বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে কোনো সরকারই ভূমি সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ভূমি সংস্কার নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে নানা দাবি উত্থাপন করা হয়। সেসব দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল ভূমি ও কৃষির জন্য আলাদা সংস্কার কমিশন গঠন। এদিকে সরকার ১১টি কমিশন গঠন করলেও ভূমি সংস্কারবিষয়ক কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপ্লব ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ভূমি সংস্কার। মেক্সিকো, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বহু দেশে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকের ভূমি মালিকানার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে এখনো কৃষি খাতের ভূমি বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। শীর্ষ ১৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের দখলে রয়েছে গ্রামাঞ্চলে মোট কৃষিজমির ৬৬ শতাংশ। ভূমিহীন কৃষকরা বর্গা চাষ করে জীবন নির্বাহ করেন। ফলে তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রায় অর্ধেকটা দিয়ে দিতে হয় ভূমির মালিকদের। এরপর উদ্বৃত্ত কোনো ফসলই তাদের ঘরে থাকে না। এসব বর্গাচাষী এক ধরনের অভাব-অনটনে দিন যাপন করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু সংস্কারে নানা কার্যক্রম শুরু করেছে, এখনই সময় ভূমি সংস্কারের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়া, যাতে ভূমির মালিকানা কাঠামোয় ভারসাম্য আসে। বলা বাহুল্য, ভূমির বণ্টন যদি ন্যায্যভাবে না হয় তাহলে বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। ইতিবাচক রূপান্তরের প্রত্যাশাও পূরণ হবে না। যে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশের বেশি নিয়োজিত রয়েছে কৃষি খাতে, সেখানে বিপুলসংখ্যক কৃষককে ভূমিহীন রেখে কৃষির অগ্রগতি সাধন কঠিন। আর মনে রাখা প্রয়োজন, দেশের অর্থনীতির প্রধান তিন খাতের মধ্যে কৃষি অন্যতম। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা কৃষি খাতে জড়িত।
একসময় পারিবারিক কৃষি ছিল এ দেশের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে একদিকে যেমন আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে, নানা দূষণে কৃষিজমির পুষ্টিগুণ কমেছে, তেমনি কৃষকের সংখ্যা ক্রমে কমছে। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে কৃষি খাতে যুক্ত না হওয়ার প্রবণতা বহুগুণে বেড়েছে। কারণ কৃষিকাজকে অন্য যেকোনো খাতের মতো গুরুত্ব দিয়ে লাভজনক করা হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত বছরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বর্তমানে দেশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ কারণে এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে কৃষি খাতকে চিহ্নিত করা হয়। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে কৃষিকাজ ছেড়েছেন ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। কৃষকদের দুর্দশা যদি লাঘব না করা যায় তবে আশঙ্কা রয়েছে, সামনে আরো কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় নিজেকে নিয়োজন করবেন। এমন পরিস্থিতি থেকে কৃষকের সুরক্ষায় ও জনগণের খাদ্যনিরাপত্তায় রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। যে সংস্কারের প্রত্যাশা নিয়ে বিপ্লবী প্রজন্ম স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটিয়েছে, সেই প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে ভূমি সংস্কারের দাবি নিয়েও। নয়তো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অপূরণীয়ই রয়ে যাবে।
সরকারের ভূমির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। এজন্য ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত আইনি কাঠামো শক্ত করতে হবে। এজন্য বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া আবশ্যক। যেমন আইনজীবীরা বলছেন, ভূমি সংস্কার আইনটি সঠিক বিবেচনায় লেখা হয়নি। এখানে কেউ চাইলে কৃষিজমির মালিক ৬০ বিঘা পর্যন্ত হতে পারবে। আবার শুধু নালা (অনাবাদি) জমির ক্ষেত্রেও ৬০ বিঘার মালিক হতে পারবে। অথচ এ দুই বিষয় একেবারে ভিন্ন। আবার ভূমি অধিকার আন্দোলনসংশ্লিষ্টদেরও অভিমত, প্রতিবার ভূমি আইন সংশোধন করে শুধু কয়েকটি শব্দের পরিবর্তন করা হয়েছে। এর বাইরে কোনো সংস্কারই হয়নি। প্রান্তিক চাষীর জমির মালিকানা নিশ্চিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এবং বিদ্যমান আইনেরও বাস্তব প্রয়োগ হতে দেখা যায়নি। ফলে কৃষিতে নিয়োজিত অর্ধেকের বেশি কৃষকের হাতে নেই কৃষিজমি। সুতরাং সরকারের এগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে এবং সে মোতাবেক আইন সংস্কারের পথে হাঁটা প্রয়োজন। এ সংস্কারের মূলে থাকা চাই প্রান্তিক কৃষিকের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা। ভূমিহীন কৃষকের জন্য ভূমি পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা সরাসরি উৎপাদনে অংশ নিতে পারেন।
ভূমি অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য গবেষণা ও নীতি কৌশল নির্ধারণ করা দরকার। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিই হচ্ছে জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। সুতরাং এ দেশে ভূমিসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থনৈতিক উন্নয়নও এর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নীতির মাধ্যমে ভূমির ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর এটি বিপ্লব না গণ-অভ্যুত্থান এ নিয়ে অনেক বিতর্ক উঠেছিল। অনেকের দাবি ছিল, বিপ্লবের অর্থ হলো উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তর। সে বিতর্ককে উহ্য রেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কৃষির উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি মানবসমাজের সুরক্ষায়। তাই কৃষককে সুরক্ষা দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি এসে কায়িক শ্রমের অনেক জায়গা দখল করেছে, তবে উৎপাদনের মূল উপকরণ যে ভূমি সেটা প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। আর ভূমির সঙ্গে সর্বদাই মালিক প্রসঙ্গ চলে আসবে। একসময় জমিদারি প্রথা বিলোপ করা হয়েছিল জমির ন্যায্য হিস্যা কৃষককে বুঝিয়ে দিতে। এখনো সময় এসেছে এ কাজের। আমরা দেখেছি, কীভাবে বিগত সরকারের আমলে প্রায় সর্বক্ষেত্রে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির কাছে জিম্মি ছিল। তার মধ্যে নিশ্চয় কৃষিজমিও রয়েছে। বিশেষ করে জনগণের জমি অধিগ্রহণ করে অনেক ব্যক্তি বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল বা পার্ক তৈরি করেছে, সেটা কারো অজানা নয়। সেসব জমির পুনর্বণ্টন অতি আবশ্যক। নিপীড়িত কৃষককে তার অন্যায়ভাবে অধিগ্রহণকৃত জমি বুঝিয়ে দিতে হবে। তবেই কৃষক উপকৃত হবেন, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।










