আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষকতাকে একটি অংশীদারত্বমূলক পেশা হিসেবে পুনর্বিন্যাস’। ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ সুপারিশের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও অবদান স্মরণ করতে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস বিশ্বব্যাপী উদযাপন করা হয়। শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি, পেশাগত উন্নয়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সব শিক্ষককে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে বাংলাদেশেও দিবসটি আজ পালন করা হবে।
গত ৩ অক্টোবর ইউনেস্কো বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন করেছে। এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবস যৌথভাবে আয়োজন করেছে ইউনেস্কো, আইএলও, ইউনিসেফ এবং এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল। তবে এ বছর প্রথমবারের মতো প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়নি। এর পরিবর্তে অনুষ্ঠানটি পালিত হয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দপ্তরে প্যান-আফ্রিকান কনফারেন্স অন টিচার এডুকেশনের (পিএসিটিইডি) অংশ হিসেবে। সময়োপযোগী এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আফ্রিকায় নতুন কন্টিনেন্টাল এডুকেশন স্ট্র্যাটেজি ফর আফ্রিকা (সিইএসএ) এবং আফ্রিকান ডিকেড ফর এডুকেশনের উদ্বোধনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ও শিক্ষকতাকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়ার নতুন অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী মর্যাদাপূর্ণ একটি পেশা শিক্ষকতা। শিক্ষকদের বলা হয় জাতি গঠনের কারিগর। একজন মানুষের জীবনে মা-বাবার পরই জীবন গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন তার শিক্ষক। দক্ষ মানবসম্পদ ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ বিনির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। সমাজকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতেও তাদের ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বের উন্নত এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশও শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে।
স্কুল পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিনল্যান্ড বিশ্বসেরা হিসেবে স্বীকৃত। এর মূল কারণ কোনো আড়ম্বরপূর্ণ পাঠ্যক্রম নয়; বরং শিক্ষকদের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। শিক্ষকদের কেন্দ্রে রেখে তাদের পাঠ্যক্রম সাজানো হয়েছে। সেখানে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষকই শিক্ষার্থীর প্রকৃত গাইড। পাঠ্যবই শুধু সহায়ক উপকরণ, শেখানোর ধরন ও প্রয়োগ পদ্ধতি ঠিক করেন শিক্ষকরা। তাই প্রতিটি শিশুই পায় ভিন্ন ভিন্ন যত্ন, আর মূল্যায়নের মূল লক্ষ্য থাকে শেখার অগ্রগতি নিশ্চিত করা, কেবল পরীক্ষায় পাস নয়। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ভালো ফলাফলকে প্রাধান্য দেয়া হয়। বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম নিয়ে বারবার পরীক্ষা চালানো হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ থাকে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত দুটি পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক হওয়ার বদলে প্রতিযোগিতার মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ফিনল্যান্ডে ১২ বছর শিক্ষা শেষে মাত্র একটি পাবলিক পরীক্ষা নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও শিক্ষার্থী একই বিষয়ে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ পায়।
জাপান, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসসহ যারা শিক্ষায় অগ্রসর দেশ তারা দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দেন। এছাড়া মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বেতন কাঠামো এখনো দুর্বল। দেশে পাঠ্যক্রম বারবার পরিবর্তন করে যতই আধুনিক করা হোক, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। দেশে শিক্ষকদের প্রতি সেই আস্থা ও মর্যাদা আমরা দেখাতে পারছি না। শিক্ষকরা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণশক্তি হয়ে উঠতে পারেননি। কেবল নতুন বই বা নতুন পরীক্ষার পদ্ধতি চালু করলেই হবে না; প্রকৃত সংস্কার ঘটবে তখনই যখন শিক্ষককে কেন্দ্রে রেখে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষা ব্যবস্থা সাজানো হবে।
পাঠ্যক্রম কোনো দেশের শিক্ষার মান নির্ধারণের একমাত্র উপাদান নয়। তবে এটি শিশুদের শেখার গতি, মানসিক চাপ ও দক্ষতা বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের মতো ফিনল্যান্ডেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে মোট ১২ বছরের শিক্ষা রয়েছে। তবে পার্থক্য হলো বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা পাঁচ বছর এবং মাধ্যমিক সাত বছর হলেও ফিনল্যান্ডে এ ১২ বছর সমানভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ প্রাথমিক ছয় বছর ও মাধ্যমিকও ছয় বছর। বাংলাদেশে নিম্ন ও উচ্চ মাধ্যমিকের বিভাজন যেখানে পাঁচ ও দুই বছরের, সেখানে ফিনল্যান্ডে উভয় স্তর সমান, অর্থাৎ নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রত্যেকটি তিন বছর করে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্য, বিভাজন ও পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ফিনল্যান্ডের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে ভারসাম্যপূর্ণ বিভাজন ও ধাপে ধাপে উন্নয়নশীল কাঠামো শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। শিশুদের মানসিক বিকাশ, শেখার গতি ও শিক্ষার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের শিক্ষার মডেল একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে শিক্ষার ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। দক্ষ মানবসম্পদ ও জাতি গঠনে শিক্ষার এ স্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এ স্তরের শিক্ষকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও বঞ্চিত। আবার যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে এ স্তরে যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো ও বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন আনাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। আর মেধাবী শিক্ষকদের আকৃষ্ট করতে হলে এ পেশার সামাজিক মর্যাদা, বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো অতীব জরুরি। বেতন কাঠামোয় এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষকদের গড় বেতন ৪ হাজার ২০৩ ডলার ২৫ সেন্ট। দেশটির ন্যাশনাল সেন্টার অন এডুকেশন অ্যান্ড দি ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী শিক্ষকদের পাঁচ ধরনের বেতন কাঠামো রয়েছে, যেখানে মাসে ন্যূনতম বেতন ২ হাজার ৩৫৩ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরবে শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতন দেয়া হয় ৪ হাজার ১৬১ দশমিক ৮৩ ডলার। এছাড়া এশিয়ায় শীর্ষ আটে থাকা অন্য দেশগুলো হলো ওমান, কুয়েত, চীন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান এ মহাদেশের ৪৯টি দেশের মধ্যে ৪৫তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষকদের বেতন তুলনা করলে সবার পেছনে বাংলাদেশ। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বেতন পান মালদ্বীপের শিক্ষকরা। দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রাথমিকের শিক্ষকদের মাসিক গড় বেতন প্রায় ৯৫৩ ডলার ১৩ সেন্ট। বাংলাদেশের প্রাথমিকের শিক্ষকদের গড় বেতন ১৭০ ডলার ২ সেন্ট।
২০৩০ সালের মধ্যে যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নেয়া হয়েছে তাতে মানসম্পন্ন শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ—সব পর্যায়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই। সেজন্য শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠ্যক্রম সুপরিকল্পিত হতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ইউনেস্কোর মতে, কোনো দেশের বাজেটের ২০ শতাংশ বা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। বিপরীতে আমাদের দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে। শিক্ষা খাতে স্বল্প বিনিয়োগের কারণে শিক্ষার মানোন্নয়নে তেমন গুরুত্ব দেয়া যায়নি। এছাড়া দেশের পাঠ্যক্রম বারবার পরিবর্তনের কারণেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীকে একই বই পড়ানো হয় এবং একই ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠ্যক্রম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের পাঠ্যক্রমের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি দরকার। একটি আদর্শ ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে দরকার মানসম্পন্ন শিক্ষক। শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজন উন্নত মানের প্রশিক্ষণ এবং ভালো বেতন কাঠামো। শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে দরকার স্বচ্ছ ও রাজনীতিমুক্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া। শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে এ খাতে সরকারকে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। সংবিধানের শিক্ষা প্রসঙ্গে সরকার যে অঙ্গীকার করেছে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধিসহ বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য রক্ষা করা হোক। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাক।










