কোনো দেশের জাতীয় উন্নয়ন সংঘটিত হয় জাতীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, শিল্পনীতি ও শিক্ষানীতি, যা বাস্তবায়নের ফলে দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে। তেমনিভাবে ভাষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় কোনো দেশের ভাষা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটে এবং তার ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংশ্রয়স্থিত শৃঙ্খলার উন্নয়ন ঘটে। ভাষা পরিস্থিতি উন্নয়নের সঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের সম্পর্কটি বোঝার জন্য ভাষার স্বরূপ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। মানবভাষা হলো একাধারে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনুষঙ্গ বিশেষ। ভাষা একদিকে জাতীয়তাবাদীদের কাছে যেমন জাতীয়তাবাদ ও সভ্যতার প্রতীক, আবার অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে এটি হলো সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্র বিশেষ, যার মাধ্যমে অনুবর্তী দেশের সমাজ-সংস্কৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়। সে বিবেচনায় ইংরেজি ভাষা হলো আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার হাতিয়ার বিশেষ, আর বাংলা ভাষা হলো দেশের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার ব্যূহ বিশেষ। Gnamba (১৯৮১: ২৩৫-২৪০) বিবৃত করেছেন যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভাষিক উন্নয়ন যুগপৎভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে। তার মতে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ ও ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ মূলত সাম্রাজ্যবাদ নামক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো অনুবর্তী রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করতে সাম্রাজ্যের ভাষাকে সেসব দেশের চিন্তা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ ইত্যাদির বাহক হিসেবে প্রচলনে সচেষ্ট হয়। কাজেই বলা যায় যে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র তার সাম্রাজ্যবাদী নীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো দেশের ভাষা-পরিস্থিতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়। ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের বিপরীত হলো ভাষিক জাতীয়তাবাদ। সমাজ ভাষাবিজ্ঞানী Ouedraogo, Rakisssouiligri Mathieu (২০০০) বিবৃত করেছেন যেকোনো জাতির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পরিবাহিত হয় ভাষার মাধ্যমে। সেজন্য ভাষা কোনো জনগোষ্ঠীকে একটি জাতিতে রূপান্তরকরণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
কোনো জাতি ভাষাগতভাবে সংহত না হলে সে জাতি ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের কবলে নিপতিত হয় এবং সে দেশের ভাষা-পরিস্থিতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়। এর ফলে সে দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। কাজেই কোনো দেশকে ভাষা-পরিস্থিতিগত নেতিবাচক পরিবর্তনজনিত রাজনৈতিক সমস্যা থেকে সুরক্ষা করতে বা সেই ভাষা-পরিস্থিতিকে ঈপ্সিত ও ইতিবাচক দিকে সুগঠিত করতে জাতীয়তাবাদী ভাষা রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করা প্রয়োজন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে জেনে নেয়া যাক যে ভাষা-পরিস্থিতি বলতে কী বোঝায়। কোনো দেশের কথিত ভাষা সংখ্যা ও প্রত্যেক ভাষার কথক জনসংখ্যা এবং কথিত সব ভাষার আপেক্ষিক গঠন, মর্যাদা ও প্রায়োগিকতা ইত্যাদি মিলে সামগ্রিকভাবে যে ভাষিক চিত্র পরিস্ফুট হয়, তা-ই হলো সে দেশের ভাষা-পরিস্থিতি। অন্যপক্ষে ভাষানীতি হলো কতকগুলো কার্যপ্রণালি, যার সাহায্যে কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সে দেশের ভাষা সম্পর্কে তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এ তিন বিষয় হলো:
ক. জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষাকে (বা ভাষাগুলোকে) অন্যান্য অপেক্ষাকৃত অগুরুত্বপূর্ণ দেশীয় বা উপজাতীয় ভাষার চেয়ে অধিকতর মর্যাদা ও প্রায়োগিকতা আরোপকরণ;
খ. সেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষাকে বিভিন্ন উপাদানে সমৃদ্ধ করে পরিপুষ্টি সাধন এবং গ. সেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষাকে শিক্ষা ব্যবস্থা বা প্রশাসনের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচলন।
ভাষা-পরিস্থিতি স্বতঃপরিবর্তনশীল। সেজন্য কোনো দেশেরই ভাষা-পরিস্থিতি স্থির থাকে না। কিন্তু ভাষা-পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—এ উভয় পরিবর্তনই সাধিত হতে পারে। কিন্তু এ পরিবর্তন যদি দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির অনুকূলে সংঘটিত হয়, তাহলে তা হয় সে দেশের জন্য উন্নয়ন সহায়ক। আর যদি এ পরিবর্তন দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিকূলে সংঘটিত হয়, তাহলে এ পরিবর্তন হয় দেশের জন্য উন্নয়ন প্রতিবন্ধক।
বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতি স্থির নেই এবং তা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়ে আসছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতিতে এখন যে পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে, তা বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। আর এ পরিবর্তনের ছাপ সমাজ ও সংস্কৃতিতে সদা পরিদৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ইদানীং বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিকূলে এত নেতিবাচকভাবে পরিবর্তন হচ্ছে যে রীতিমতো তা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে, ততই যেন এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে নানা ভাষিক সমস্যা। এসব ভাষিক সমস্যার কোনো কোনোটি দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি প্রতিসম রাষ্ট্র হিসেবে স্থিত থাকায় কোনো বড় ধরনের ভাষা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে না। সেজন্য দেশের জাতীয় নেতৃত্ব কোনো সময়ই ভাষা-পরিস্থিতিগত সমস্যাকে আমলে নেয়নি। কারণ ভাষার বহুরূপ উপযোগিতা সম্পর্কে বাংলাদেশে রাষ্ট্রের চিন্তকরা ওয়াকিবহাল রয়েছেন বলে মনে হয় না। কেননা দেশের চিন্তকরা দেশের নানা নীতি, যেমন অর্থনীতি, পানিনীতি ও শিক্ষানীতি ইত্যাদি নিয়ে সরব থাকলেও ভাষানীতি নিয়ে নীরব রয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে এ ভাষানীতির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চিন্তকদের মধ্যে কোনো ধরনের আফসোস বা উপলব্ধিও নেই। ভাষানীতি সম্পর্কে তাদের এ নির্লিপ্ততার কারণ হলো—
ক. ভাষিক ইতিহাস ও ভাষা-পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞতা
খ. পাশ্চাত্যায়নের প্রতি অন্ধ লোলুপতা ও
গ. ইসলামায়নের প্রতি মোহাবিষ্টতা।
ইসলামায়নের প্রতি মোহাবিষ্টতা যতটা না ভাষানীতি প্রণয়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে, তার চেয়েও বেশি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে পাশ্চাত্যের প্রতি অন্ধ লোলুপতা। লক্ষ যদি হয় জাতীয় উন্নয়ন, তাহলে ইসলামায়নের প্রতি মোহাবিষ্টতা ও পাশ্চাত্যের প্রতি অন্ধ লোলুপতা কাটিয়ে ভাষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।
অধ্যাপক এবিএম রেজাউল করিম ফকির: ভূতপূর্ব পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভূতপূর্ব পরিচালক, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভূতপূর্ব অনুবন্ধ অধ্যাপক, সুলতান ইদ্রিস শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভূতপূর্ব অভ্যাগত অধ্যাপক, কোবে গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়










