‘অসামান্য অবদানের’ নামে ঝিলমিলে দেয়া হয় দুই শতাধিক প্লট। হতাশাজনক বিষয় হলো, সে সরকার পতনের এক বছর হতে চলেছে কিন্তু এখন পর্যন্ত বিতর্কিতদের বরাদ্দ বাতিল হয়নি। এ নিয়ে রাজউক বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে কোনো ধরনের তৎপরতাও লক্ষ করা যাচ্ছে না।
বিশেষ বিবেচনায় আবাসন প্রকল্পের প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়টি কেবল দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয়, এটি পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার অন্যতম অন্তরায়। সেই সঙ্গে সাধারণ জনগণের বাসস্থানের অধিকারের লঙ্ঘন। একদিকে শহরে শত শত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার জমির অভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাচ্ছে না, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এক এক করে জমির মালিক বনে যাচ্ছেন। এমনকি অনেকেই এসব প্লট বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লাভ করেছেন। এটি যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের ভয়াবহ নমুনা, তেমনি রাষ্ট্রের বৈষম্যেরও প্রতিফলন। অথচ যেকোনো বৈষম্য সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দূর করাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধানতম লক্ষ্য, যার মাধ্যমে অবসান ঘটেছে বিগত স্বৈরাচার শাসনামলের।
রাজউকের প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে। অভিযোগের তদন্তে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে গত বছরের নভেম্বরে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ১২০ দিনের মধ্যে এই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও সেটি এখনো হয়নি। বলা বাহুল্য, এ প্রতিবেদনের ওপরও সরকারের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও সে প্রতিবেদন তৈরি না হওয়াটা বলে দেয় কাজের গতি খুবই শ্লথ। রাজউকেরও এ বিষয়ে বিশেষ কোনো তৎপরতা নেই। এমন পরিস্থিতি আরো একবার কোনো রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনার দুর্বল কাঠামোকে নির্দেশ করে। সেই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় সরকারের মনোযোগের ঘাটতিকে প্রকাশ্যে আনে।
বিগত সরকার পতনের পর থেকে বহুবার বিশেষ বিবেচনায় প্লট বরাদ্দের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন মহল থেকে তা বাতিলের দাবি তোলা হয়েছে। এটি কেবল ন্যায্য দাবি নয়, বরং আইনগতভাবেও যথোচিত। অথচ এ কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের এ বিষয়ে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া উচিত, যাতে বিতর্কিত প্লট বরাদ্দ বাতিল হয়। আবার শুধু বরাদ্দ বাতিল করলেই হবে না, ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে তোষণনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করতে পারে, সেজন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যেমন ১৯৮৬ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আইন সংশোধন করা হলে সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘সরকার যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাকেই প্লট বরাদ্দ দিতে পারবে।’ এ ধরনের স্বেচ্ছাচারমূলক ধারা আইন থেকে বাদ দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে—বিগত সময়ে প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।
এ দেশে জমি মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং এর পরিমাণ যে সীমিত সেটি মনে রাখা প্রয়োজন। তাই এসব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার হতে হবে জনকল্যাণে। জনগণের জন্য সমন্বিত উপায়ে গড়ে তুলতে হবে পরিকল্পিত আবাসস্থল।
রাজধানী ঢাকা এমনিতেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, তার ওপর নগরায়ণের ক্ষেত্রে রাজউকের সমন্বয়হীনতা ও দুর্বলতার ফলে যেসব জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো নিরসনে কত সময় লাগবে তা বলা দুষ্কর। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তত আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বরাদ্দ দেয়া প্লট-জমিগুলোর বরাদ্দ বাতিল করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে জনগণের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজউকের তৎপরতা আরো বাড়ানো দরকার। রাজউক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নাগরিকদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে এগোতে হবে। এ পর্যন্ত রাজউক অনেক আবাসন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, কেবল একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করলে সেটি জনগণের কাজে আসবে না। যথাযথভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এক্ষেত্রে রাজউকের কার্যকর ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই।










