আমাদের সমন্বিত খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি কাঠামো দরকার। এর জন্য ডিজিটালাইজেশনে যাওয়ার বিকল্প নেই। মানুষের আয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যয় বাড়ছে। এ কারণেই বাংলাদেশের খাদ্যবাজার ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে বাজার প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু আগে যে মাত্রায় বাজারের ওপর তদারকি বা সরবরাহ শৃঙ্খল যতটা সুষ্ঠুভাবে তদারকি হতো সেই সুষ্ঠুভাবে চলার জায়গাটি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এ কারণে বাজারে এক ধরনের অদক্ষতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাজারে জবাবদিহিতার কাঠামোয় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করা দরকার। বাজারের দ্রব্যমূল্য বাড়ার বিষয় সমাধানের জন্য সরকারগুলো যেসব উদ্যোগ নিয়ে থাকে, সেগুলো সাধারণত হয় শুল্কনীতি বা করনীতি বা ভর্তুকি বা দাম নিয়ন্ত্রণ বা মুদ্রানীতি। আমি লক্ষ করেছি, আগের সরকারগুলো যে ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে, বর্তমান সরকারের মধ্যেও একই ধরনের উদ্যোগ নেয়ার প্রবণতা রয়েছে। বর্তমান সরকারের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমাকে মর্মাহত করেছে। খাদ্য চেইনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়। একই ধরনের পলিসি প্রেসক্রিপশন দিচ্ছি, কিন্তু দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো নীতিই কাজ করছে না। এটিকে বলছি, নীতির দুষ্ট চক্রের মধ্যে পড়ে গিয়েছি। ব্যবসায়ীরা কোনো কারণে বাজারে দাম বাড়ালে গণমাধ্যম চাপ দেয়, সরকারও তড়িঘড়ি করে কোনো উদ্যোগ নিতে চায়, আবার কখনো কখনো ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে সরকারকে চাপ দিচ্ছেন, সরকার আবার শুল্ক ও কর কমিয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্য দুই-তিন দিন ঠিক থাকছে। তৃতীয় দিন থেকে সেই আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। এই যে দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে সেটি আমাদের ভাঙা দরকার। আমি মনে করি, খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে নীতির দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে, এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ খাদ্যবাজার দরকার। এ বাজারের একটি সঠিক কাঠামো থাকবে। সঠিকভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রিত হবে। এখানে রেজিস্টার্ড এজেন্ট ছাড়া কেউ কাজ করবে না। অনেকেই বলছেন, এগুলো তো আছে। কিন্তু আমি মনে করি, এগুলো খুবই সীমিত মাত্রায় আছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে যেসব ঘাটতি রয়েছে সেগুলোকে রেখে কখনই বাস্তবসম্মত বাজারকে বাজারের ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে স্বস্তি আনা যাবে না। সুতরাং সেসব জায়গায় একটি পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি একটি উপসর্গ, এটি কোনো সমস্যা নয়। কাজেই খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ করে কাজ করা হচ্ছে। খুচরা বাজারকে সামনে রেখে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। প্রকৃত সমস্যা যেহেতু অন্য জায়গায় সেখানে কাজ করা হচ্ছে না। কাজ করলেও সেটি অল্প সময়ের জন্য।
প্রথমেই তথ্যগত দুর্বলতার কথা বলি। বিগত সরকারের সময়ে সবসময় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। ৬ শতাংশের ভেতরে কীভাবে থাকে? তা জানা নেই। এ তিন ধরনের মূল্যস্ফীতির মধ্যে যেকোনো একটি বেড়ে গেলে অন্য একটিকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে কমিয়ে দিয়ে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে পরিসংখ্যান কৃত্রিমভাবে করার একটি বড় প্রবণতা ছিল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে যখন ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো এবং মূল্যস্ফীতি তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কথা শুরু হলো তখন থেকেই এ তিন ধরনের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে-কমছে। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রেখে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার প্রবণতা ছিল।
এক্ষেত্রে দেশীয় বাজারভিত্তিক পণ্য চাল-আলু, আমদানীকৃত দুটি পণ্য সয়াবিন তেল ও চিনি ও মিশ্র পণ্য পেঁয়াজ—এ পাঁচটি পণ্য নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ করেছি। সবসময়ই আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে স্থানীয় বাজারের দাম ওপরে। এর বাজারভিত্তিক ব্যাখ্যা হলো বাংলাদেশে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় দাম বেশি থাকে। তবে আমি সেটাকে অস্বীকার করছি না। যদি আমদানি করতে হয় তাহলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, সর্বোপরি মূল্য বাড়ে। যেহেতু সরকারের খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি রয়েছে, সেখানে যখন চালের প্রয়োজন হয় তখন অভ্যন্তরীণ বাজারের চালের সঙ্গে সরকারের খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির একটি প্রতিযোগিতার কারণেও চালের বাজারে দামের কিছুটা তারতম্য হয়—এ ধরনের একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়। কিন্তু বলার বিষয়টি হচ্ছে কখনই দেখতে পাইনি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের ওঠানামা রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের খুচরা বাজারে একই দাম থাকে। উৎপাদন মৌসুমে পণ্যের দাম কমবে, তারপর বাড়বে—সেটি আশা করতেই পারি। এখন এমন একটি প্রবণতা হয়েছে সারা বছর অব্যাহতভাবে একটি উচ্চমূল্য থাকে। এর ব্যাখ্যা কী? সেটি নজরে আনা দরকার আছে।
দেশে চালের উৎপাদন কম হয়েছে। সরকার আমদানির জন্য খুব যৌক্তিকভাবেই উদ্যোগ নিয়েছে। সম্ভবত ৯ লাখ টন আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ৮ লাখ টন আমদানি করা হয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে চাল আমদানির উদ্যোগটি সরকার একটু দেরি করে ফেলেছে। কারণ বোরো উৎপাদন হতে আরো দুই-তিন মাসের দরকার। চালের সরবরাহ ঠিক রাখতে আরো আমদানির প্রয়োজন। একইভাবে সরকার খাদ্য মজুদ করার জন্য প্রকিউরমেন্ট প্রাইস সরকার ঘোষণা করেছে সেটি গত বছরের চেয়ে ৭-১০ শতাংশ বেশি ঘোষণা করেছে। যেহেতু উৎপাদন কম তাই কিছুটা বেশি পেতেই তা করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রকিউরমেন্ট সেভাবে হচ্ছে না। বিশেষ করে ধান প্রকিউরমেন্ট হচ্ছে না। তবে এর বাজারভিত্তিক কারণ রয়েছে। কারণ কৃষক সরকারি দামের চেয়ে বাজারে বেশি দাম পাচ্ছেন। মিলাররা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনে নিচ্ছেন। তাই মূল্য নির্ধারণের জায়গাটিতে আরো বাস্তবসম্মত বা ডায়নামিক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল, যা এখানে দেখিনি। সরকারের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ টন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৩ লাখ ৭০ হাজার টন কেনা হয়েছে। আবার সরকারের মজুদ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলাররা সতর্ক হয়ে যান। মিলাররা সঙ্গে সঙ্গে বাজারের সরবরাহ কমিয়ে দেন। কারণ তারা জানেন, সরকারের প্রকিউরমেন্টের জন্য মিলারদের সঙ্গে দেনদরবার হবে। তখন সরকার দাম রিভাইজড করবে এবং মিলাররা বিক্রি করবেন। তখন আর কৃষকের কাছে কোনো চাল নেই। সব চাল মিলারদের কাছে। এই যে চক্র চলছে সেই চক্র থেকে সরকার বের হতে পারছে না। এ চক্রটি ক্রিয়াশীল। এর বাইরে যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো ২৭ টাকার চাল কীভাবে ৫৮ টাকায় বিক্রি হয়, সেটি সম্প্রতি নওগাঁয় দুজন জরিপকারী দেখেছে। তাতে দেখা গেছে, মিলার, অটোরাইস মিলার পর্যায়ে মার্জিন সবচেয়ে বেশি থাকছে। বাকিদের ন্যূনতম কম পর্যায়ে থাকছে। এত মার্জিন কীভাবে থাকে? তাদের প্রক্রিয়াকরণ, স্টোরেজ ব্যয় রয়েছে, ব্যাংক ঋণ রয়েছে, তা অনুধাবন করি। তার পরও মার্জিন তুলনামূলকভাবে বেশি। ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেল ও স্থানীয় বাজারে সয়াবিন তেল। সবসময়ই আন্তর্জাতিক বাজার স্থানীয় বাজারের চেয়ে ওপরে। ২০১৯ সাল থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক কালে যদিও বলা হয়ে থাকে, ডলারের মূল্য বেশি হওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এটি অনুধাবন করি সেটি ঠিক আছে। তবে এত ব্যবধান থাকায় আমাদের তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে স্থানীয় বাজারে চিনির দাম সবসময়ই বেশি। এ জায়গায় আমাদের আরো বোঝার রয়েছে। চিনির এত উচ্চমূল্য কেন? দেশীয়ভাবে ২-৩ শতাংশ চিনি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বাকি চিনি আমদানি করা হয়।
আমি সরাসরি কোনো সিন্ডিকেট কিংবা বাজারের ফ্যাক্টরকে দোষারোপ করতে চাইনি। আবার সরকারের নজরদারির দুর্বলতার কথাও বলছি না। বাজারে তিন ধরনের ফ্যাক্টরই কম-বেশি বিভিন্ন পণ্যে বিভিন্নভাবে ক্রিয়াশীল। বাজারের এ দুর্বলতার জন্য তিন ধরনের ফ্যাক্টরই দায়ী। এককভাবে কেউ দায়ী নয়। সেটির আলোকে যখন বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে দেখি তখন কখনো উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হয়, ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়, সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হয়, আমদানি বাড়ানোর কথা বলা হয়। কখনো দেখা যায়, বাজারে তদারকি করে কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দোকান বন্ধ করে দেয়া হয়। খুচরা পর্যায়ে যতটা তদারকি দেখি, আমদানি বা সরবরাহ পর্যায়ে ততটা তদারকি দেখি না। এ দুর্বলতাগুলো কেন? এত বড় বাজারকে রেগুলেট করতে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। সেটি কেন? এবং এর বড় দুর্বলতা হলো বাজারের পণ্যসংক্রান্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে থাকা দরকার, তা সরকারের কাছে নেই। সরকার দাবি করতে পারে, কতজন ডিলার, কতজন উৎপাদক, কতজন ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে তা সরকারের জানা। অবশ্যই সরকার জানে। কিন্তু তিনি জানেন না, তিনি কতটুক মজুদ করে রেখেছেন। তিনি জানেন না নামে-বেনামে কোন জায়গায় এগুলো রয়েছে। তিনি জানেন না এ সাপ্লাই চেইনে একজন ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরের পেছনে কারা কারা বিনিয়োগ করছে, সেই তথ্যগুলো সরকারের কাছে নেই। অথবা আমি যদি বলি যে বার্ষিক উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য আমরা জানি। কিন্তু আমি কি দৈনিক সরবরাহের তথ্য জানি? আমি কি মাসিক সরবরাহের তথ্য জানি? আমি কি এটা কোন কোন বাজার থেকে কে কে পাঠাচ্ছে তা জানি? না। এটা আমি জানি না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সরকারের এ তথ্যগুলো জানা খুব জরুরি। বাজারে এ অস্থিতিশীলতার পেছনে বড় একটি জায়গা হলো এ কারণগুলো। এ কারণগুলো কী? বাজারে ফরমাল মার্কেট এজেন্টের বাইরে ইনফরমাল আনরেজিস্টার্ড প্রচুর লোক এখন লগ্নি করে। কয়েকদিন আগেই সম্ভবত অর্থ উপদেষ্টা বলেছিলেন যে কারওয়ান বাজারে ট্রাক থেকে নেমে আড়তে যাওয়ার মধ্যে তিনবার হাতবদল হয়। তিনবার হাতবদল হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। তার মানে হচ্ছে সেই জায়গাটায় কেউ লগ্নি করছে, সেখান থেকে একটা মুনাফার ভাগ নিচ্ছে। শেষে সেই দায়টা ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ছে। এ রকম একটা আনরেগুলেটেড মার্কেটে আপনি কখনই কোনো পলিসি দিয়ে কোনো সুবিধা করতে পারবেন না। আমার মার্কেটে যারা ব্যবসা করবেন তাদের প্রত্যেকের লাইসেন্স থাকতে হবে, তাদের প্রত্যেকের তথ্যগুলো সরকারের কাছে ডকুমেন্টেড থাকতে হবে। কে কতটুকু লগ্নি করছেন, ব্যবসা করছেন, সেই তথ্য-উপাত্তগুলো সরকারের জানা থাকতে হবে। সে কারণেই আমি বলছি যে বাজারে আনরেগুলেটেড এবং আনরেজিস্টার্ড মার্কেট এজেন্টের দৌরাত্ম্য তৈরি হয়েছে, সেটি সাপ্লাই চেইনভিত্তিক। সাপ্লাই চেইনের বাইরেও তো প্রচুর রয়েছে। পুলিশের চাঁদা, স্থানীয় রাজনীতিবিদদের চাঁদা তো রয়েছেই। এতদিন সেগুলো দিয়েই মোটামুটি আমাদের খাওয়াতে পেরেছেন ব্যবসায়ীরা। এখন সেটা দিয়েও আর হচ্ছে না। কোনো না খাদ্যের বাজার বড় হচ্ছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, খাদ্যবাজারে লগ্নি করে মুনাফা করার সুযোগ হয়েছে। আমি এটিকে খারাপ বলছি না। কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। আনরেগুলেটেড আনরেজিস্টার্ডভাবে কেউ যাতে এ বাজারে ব্যবসা না করতে পারে সে জায়গায় আমাদের যেতে হবে। দ্বিতীয়, আমাদের বাজারের চাহিদা কী? চাহিদার পরিবর্তন কী সেটা কি আমরা জানি? সরকার বলতে পারে যে আমাদের বার্ষিক খাদ্য চাহিদা হচ্ছে এত। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে উৎপাদন এত হওয়ার পরও বাজারে চালের বা গমের বা পেঁয়াজের সরবরাহে টান পড়ছে। আমরা বলছি যে আমরা উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ উৎপাদন করছি, তার পরও পেঁয়াজের মূল্য বাড়ছে। এর একটা বড় কারণ হলো আমাদের চাহিদার তথ্য প্রকৃত নয়। আমি আবারো বলছি, আমাদের ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, আয় বেড়েছে। পণ্য এখন শুধু খাদ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার হয় না। পণ্য এখন ফিডমিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পণ্য এখন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। একই চাল, একই গম। সেগুলোও তো হিসাবের ভেতর থাকতে হবে। সুতরাং আমাদের চাহিদার হিসাব আরো ভালোভাবে করতে হবে এবং হালনাগাদ থাকতে হবে। সেটা কোন কোন খাতে কেমন, নিয়মিতভাবে তা হালনাগাদ থাকতে হবে। আমি একটি গবেষণা দেখেছি, মানুষের আয় বাড়লে পেঁয়াজের ব্যবহার বাড়ে। মানুষ আগে যতটুকু পেঁয়াজ খেত তার থেকে বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ খায়। আমাদের বাবা-মা আগে যতটুকু সয়াবিন তেল ব্যবহার করতেন, এখন সয়াবিন তেলের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছেন। তার মানে হচ্ছে কী? আমাদের চাহিদা বাড়ছে। সক্ষমতা আছে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে চাহিদা পুরো জানা থাকতে হবে।
তৃতীয় হলো আমার যে বার্ষিক বাজার চাহিদা, সেখান থেকে আমাকে দৈনিক বাজার চাহিদায় যেতে হবে। একজন ব্যবসায়ী বাজারের দৈনিক চাহিদা জানে। কোনো একটা বাজারে ওইদিনের চাহিদা একজন ব্যবসায়ী জানেন। কিন্তু আমাদের সরকারের কাছে ওই তথ্য নেই। দৈনিক চাহিদা এবং সেখানে কে কতটুকু সরবরাহ করবেন সেটা ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটররা জানেন। কিন্তু এ তথ্য সরকারের কাছেও থাকতে হবে। সুতরাং সেটা আমি বলার চেষ্টা করছি। ঠিক একইভাবে আমার জানা থাকতে হবে যে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কারা কারা সরবরাহকারী, ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার। দৈনিক ভিত্তিতে কে কতটুকু সরবরাহ করছে, ডিস্ট্রিবিউট করছে—সে তথ্য-উপাত্তগুলো সরকারের কাঠামোর ভেতর থাকতে হবে।
একইভাবে নন-মার্কেট এজেন্ট অনেকে ঢুকছে। যেমন টোল কালেক্টর, সুবিধাভোগী, স্থানীয় প্রভাবশালী ও পুলিশ। এগুলো তো আছেই এবং আমাদের মার্জিনটাও জানতে হবে। আমরা জানি যে মার্জিনের একটা হিসাব ভোক্তা অধিকারের কাছে রয়েছে। কিন্তু এ মার্জিনের হিসাব ডায়নামিক্যালি রাখতে হবে। সর্বশেষে যেটি আমি বলতে চাচ্ছি, এগুলোর জন্য একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত একটি ডেটাবেস থাকা দরকার। আপনার কাছে যখন এত তথ্য-উপাত্ত নেই, তখন সেই বাজারটিকে আপনি কখনই একটি সমন্বিত বাজার বলতে পারেন না। আমাদের একটি সমন্বিত বাজার কাঠামোয় যেতে হলে এ তথ্য-উপাত্তের বিষয়গুলো আমাদের হাতে থাকতে হবে। আমার কাছে মনে হয় সরকারের চেয়ে এ তথ্য-উপাত্তগুলো প্রাইভেট সেক্টরের কাছে বেশি আছে। থাকতেই পারে বেসরকারি খাতের কাছে। কিন্তু সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য-উপাত্ত থাকতেই হবে। যেটা এখন রয়েছে সেটা একেবারেই অপর্যাপ্ত। তা দিয়ে কখনই বাজারের ওপর প্রভাব ফেলা যাবে না। যেমন শুল্ক কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ কে করছে তা সরকারের জানা উচিত। দুই-তিনজন হয়তো আমদানি করছেন, তাকে সরকার শুল্ক সুবিধা দিল। এখন সরবরাহ করাটা তার মর্জির বিষয়। কারণ শুল্ক কমালে অন্য একজন যে আমদানি করে সরবরাহ দেবে, সেই কাঠামো নেই আমাদের। সুতরাং সেই জায়গাগুলোয় নজর রাখা দরকার বলে আমি মনে করি। সে কারণেই আমি বলছিলাম যে দেখেন ইনফরমেশনের ঘাটতি কি অনেক ঘেঁটেছি। কিন্তু আমি তথ্য-উপাত্ত পাইনি। কারণ সরকারের কাছে সেই তথ্য তো এত ডিটেইলে নেই। আমি যদি খাদ্যবাজারগুলোর কথা বলি, একেকটা খাদ্য সরবরাহ চেইন এবং আমি লোকাল কোনো জায়গায় তথ্য পাইনি যে বাজারে কারা প্রধান নেতৃত্বদানকারী নেতা।
তবে চীনা ওয়েবসাইটগুলোয় কিছু স্থানীয় সাপ্লাইয়ারদের নাম পাওয়া গেছে। এ তথ্য আমাদের স্থানীয় ডেটাবেজে নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে যারা ব্যবসা করছে, তাদের ডেটাবেজে রয়েছে।
অথচ এ তথ্য আমাদের সরকারের হাতে থাকা দরকার, বিশেষ করে যে বারোটা স্তরের সরবরাহ শৃঙ্খল আমাদের দেশে চালের ক্ষেত্রে বিদ্যমান, যেখানে খুচরা থেকে শুরু করে কনজিউমার পর্যন্ত প্রক্রিয়া চলে। এসব তথ্য কি সরকারের কাছে রয়েছে, তা জানাটা জরুরি। আমি মনে করি, এটি সম্ভব এবং সেই ধরনের কাঠামোয় আমাদের যেতে হবে। আমার অনুরোধ হলো যেন সরকার কোনো স্বল্পমেয়াদি সমাধান না নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলে।
এছাড়া বর্তমানে আমরা জানি যে ট্রানজেকশন কীভাবে হচ্ছে—ক্যাশে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অথবা নেটওয়ার্কের মধ্যে কারা কারা জড়িত। সেসব তথ্যও আমাদের কাছে থাকা দরকার। এটা করতে গেলে আমাদের ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিউআর কোড, মোবাইল ট্রানজেকশন ও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তবে একইভাবে দেশের বিভিন্ন মার্কেটের জন্য এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। অতীতে আমি কুমিল্লায় আলুর বাজার নিয়ে কাজ করেছিলাম এবং দেখেছি যে ঢাকার ব্যবসায়ীরা কোল্ড স্টোরেজে কীভাবে মুনাফা লাভ করেন। কখনো কখনো সরকার আলুর সরবরাহের অভাবে সমস্যায় পড়ে। কারণ এটি শুধু উৎপাদন নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ লগ্নি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসায়ীরা ফোন কলের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করেন।
সুতরাং একটি গোছানো বাজার কাঠামোয় যেতে হবে, যাতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের সুবিধা হয়। একইভাবে সরকারকে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করতে হবে, যেখানে সঠিক তথ্য বিনিময় হবে এবং বাজারে বিশৃঙ্খলা কমবে।
পাশাপাশি সমন্বিত খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য সরকারি পর্যায়ে কিছু আইনি সংস্কার দরকার হবে। ম্যান্ডেটরি লাইসেন্সের মাধ্যমে এটি করতে হবে এবং সব সরবরাহকারীদের অ্যাকাউন্ট নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাজারে স্বচ্ছতা আসে।
এছাড়া বড় সরবরাহকারীদের বাজার দখল করে রাখা বন্ধ করতে হবে। সিস্টেমের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে কেউ কোনোভাবেই বাজারকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করতে না পারে। এজন্যই সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল ও তদারকি কমিশন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেটি বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খলকে তদারকি করবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে। এ ধরনের কমিশন অন্য দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও কার্যকর হওয়া উচিত। এটি একটি স্থায়ী কমিশন হবে, যা সরকারের বাইরে থেকে বাজারের তথ্য পর্যবেক্ষণ করবে এবং ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হতে হবে, যেটি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ কমে যাবে এবং বাজারের সুষ্ঠু পরিচালনা হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাঠামোটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আমরা আশা করি সরকার এ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে আসবে।
এ কাজের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে একটি সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি সরবরাহ শৃঙ্খল সঠিকভাবে পরিচালিত হবে এবং তথ্য সংগ্রহ করা হবে। যদিও এটি একটি বড় কাজ এবং সময়সাপেক্ষ, তবে আমি আশা করি সরকার এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কাজ করবে এবং আমাদের দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। আমি আশা করি আমাদের সরকার এ বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করবে এবং একটি সুষ্ঠু ও ডিজিটাল সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থা তৈরি করবে।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের বক্তব্যে]










