কোনো জাতিকে মজবুত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে মাধ্যমিক শিক্ষা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর অন্যতম কারণ যেকোনো দেশের বেশির ভাগ নাগরিকের পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয় না। তাই এ স্তরের শিক্ষা মানসম্মত হলে তা সুনাগরিক তৈরিতে প্রভাব রাখতে পারে। অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষায় ঘাটতি থেকে গেলে তা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। কেননা উচ্চ স্তরের শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের যথাযথ মানসিক বিকাশ ঘটে না। নিদেনপক্ষে এ দুই দিক বিবেচনায় হলেও মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা দীর্ঘকাল ধরেই উপেক্ষিত। ফলে এ প্রাথমিক বা উচ্চশিক্ষা স্তরের মতো এ স্তরেও মানসম্মত শিক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। উল্টো গত ১০ বছরে মাধ্যমিক শিক্ষার মানে অবনমন ঘটছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সে দেখা গেছে, দেশে একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার মূল্যায়নে ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। প্রতিবেদনটিতে শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর ব্যান্ড ২ এবং সর্বোচ্চ স্তর ব্যান্ড ৬। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণীর মাত্র ৯ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, অষ্টম শ্রেণীর ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও দশম শ্রেণীর ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে ব্যান্ড ৬ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেছে। গণিতের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ শ্রেণীর মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী, অষ্টম শ্রেণীর ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ ও দশম শ্রেণীর ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্যান্ড ৬ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করেছে। উল্লেখ্য, এ প্রতিবেদন সর্বশেষ ২০১৯ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল। তারপর মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা আর মূল্যায়ন করা হয়নি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়া, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়া এবং শিশুকাল থেকে শিক্ষাকে সহজীকরণের প্রবণতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের পথে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো—পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি এবং শিখন-শেখানো পদ্ধতিতে যুগোপযোগী রূপান্তর না ঘটা।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে কয়েকটি উপাদান যথাযথ সমন্বয় করা জরুরি। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োজন, উপযুক্ত শিক্ষাদানসামগ্রী ও ভৌত অবকাঠামো প্রস্তুত, যথার্থ শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি আবিষ্কার, উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং ইত্যাদি। এসব কাজ করতে আবার প্রয়োজন অর্থায়ন। কিন্তু জিডিপির বিপরীতে দেশে শিক্ষা খাতের বরাদ্দও অতি সামান্য। অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও খুব বেশি কার্যকর প্রভাব দেখা যায়নি। উল্টো নানা অভিঘাতের মুখে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। সেগুলো মোকাবেলায়ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষত করোনা ও করোনা-পরবর্তী সময়ে।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জেরে ২০২০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অটোপাস দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আর ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে। সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে জুলাই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এইচএসসিতে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা স্থগিত হয়েছিল সেগুলোয় অটোপাস দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে পুনর্বিন্যাসকৃত সিলেবাস অনুযায়ী। অন্যদিকে প্রায় চার বছর পর চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্ণ সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষায় কৃতকার্য শিক্ষার্থীর হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি জানা গেছে, কৃতকার্যদের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ গড়ে ৪০ শতাংশেরও কম নম্বর পেয়ে কোনোমতে পাস করেছে।
শিক্ষা উপদেষ্টার ভাষ্যমতে, গত ১৬ বছরে যে সরকার ছিল, তাদের আমলে সরকারের সাফল্য দেখানোর জন্য ছাত্রছাত্রীদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে জিপিএ ৫-এর সংখ্যা ফুলিয়া-ফাঁপিয়ে ফল প্রকাশ করা হতো। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা বোর্ডগুলোকে চলতি বছরের পরীক্ষার খাতার প্রকৃত মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়ায় প্রকৃত ফল পাওয়া গেছে। শিক্ষাবিদদেরও অভিমত, বিগত সময়ে শিক্ষা খাতের অধিকাংশ উদ্যোগ ছিল রাজনীতি প্রভাবিত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নকেন্দ্রিক। স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে, আধুনিকীকরণের নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু শিখন-শেখানো পদ্ধতির মানোন্নয়নে তেমন নজর দেয়া হয়নি, বিনিয়োগও করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে প্রকৃতপক্ষে কী শিখছে তা পর্যবেক্ষণেরও ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রয়োগ ঘটাতে পারেননি। ফলে প্রযুক্তি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নই কেবল হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।
বিগত সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার এক বছর পেরিয়েছে। আগামীতে কোনো স্তরের শিক্ষায় নিম্নমুখী প্রবণত অব্যাহত থাকুক, সেটা কাম্য নয়। এখন থেকে শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রচেষ্টা করা হোক। রাতারাতি শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে শিক্ষার মান বৃদ্ধির প্রচেষ্টার ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে, এমন উদ্যোগ বর্তমান সরকারকে নিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষা মূল্যায়ন ট্রেন্ডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিকস অ্যান্ড সায়েন্স স্টাডির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে দেশের অবস্থান জানা যাবে। আশা করা যায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার প্রকৃত মূল্যায়ন পাওয়া যাবে। মূল্যায়ন কেবল যেন জানার জন্য না হয়। এর ভিত্তিতে যথাযথ সিদ্ধান্তও নিতে হবে, যাতে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব হয়।
শিক্ষার মানোন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়। এটি নির্ভর করে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া, পাঠ্যক্রমের প্রাসঙ্গিকতা এবং শিক্ষার্থীর শেখার প্রতি আগ্রহের ওপর। তাই সরকারের উচিত শিক্ষা খাতকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা এবং এ খাতে গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দেয়া। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করতে হবে দক্ষ শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, পাঠ্যক্রম ও শিখন-শেখানোর পদ্ধতির উন্নয়নে।










