দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। দীর্ঘ প্রত্যাশিত এ স্বাধীনতার জন্য অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নারী। আজকের দিনে তাদের আমরা স্মরণ করি। স্বাধীনতার এই দিনে আমরা তাদেরও স্মরণ করি, যারা ধীরে ধীরে আমাদের স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এ যাত্রার মূল লক্ষ্য কেবল একটি ভূখণ্ড কিংবা মানচিত্রে স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভের নয়। বরং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের আদর্শকে ধারণ করে একটি শৃঙ্খলমুক্ত জাতি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী রাষ্ট্র গড়ার ইচ্ছাই ছিল এ সংগ্রামের প্রধান লক্ষ্য। সংবিধানেও সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে এ লক্ষ্য পূরণ অনেকাংশে সম্ভব।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে। সূচনালগ্নে বাংলাদেশের সম্পদ ছিল অপ্রতুল এবং ক্ষেত্রবিশেষে সীমিত। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান শক্তি। এত অর্জনের পরও নানা প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে ভিন্ন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এ দীর্ঘ যাত্রায় অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনমন হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়েছে। জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে অনিয়ম, জবাবদিহির অভাব ক্রমেই প্রকট হয়েছে। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধ সমাজে বেড়েছে। চলমান সংকটের মধ্যে দেশের মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী। প্রতিদিন সড়কে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অবৈধ ভবনে আগুনে মানুষ পুড়ছে। উচ্চ মূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ হারাচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা, অব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস হারিয়েছে দেশের চিকিৎসা খাতের ওপর। চিকিৎসা নিয়ে বেড়েছে মানুষের ভোগান্তি। এসবের পেছনে আর্থসামাজিক বৈষম্য ও সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে। যে রাজনৈতিক দলগুলো শাসনভার নিয়েছে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণের কাছে দেয়া অঙ্গীকার পূরণের চেয়ে দলীয় কিংবা কর্তৃত্ববাদী স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আবারো সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আর্থসামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং ব্যবস্থাপনাগত সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে ভিন্ন কিছু প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান বাড়েনি। এখনো সামাজিক অস্থিরতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশী বিনিয়োগ বা অর্থায়ন কম হয়। রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্তরায়। আর কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনই টেকসই হয় না। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে সংঘাত পরিস্থিতি থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা যেকোনো সংকটের মুহূর্তে উদ্বেগ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিকেও অস্থির করে তোলে। সার্বিক দিক বিবেচনায়, দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী না করলে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আর্থিক খাতে তারল্যের অভাবের মতো সমস্যাগুলোও জিইয়ে থাকবে।
অর্থনীতিকে বহুমুখী করার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের মানবসম্পদ। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে দেশে কর্মসংস্থান না বাড়লেও অর্থনীতিতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এ অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে ‘দক্ষতা ও উদ্ভাবনী অর্থনীতি’র দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। রফতানি ঝুড়িতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এ খাতটির ওপর নির্ভর না করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং অন্য বড় শিল্প সম্ভাবনাগুলোকে মূলধারায় আনার চেষ্টা করতে হবে। আর এ প্রচেষ্টায় জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগানোর সুযোগও রয়েছে। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে এ সুযোগ জনমিতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মক্ষম এ জনগোষ্ঠীকে সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আরঅ্যান্ডডি খাতে বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন টেকসই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি বন্ধ করা না গেলে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ পৌঁছবে না। এক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। বিশেষত জনসেবা ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল রাখে তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব কিছুর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, কৌশল, বিশেষায়িত দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ঐক্যবদ্ধ কর্মপদক্ষেপের সমন্বয় বেশি জরুরি। বিশেষত অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল রাখার জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ সমন্বয়ের তাগাদা অনুভব করে এগোতে হবে। বিশেষত আমাদের একটি টেকসই জ্বালানি নীতি গড়ে তুলতে হবে। আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে নিজস্ব সম্ভাবনা ও সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে ভাবার বদলে এখন থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
আধুনিক বিশ্ব মাল্টিপোলার ধরনের হলেও সব রাষ্ট্রই নিজ নিজ অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সুযোগসন্ধানের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ জরুরি। বিভিন্ন শিল্পের রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য সম্ভাব্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার অনুসন্ধান এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর বিশাল বাজারে প্রবেশ করার জন্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা জরুরি। এছাড়া বাংলাদেশী ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্লাস্টিকসামগ্রীর চাহিদা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় তৈরি হয়েছে। এ বাজারগুলোকে চাহিদামাফিক পণ্য সরবরাহ বাড়ানো এবং বিস্তৃত করার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রাখতে হবে। সরকারকে এক্ষেত্রে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেশী দুই বড় অর্থনীতির বাজার অর্থাৎ ভারত ও চীনে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা এবং আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
সরকার এরই মধ্যে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর জন্য আবেদন করেছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় এমনটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এক সময় আমাদের এলডিসি উত্তরণ করতেই হবে। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা বড় বাজারগুলো আমাদের সরাসরি শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে না। ওই সময় বিবেচনায় শ্রমবাজারে মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে ভাবতে হবে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমনটি বড় কৌশলগত বাজার রক্ষার লড়াই। মানবসম্পদকে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহারের স্বার্থেই তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে যেমন নজরদারি রাখতে হবে, মালিক পক্ষকেও শ্রমবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের সদিচ্ছা রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক বৈষম্য দূর এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়া সহজ। প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়ার চর্চা শুরু করতে হবে। তবেই আমরা সার্বিকভাবে একটি কল্যাণমুখী ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত হব। উন্নয়ন যেন কেবল সংখ্যাতত্ত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখে, সেদিকে রাষ্ট্রকে কঠোর দৃষ্টি দিতে হবে। ৫৫ বছরের এই পথচলায় বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশীল ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই পারে আগামীতে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।










