পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয়, তা বৈশ্বিক জনসংখ্যার দেড় গুণ মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব। অথচ এত খাবার উৎপাদনের পরও প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে না বিশ্বের অনেক মানুষ। আবার কোটি কোটি মানুষ ভুগছে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায়। এ বৈপরীত্যের মূলে রয়েছে অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠানো, খাদ্য অপচয় ও নষ্ট হওয়া। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ সংকট আরো গভীর। দেশে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ অপচয় ও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল খাদ্যপণ্য হিসেবে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ মাছ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশে উৎপাদিত মাছের ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের অপচয়ের ফলে কেবল কৃষক ও খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে অনেক মানুষ। আবার খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। এ অপচয় ও ক্ষতি কমাতে পারলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমদানিনির্ভরশীলতা কমবে। অপচয় ও ক্ষতি কমাতে কৃষি উৎপাদন ও সংগ্রহ পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্য সংরক্ষণে পর্যাপ্ত গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করার বিকল্প নেই। অপচয় ও ক্ষতি রোধে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বিপুল জনশক্তি এ খাতে নিয়োজিত। পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যও উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দেশে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও খাদ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত যৌথ গবেষণার তথ্য বলছে, দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ নষ্ট হয়। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশও নষ্ট হয়ে যায়। যেমন মাছ। শুধু মাছই নয়, অন্যান্য উৎপাদিত ফসলও নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশে ফার্ম থেকে প্রসেসিংয়ে পৌঁছার আগে প্রায় ১৭ শতাংশ ধান নষ্ট হয়। আর দুর্বল সংরক্ষণের কারণে কৃষক পর্যায়ে নষ্ট হয় প্রায় ১৪ শতাংশ। ফল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে নষ্ট ও অপচয় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নষ্ট হওয়ার প্রবণতা এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ফল ও শাকসবজি নষ্ট হচ্ছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এ খাদ্য অপচয় ও ক্ষতির অন্যতম কারণ দুর্বল অবকাঠামো।
এ ধরনের পরিসংখ্যান দেশের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু অপচয় ও ক্ষতি সেই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। উৎপাদিত খাদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং সামাজিক বৈষম্য ও পুষ্টিহীনতা তৈরি করছে। দেশে এখনো অনেক মানুষ তিন বেলা পেট ভরে খেতে পায় না, একটু সস্তায় খাবার কেনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিসিবির ট্রাকের জন্য অপেক্ষায় থাকে। খাবার অপচয় কেবল সম্পদেরই অপচয় নয়, এর সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য জড়িত। অপচয়কৃত খাবার ও সৃষ্ট বর্জ্য পরিবেশের দারুণ ক্ষতি করছে। জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থার (ইউএনইপি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যের অপচয় থেকে বিশ্বব্যাপী ৮-১০ ভাগ ‘গ্রিনহাউজ’ গ্যাস নির্গমন হয়। এর মানে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ খাদ্য অপচয়ের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ও পরিবেশদূষণ করছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের বড় সমস্যা হচ্ছে খাদ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের পর্যাপ্ত অবকাঠামোর এবং জ্ঞানের অভাব। ফলে প্রতি বছর প্রচুর ফলমূল, শাকসবজি, দুধ, মাছ, মাংসের ক্ষতি হচ্ছে।
দেশে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতির মূল কারণগুলোর অন্যতম হলো দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজের অভাব, অদক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা এবং বাজারজাতে অকার্যকর অবকাঠামো। এসব কারণে উৎপাদিত খাদ্য মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে ব্যাপকভাবে নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব একদিকে দেশের কোটি কোটি মানুষকে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল অর্থমূল্যের খাদ্য অপচয় ও নষ্ট হওয়ার কারণে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশে এখনো ১ কোটি ৫৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যা ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় খাদ্য নষ্ট হওয়া ও অপচয় অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।
খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি সরাসরি দারিদ্র্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। দেশে উৎপাদিত খাদ্যের বড় অংশ ফসল কাটার পর, পরিবহন ও সংরক্ষণে অদক্ষতার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য ব্যবস্থায় ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। যাদের আয় সীমিত তারা এ অপচয় ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে আরো খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়ছে। বিশেষ করে পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে শিশু ও পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের চক্র আরো দীর্ঘ করছে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণা বলছে, দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিন বছরে অতি বা চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালের অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। খাদ্য অপচয় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও। খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমানো, যথাযথ সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যাবশ্যক।
দেশে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। কোল্ড স্টোরেজের স্বল্পতার কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। আবার দেশের কোল্ড স্টোরেজগুলো মূলত ষাটের দশকে তৈরি করা। সেগুলো আধুনিকায়ন করা হয়নি। অধিকাংশ কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করা হয়। সেক্ষেত্রে অন্যান্য কৃষিপণ্য যেমন পেঁয়াজ, গাজর, বিভিন্ন ধরনের দেশী ফল, সবজি ও মাছ ইত্যাদি স্টোরেজের সুযোগ খুবই কম। অন্যদিকে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় পরবর্তী সময়ে পণ্যগুলো আমদানি করতে হচ্ছে এবং ভোক্তাদের অধিক মূল্যে ক্রয় করতে হচ্ছে। কোল্ড চেইনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় কোল্ড স্টোরেজ ও সাপ্লাই চেইন আধুনিকীকরণ ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। যদিও সরকার বলছে, ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এরপর আরো ১০০টি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হবে। এ উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও পর্যাপ্ত নয়। কারণ দেশের খাদ্যঅপচয় ও ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি।
খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি রোধে তিনটি স্তরে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, কৃষক পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজার ও ভোক্তা পর্যায়ে অপচয় কমাতে কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। তৃতীয়ত, নীতি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে।
ফসল-পরবর্তী অপচয় ক্ষতি মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট নীতি ও কৌশল প্রণয়ন এখন অত্যন্ত জরুরি। খাদ্য অপচয় শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, বরং অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে অবকাঠামোর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। পর্যাপ্ত গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারজাত ও বাণিজ্যিকীকরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সংরক্ষিত পণ্য সহজে বাজারে পৌঁছে যায়। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু ক্ষুধামুক্তির প্রশ্ন নয়, বরং একটি দেশের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ টেকসইয়ের সঙ্গে জড়িত। সচেতন ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে খাদ্য অপচয় রোধ করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ বিপুল ক্ষতি রোধ করা গেলে ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত সমস্যা অনেকাংশে মোকাবেলা সম্ভব।










