সমস্যা হলো সড়ক ব্যবস্থাপনা ও টেকসই অবকাঠামো না থাকায় চাঁদাবাজির মতো নৈরাজ্য অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। পরিবহন কাঠামোয় দায়িত্বশীলদের অকার্যকর ভূমিকার কারণে সড়কে নৈরাজ্য দূর হচ্ছে না।
সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের সড়ক ও পরিবহন খাতের ৯৩২টি মালিক-শ্রমিক সংগঠন আয়ের জন্য চাঁদাবাজি বা উৎকোচের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো চাঁদা আদায়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শুধু লেনদেন নয়, সড়কে চাঁদাবাজি সহিংসতায়ও রূপ নিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে চাঁদা না দিলে গাড়ির চাকা ঘোরে না। গাড়ির চাকা ঘুরতে হলে স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে মালিক-শ্রমিক সংগঠন, তদারকি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন নিবন্ধন সংস্থা সবাইকেই তুষ্ট করতে হয়। গাড়ির নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স দেয়া থেকে শুরু করে পরিবহন খাতে যাত্রীসেবা পাওয়ার জন্যও উৎকোচ দিতে হয়।
পরিবহন খাতের সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন পন্থায় চাঁদা আদায় হয়। যাত্রীবাহী পরিবহন আর পণ্যবাহী যানের চাঁদা আদায়ের ধরন আলাদা। বাসগুলোকে কেন্দ্রীয়ভাবে রুট মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পরিবহন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার অজুহাতে সমিতিগুলো অর্থ সংগ্রহ করে। এদিকে পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ট্রাকে পণ্য ওঠানোর সময় থেকেই শুরু হয় চাঁদাবাজি। চাঁদার এ টাকা বিভিন্ন স্তরে ভাগবাঁটোয়ারা হয়। মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো যেন অদৃশ্য টোল প্লাজা। কোথাও রাস্তায় দাঁড়িয়ে নগদ অর্থ আদায় হচ্ছে, আবার কোথাও সংগঠনের ব্যানারে মাসিক চুক্তির জন্য টাকা দিতে হচ্ছে। শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড, নিরাপত্তা ফি, ব্যবস্থাপনা খরচের অজুহাতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা অনৈতিক পন্থায় আদায় করা হচ্ছে। কোথাও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে, কোথাও আবার টোলের সঙ্গে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা চাঁদা হিসেবে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া সড়ক-মহাসড়কে দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থা এবং থানা পুলিশের একাংশ অসাধু নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করছেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা চাঁদা দিচ্ছেন। তাই পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যয় সমন্বয় করার জন্য অযৌক্তিক হারে ভাড়া বাড়াচ্ছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন।
সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের একটি বড় দায়িত্ব। এ খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির শিকড় না উপড়াতে পারলে শৃঙ্খলা ফেরাতে যে পদক্ষেপ নেয়া হোক না কেন, সেটা কোনো ফলই আনতে পারবে না। সড়কে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে সরকারের শুরু থেকেই শক্ত বার্তা দেয়ার বিকল্প পথ নেই। নব নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সবার প্রত্যাশা ছিল, সড়কে চাঁদাবাজির মতো অনিয়ম দূর করার বিষয়ে শুরু থেকেই সক্রিয় থাকবে। কিন্তু সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর একটি বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি বক্তব্যে চাঁদা ও চাঁদাবাজির পার্থক্য নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা অনেকাংশে চাঁদাবাজিকে ন্যায্যতা দেয়। চাঁদাবাজি একটি গণবিরোধী কাজ। ইচ্ছা বা অনিচ্ছা যে পরিস্থিতিই থাকুক না কেন, এটি বিনা শ্রমে অর্থ উপার্জনের অনৈতিক উপায়। সড়ক কিংবা যেকোনো খাতেই চাঁদাবাজি গ্রহণযোগ্য নয়। সড়কে চাঁদাবাজির মাধ্যমে সরাসরি এ খাতে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। এ অনাচার থেকে পরিবহন মালিক ও যাত্রীদের রক্ষা করার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলো সড়কপথে পরিবহন ব্যবস্থাকে বহুমুখী করে থাকে। কিন্তু এ ধরনের বহুমুখী অবকাঠামো ব্যয়বহুল। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এখনই টেকসই ও উন্নত সড়ক অবকাঠামো প্রত্যাশা করা সমীচীন নয়। সড়ক পরিচালনের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনের উদাহরণ টেনে থাকি। বাস্তবতা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সড়ক অবকাঠামো দ্রুত সময়ে বহুমুখী করা সম্ভব নয়। বরং সড়ক অবকাঠামো শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়াই শ্রেয়। ব্রাজিল ও পেরুতে এমআরটি ও মেট্রোনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন ব্যয় ৩০-৫০ শতাংশ কমানো গেছে। বাংলাদেশেও এমআরটি, মেট্রো এবং এক্সপ্রেসওয়ে অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। এসব অবকাঠামোর সম্ভাবনা বহুমুখী। তাই দক্ষ সড়ক ব্যবস্থাপনা সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। অবকাঠামোগত ত্রুটি-বিচ্যুতি সারাতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু নীতি-নৈতিকতার প্রতিফলন একই সঙ্গে আইনের বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু সড়কে নৈরাজ্যের কারণগুলো অচিহ্নিত নয়, সেহেতু এর সুরাহাও নিশ্চয়ই দুরূহ হওয়ার কথা নয়।
পাশের দেশ ভারতের বড় শহর অর্থাৎ দিল্লি ও মুম্বাইয়ের ব্যস্ত সড়কে অনিয়ম বন্ধের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ রয়েছে। এ পরিষদ সড়কের বাস্তবতার নিরিখে প্রতিনিয়ত নতুন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ করে। এছাড়া সড়ক ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার ক্ষেত্রেও তারা অনেকগুলো পরিকল্পনা নিয়েছে। সড়ক অবকাঠামো ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, পেরুর মডেলগুলোকে তুলনামূলক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এ বিশ্লেষণের জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের গবেষণাধর্মী কাজে সংযুক্ত করা যেতে পারে। সড়ক ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া গেলে চাঁদাবাজির মতো অনিয়ম দূর করা কঠিন হবে না।
ভারী হোক, হালকা হোক কিংবা ছোট সড়ক আর বড় সড়ক যা-ই হোক না কেন, যানবাহন চলাচলের জন্য যে আইন ও বিধিবিধান রয়েছে কোনো ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটা যাবে না। কারণ জানা, অথচ দৃষ্টান্তযোগ্য কোনো প্রতিবিধান নিশ্চিত হয় না, এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে! সবাই সড়ক পরিবহন আইনের কার্যকারিতা এবং সুফল দেখতে চায়। সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কঠোর নজরদারির বিকল্প নেই। ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রমকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নগরে চালকদের দৈনিক জমাভিত্তিক বাস ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। পরিবহন খাতে নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি বন্ধ করার জন্য বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করতে হবে। বিশেষত রুট পারমিটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পেশাদারত্ব ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োগ করতে হবে। সড়ক নির্মাণ, আইন প্রয়োগ, চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নগর পরিকল্পনা, জরুরি সেবা, জনসচেতনতা—এ সবই বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে দেয়া আছে। কিন্তু কোনো সংস্থা এককভাবে এ বহুমুখী সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা, অর্থায়ন বা সমন্বয়ের সুযোগ পায় না। এ সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি।
অতীতে নানা সময়ে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজ নানা সময়ে এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেও এ খাতে নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি নির্মূলে কোনো সরকারই কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সড়কে পরিচালন ব্যয়ের বাইরে চাঁদা কিংবা কল্যাণ যে নামেই টাকা তোলা হোক না কেন, তাতে জনগণের ঘাড়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এসে পড়ে। চাঁদার কারণে পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যায়। পরিবহন খাতে নৈরাজ্যের বড় ভুক্তভোগী চালক ও সহকারীরাও। নিয়ম মেনে তাদের নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন দেয়া নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক কল্যাণ। এ মুহূর্তে নতুন সড়ক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে। এ সংস্কৃতি নির্মাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের একার নয়। এক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণও জরুরি।










