পুষ্টিবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টির দুষ্টচক্রের কারণে দেশে এখনো পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৬ শতাংশের বেশি খর্বকায়, ২৩ শতাংশ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে, ৪৩ শতাংশ শিশু এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৩৭ শতাংশ কিশোরী ও নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। খবরটি চরম উদ্বেগজনক। অপুষ্টি অনেক সময়ই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রোগের বিরুদ্ধে (বিশেষ করে সংক্রামক রোগ) লড়াই করার শক্তি কমে যায়, বুদ্ধিবৃত্তির সম্পূর্ণ স্ফুরণ না হওয়ায় শিশুর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলোর বিকাশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অপুষ্টির কারণে শিশুদের স্বাভাবিক ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাটা দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য খাতসহ পুষ্টি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। সংস্থাটি বলছে, যদি দেশে নারী, শিশু ও কিশোরীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, খর্বকায়, ওজন কম নিয়ে জন্মানো ইত্যাদি রোধ এবং শিশুদের পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধের প্রাপ্যতা নিশ্চিতে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ করা হয় তাহলে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব, যা দেশের মোট দেশজ আয়ের (জিএনআই) ২ দশমিক ৮ শতাংশ। শিশু, কিশোরী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর পুষ্টি বিষয়কে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা উচিত। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে অপুষ্টির কারণে দেশের বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধ করা যায়।

যথাযথ পুষ্টি পেয়ে স্বাভাবিক ও সুন্দর স্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন শিশুর অধিকার। এ অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এ তিন পক্ষের। শিশুর জন্মের অনেক আগে থেকেই এদের পাহারা শুরু হওয়ার কথা, কেননা শিশুর অপুষ্টির পেছনে বড় কারণ হলো মায়ের অপুষ্টি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিন পাহারাদারই এ অধিকার রক্ষা না করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। বর্তমান ও ভবিষ্যতের মায়েদের অর্ধেকের বেশি রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, বয়স ১৯ পেরোনোর আগেই তাদের অনেককে বিয়ে ও সন্তান ধারণ করতে হচ্ছে, শিশুরা জন্মের পরে অবৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বড় হচ্ছে—এসবই অপুষ্টির প্রত্যক্ষ কারণ এবং তার জন্য পরিবার ও সমাজ অনেকটাই দায়ী। ব্যক্তি ও সমাজ যেখানে ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্র সেখানে হাল ধরে—এটাই নিয়ম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দেশে শিশু অপুষ্টির গুরুত্ব সরকার কোনো দিন গভীরভাবে ভেবে দেখেনি। এ এক গভীর অসুখ, যা নিঃশব্দে ও ধীরগতিতে মানবসম্পদ তথা উন্নয়নের ভিত দুর্বল করে দেয়। অপুষ্টির মূল লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জটিল বিন্যাসে। সুতরাং এ অসুখ সারাতে হলে শিশু এবং তার মায়ের যথাযথ খাদ্যনিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, রোগজীবাণুশূন্য পরিবেশ, পুষ্টিকর খাদ্যের সুষম বণ্টন ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। অপুষ্টিতে ভুগছে এমন লোকদের উৎপাদনশীলতা কম, দৈহিক শক্তি ও ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম, তাই অপুষ্টির চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে এবং পুষ্টির উন্নতির জন্য আরো বেশি বিনিয়োগ ও বিচক্ষণ উদ্যোগ আবশ্যক। এ ধরনের বিনিয়োগগুলো অপুষ্টি সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করবে।

অপুষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনা করে বাংলাদেশের সরকার পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার করেছে। জাতীয় পুষ্টি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সব উপজেলা কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসহ সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমন্বিত অসুস্থ শিশু ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কর্নার থাকার কথা। যেসব শিশু জটিলতাসহ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে নির্ধারিত কর্নারে রেখে জাতীয় অপুষ্টি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী নিবিড় সেবা দেয়ার কথা। কিন্তু এখনো কোনো কোনো হাসপাতালে সমন্বিত অসুস্থ শিশু ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কর্নার নেই। আবার খবর মিলছে, যেসব হাসপাতালে সমন্বিত অসুস্থ শিশু ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কর্নার রয়েছে সেখানেও দায়সারা সেবা দেয়া হচ্ছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। পুষ্টি কর্নারে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে তা মূলত শিশুজন্মের পরে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু অপুষ্টি সমস্যার সমাধান করতে হলে জন্মের আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। পুষ্টি শুধু স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে না, এটা অর্থনৈতিক উৎপাদন, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও প্রভাব ফেলে। তাই পুষ্টির বিষয়টি অন্যান্য খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পুষ্টি খাতে সরকারের কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। কাঠামোকে শক্তিশালী করা না গেলে শুধু কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও পুষ্টি অবস্থার উন্নতি হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য এবং খাদ্য—এ খাতগুলোয় পুষ্টির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নজর বাড়ানো দরকার। বহু খাতমুখী পদক্ষেপ নিলে রক্তস্বল্পতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে পুষ্টিবান্ধব করা দরকার। সর্বোপরি, জাতীয় পুষ্টিনীতিকে আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

অপুষ্টির কিছু মৌলিক কারণ রয়েছে, যেগুলো দূর করতে হলে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য কমাতে হবে। জনগোষ্ঠীর সব অংশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অপুষ্টি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হবে না। তিন-চার বছরের শিশুর পুষ্টির জন্য যেটুকু খাবার প্রয়োজন, তা জোগাড় করা অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্র পরিবারেও সাধ্যাতীত নয়। কিন্তু পুষ্টি বিষয়ে অজ্ঞতা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাবে ঘন ঘন পেটের অসুখ, শিশুর তত্ত্বাবধানে অক্ষমতাসহ এমন অনেক বিষয় শিশুর পুষ্টি ব্যাহত করে। খাদ্য সুরক্ষা শিশুপুষ্টির একটি দিক মাত্র, তবে একমাত্র নয়—এ সত্য স্বীকার করতে হবে। বহু বছর ধরে দরিদ্র পরিবারগুলোকে ভর্তুকিতে চাল-গম দিয়েও অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুদের পুষ্টি কমেনি, তা এত দিনে প্রতিষ্ঠিত। অতএব প্রয়োজন শিশুর সার্বিক সুরক্ষা ও তত্ত্বাবধান। শহরে দরিদ্র মায়েরা কাজ করবেনই। শিশুদের দেখাশোনায় সহায়তা করতে হবে সমাজকে। ভারতের তামিলনাড়ুতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলো সারা দিন দরিদ্র শিশুদের দেখাশোনা করে। তাতে পুষ্টি, শিক্ষা, মেধার বিকাশ সবই সম্ভব। শিশুপুষ্টির জন্য স্তন্যপান আবশ্যক। শ্রীলংকা ৮০ শতাংশেরও অধিক শিশুর সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করছে, অথচ বাংলাদেশ এটি করতে পারেনি।

কিশোর-কিশোরী, শিশু ও নারীদের জন্য পুষ্টির অভাব মোকাবেলায় একটি বাস্তবসম্মত পুষ্টি পরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিত। দেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দরিদ্র জনগণ তাদের দৈনন্দিন আয় কমিয়ে আনায় এরই মধ্যে খাবারের খরচ কমিয়ে দিয়েছে। এখন তারা প্রাণিজ প্রোটিন কম গ্রহণ করছে বলে খবর মিলছে। তাই দরিদ্র মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সব উন্নয়ন কর্মসূচিতে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পুষ্টির অভাবসহ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে, যাতে তাদের স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। তুলনামূলকভাবে টেকসই সমাধানের জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর আয়প্রবাহ এ সংকটের সময়ে ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে তারা খাদ্য ও পুষ্টির জন্য নিজস্ব চাহিদা মেটাতে পারে।

বর্তমানে জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যেভাবে বহুমাত্রিক মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, তাতে একটি রূপান্তরশীল অর্থনীতির উপযোগী জনশক্তি পাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়বে। অপুষ্টির সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সংযোগ প্রত্যক্ষ। অপুষ্টি দূর হলে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা আরো বাড়বে। অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে গুণিতক হারে। সুতরাং উন্নয়ন ডিসকোর্সের জায়গা থেকেও অপুষ্টি মোকাবেলার কাজটি জরুরি। একটি সুসংহত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র মানুষের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো সক্রিয় হবে—এটিই প্রত্যাশা।