কিন্তু প্রতিষ্ঠার চার বছর পরও ইনকিউবেটরের অধিকাংশ অংশেই অব্যবহৃত পড়ে আছে বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে এটি যে পিছিয়ে আছে, কেবল তা নয়, পাশাপাশি দেশে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের যেসব দুর্বলতা রয়েছে তারও নজির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ বিজনেস ইনকিউবেটর।
বিশ্বব্যাপী বহু বিখ্যাত বিজনেস ইনকিউবেটর রয়েছে। ব্যবসা উদ্যোগ ও উদ্ভাবনে তাদের সাফল্য রীতিমতো ঈর্ষণীয়। এর উদাহরণ পাশের দেশ ভারতের ভেঞ্চার ক্যাটালিস্টসের দিকে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়। এটি বিগত কয়েক বছরে ভারতে উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তর ঘটাতে ভূমিকা রেখেছে। অর্থায়ন, মেন্টরশিপ, সফল উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে নেটওয়ার্কিং এবং প্রযুক্তিপণ্যের মানোন্নয়ন ইত্যাদি সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে স্টার্টআপের দ্রুত বিকাশে সহায়তা করছে। ফ্রান্সে অবস্থিত স্টেশন এফ, সিঙ্গাপুরের স্পেজ ভেঞ্চারসহ অন্যান্য ইনকিউবেটর প্রতিষ্ঠানও এভাবে সমন্বিত উপায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছে। এসব প্রতিষ্ঠান কেবল নতুন উদ্যোগকে প্রাথমিক থেকে পরবর্তী পর্যায়ে উন্নীত করতে সহায়তা করে না, বরং যেকোনো ব্যবসায়িক চিন্তাকে বাস্তব রূপ দিতেও কাজ করে।
দুঃখজনকভাবে কলেবরে বড় হলেও চুয়েটের আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরে সমন্বয়ের বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। যে কারণে এটি এখন পর্যন্ত কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি। অথচ ফোর্বসের তথ্যে বলা হচ্ছে, ইনকিউবেটর প্রোগ্রামে অংশ নেয়া ৮০ শতাংশের বেশি স্টার্টআপ পাঁচ বছর পরও টিকে থাকে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ ব্যর্থ হয় এবং নতুন ব্যবসার ১০ শতাংশই এক বছরও অতিক্রম করতে পারে না। অর্থাৎ ইনকিউবেটর যদি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তাহলে দেশে নতুন নতুন উদ্যোগের পরিসর বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন ও এর লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে জরুরি উপাদান হলো সমন্বয়। কিন্তু দেশের প্রথম বিজনেস ইনকিউবেটরে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। একটি কার্যকর ইনকিউবেটরের জন্য যে ধরনের ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তা এখানে নেই। কোনো স্টার্টআপকে এগিয়ে নিতে হলে দরকার বিনিয়োগ, অভিজ্ঞ মেন্টর, বাজার ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ। কিন্তু এ ইনকিউবেটর খুবই সীমিত পরিসরে শিল্প খাতের সঙ্গে জড়িত। ফলে তরুণ উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না, আর বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন। এমনকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শুরুতে অফিস নিলেও কার্যক্রম শুরু না করেই সরে যাওয়ার ঘটনা সেই ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
আবার ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও এ প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়ানো যাচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। চুয়েট শহরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে দূরে অবস্থিত। প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য নিয়মিত ক্লায়েন্ট মিটিং, বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদের সহজলভ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বাস্তবতায় শহর থেকে ২ ঘণ্টার দূরত্বে একটি ইনকিউবেটর চালু রাখা কার্যত একটি অপ্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে। ফলে বড় কোম্পানিগুলো এখানে আসতে অনাগ্রহী হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, বরং বাস্তবতা। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে এটি সেটিকেই নির্দেশ করছে। এছাড়া আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্য অংশীজন—স্টার্টআপ, আইটি কোম্পানি কিংবা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ফলে যে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব চাহিদার একটি ফাঁক থেকেই গেছে।
একটি ইনকিউবেটরে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকরা সমন্বিতভাবে কাজ করেন। কিন্তু চুয়েট ইনকিউবেটরের ক্ষেত্রে এ সমন্বয়ই অনুপস্থিত। এখানে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, কিন্তু সেটিকে চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্ক, নেটওয়ার্ক ও প্রণোদনার কাঠামো তৈরি করা হয়নি। ফলে এটি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হয়েও কার্যকর হতে পারেনি। সমন্বয়ের এ ঘাটতির একটি অন্যতম কারণ হলো প্রশাসনিক বিভাজন। ইনকিউবেটরটি এখনো সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে নয়; বরং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, দায়বদ্ধতা অস্পষ্ট থাকছে এবং দ্রুত উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের অভাব এ ইনকিউবেটরের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় আইটি কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় উপস্থিতি না থাকলে কোনো ইনকিউবেটরই প্রাণ পায় না। এছাড়া অত্যাধুনিক ল্যাব, ডেটা সেন্টার, ডরমিটরি—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ মূলধনি বিনিয়োগ করা হলেও তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। এটি উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। অবকাঠামো নির্মাণে প্রাধান্য দেয়া হয়, সেখানে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয় না।
এসব সমস্যার সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। বড় আইটি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের ‘অ্যাংকর টেন্যান্ট’ হিসেবে যুক্ত করতে হবে, যারা এ ইনকিউবেটরের কার্যক্রমের গতি বাড়াবে। স্টার্টআপের জন্য একটি কার্যকর অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে—সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং স্পষ্ট পারফরম্যান্স সূচক নির্ধারণের মাধ্যমে ইনকিউবেটর পরিচালনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইনকিউবেটরকে কার্যকর করে তুলতে নিয়মিত মেন্টরশিপ, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ, বাজারে প্রবেশের সহায়তা এবং একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। এ উপাদানগুলো ছাড়া কোনো ইনকিউবেটরই কার্যকর হতে পারে না।
সারকথা, সমন্বয়ের অভাব দূর করতে না পারলে এ প্রকল্প দেশের ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।










