যেকোনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান জনসংখ্যা। এ উপাদান সম্পদ নাকি বোঝা তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের ভূপ্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। এদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের জনবহুল দেশের তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। যেখানে কোনো অঞ্চলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০-১০০ জনের বসবাসকে পরিমিত জনসংখ্যা অঞ্চল বলা হয়, সেখানে এ দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে শতাধিক জনসংখ্যার বাস। এছাড়া মহানগরে যেখানে একরপ্রতি সর্বোচ্চ ১২০ জন বাস করতে পারেন, ঢাকার কোনো কোনো অঞ্চলে এ সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। আবার জনসংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘের পপুলেশন ডিভিশনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির গতি ছিল নিম্নমুখী। কিন্তু এর পর থেকে তা আবারো বাড়তে শুরু করেছে। ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ২০২১ সালের মধ্যে দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু পরের বছরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে। ২০২৩ সালে তা আরো বেড়ে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হয়েছে। গত বছর এর প্রাক্কলিত হার ছিল ১ দশমিক ২২ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দেশে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এরই মধ্যে সম্পদের তুলনায় জনগণ বেশি হওয়ায় অনেক নাগরিক সুবিধার পরিসর সীমিত হয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে শুরু করে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত নাগরিকদের জীবন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি অন্যতম পথ হতে পারে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করা। এতে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথ আরো প্রসারিত হবে। আর দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার অন্যতম কৌশল হতে পারে কর্মক্ষম জনগণকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। সরকারের এদিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কেননা একটি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিকে বলা হয় মানবসম্পদ। সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ অত্যন্ত আবশ্যক যা দেশে অপ্রতুল।
প্রশিক্ষণের অভাব যে মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম বাধা তার স্পষ্ট প্রতিফলন উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যার দিকে লক্ষ করলে পাওয়া যায়। দেশের কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি সেভাবে হচ্ছে না—এ কথা যেমন সত্য, একই সঙ্গে নিয়োগকারীদের দক্ষ জনবল না পাওয়ার কথাও অস্বীকার করা যায় না। দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল তথা তিন বছরে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী। তবে এ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই রয়েছেন কর্মহীন অবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-এ দেখা যায়, প্রতি বছরই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ও আইটিতে স্নাতক সম্পন্ন করে বের হন ১২ হাজারের মতো শিক্ষার্থী। তবে এর বিপরীতে দেশের আইটি শিল্পে প্রতি বছর জনবল নিয়োগ হয় কেবল পাঁচ হাজার। অর্থাৎ প্রতি বছর চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী এ দুই বিষয়ে স্নাতক করছেন। এর পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী পায় না।
একজন স্নাতক সম্পন্ন করা চাকরিপ্রত্যাশীর দক্ষতার কারণে চাকরি না পাওয়ার কারণ তার কর্মমুখী শিক্ষার অভাব। এ দায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার। কারগরি ও শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষার অভাবে তরুণ কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আবার প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন হয় না। তাই শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য ন্যূনতম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। দেশে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি না হলেও বিদেশী শ্রমবাজারের সুযোগ কেন লুফে নেয়া যাচ্ছে না? এর কারণ প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির অভাব।
আবার এ কারণেই ব্যাপক সংখ্যক জনগণ প্রবাসে থাকার পরও অন্য দেশের তুলনায় রেমিট্যান্স অর্জন কম হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা দক্ষ না হওয়ার কারণে স্বল্প দক্ষ শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছেন ও কর্মক্ষেত্রে কম বেতন পাচ্ছেন। উচ্চ দক্ষতা ও মজুরির প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার দখল করে নিচ্ছে ভারত, ভিয়েতনামের মতো দেশ। এছাড়া দেশে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক অভাব থাকায় বহু প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশী দক্ষ কর্মীরা জায়গা করে নিচ্ছেন। সময়ের প্রয়োজনে ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোন খাতে কী পরিমাণ দক্ষ জনগোষ্ঠী দরকার এ নিয়ে উন্নত দেশগুলোয় হিসাব করা হলেও এখানে এসবের কিছুই করা হয় না। যে কারণে শিক্ষিত তরুণ জনশক্তিকে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের কাজে লাগানো যাচ্ছে না, তেমনি প্রবাসী আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কমই থেকে যাচ্ছে। তাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা একান্ত জরুরি।
প্রশিক্ষণ কীভাবে মানবসম্পদ তৈরিতে প্রধান সহায়ক হতে পারে, সেটি এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়। এর অর্থই হলো হাতে-কলমে শেখানো। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার মানে ওই বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করা। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বায়ন ও অটোমেশনের যুগে শ্রমের মান উন্নয়ন করা আবশ্যক। নয়তো দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশকে কীভাবে উন্নতির চূড়ায় নিয়ে যেতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যায়। চীনে যেমন কম দক্ষ শ্রমনির্ভর শিল্প উৎপাদন হয়, তেমনি বিশ্বমানের বিদ্যুচ্চালিত (ইভি) যানবাহনও তৈরি হয় যা চীনকে বিশ্ব কারখানায় পরিণত করেছে। এজন্য হাতে-কলমে শিক্ষার বিকল্প নেই। প্রায়োগিক জ্ঞান থাকা চাই। যতদিন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক্ষেত্রে উন্নত না হয়, ততদিন কর্মক্ষমদের সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষত জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) এ বিষয়ে তৎপর হতে হবে। তবে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় সরকারের একার পক্ষে এটি করা কঠিন। তাই বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগোতে হবে। জাতীয় প্রশিক্ষণ দিবসের অঙ্গীকার হোক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির যাতে দেশকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নেয়া যায়।










