পৃথিবীর কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। যদিও এ দেশের অর্থনীতির আকার বেশ বড়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। দুঃখজনকভাবে প্রতি অর্থবছরই এখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আহরণ হয় কম। এর অন্যতম কারণ দেশের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতগুলোকে করজালের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্যমতে, দেশে স্থায়ী অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ২১৪। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বা ভ্যাট (মূসক) নিবন্ধনধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ৫ লাখ ৫৭ হাজার। এ হিসাবে স্থায়ী অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর মধ্যে ভ্যাট পরিশোধকারী হিসেবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান আছে স্থায়ী অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯ শতাংশের কিছু কম। অর্থাৎ ৯০ শতাংশেরও বেশি স্থায়ী অর্থনৈতিক ইউনিটের কোনো ভ্যাট নিবন্ধন নেই।
এত বিপুলসংখ্যক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন না থাকা ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার সংস্কৃতিকে নির্দেশ করছে। সেই সঙ্গে এ পরিস্থিতি আরেকটি উদ্বেগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতগুলোকেই যেখানে পরিপূর্ণভাবে হিসাবের আওতায় আনা যায়নি, সেখানে প্রতিনিয়তই বাড়ছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার। গত বছর এনবিআরের তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পায় বণিক বার্তায়। সেই প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সরকারি হিসাববহির্ভূত অর্থনীতি রয়েছে মোট জিডিপির ৩০-৪০ শতাংশ বা ১৩৬-১৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো। নীতিবিরুদ্ধ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অবৈধভাবে পরিচালিত হওয়ায় এ খাতের আকার বাড়ছে। সরকারি হিসাবের বাইরে থাকায় এ খাত থেকে কোনো রাজস্বই পায় না সরকার। অথচ একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে রাজস্ব আয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা রাজস্ব আয় থেকে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ হয়। বলা বাহুল্য, রাজস্ব আয় কম হওয়ায় প্রতি বছরই দেখা দেয় বাজেট ঘাটতি।
আবার শুধু ভ্যাটই নয়, আয়কর ফাঁকি দেয়া ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। দেশের নিবন্ধিত করদাতার (টিআইএন নম্বরধারী) সংখ্যার তুলনায় আয়কর রিটার্ন দাখিল হয় যৎসামান্যই। সব মিলিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দুর্বল চিত্রই ফুটে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণেই কর আহরণ বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক ইউনিটগুলোর সিংহভাগ এখনো করজালের বাইরে থাকার অন্যতম কারণ এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কম। তাদের মতে, অটোমেশনের মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সংস্থাটির দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। এমনকি এনবিআরের ভ্যাট রাজস্ব আহরণ কম হওয়ার পেছনে সংস্থাটির নীতিগত ও কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন ব্যবসায়ী নেতারাও।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার খুব বেশি অবকাশ নেই। যেমন গত মাসে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শপিং মলের খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ ভ্যাট নিবন্ধন নেয়নি। নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট গোয়েন্দা) ২০২২ সালের জরিপের তথ্য এটি। আর বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির দাবি, দেশে ৪ লাখ ৮২ হাজার রেস্তোরাঁ থাকলেও ৭০ শতাংশ ভ্যাট দেয় না। এ দুই তথ্যেই বোঝা যায়, খাতভিত্তিক ভ্যাটের আওতার বাইরে রয়ে গেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এগুলোকে ভ্যাটের আওতায় না এনে সম্প্রতি নতুন করে ভ্যাটহার বাড়ানো হয়েছে শতাধিক পণ্য ও সেবার। আবার কর ও ভ্যাট আহরণে এনবিআরের সক্ষমতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে কর ও ভ্যাটজাল সম্প্রসারণ না করে বাণিজ্যিক ও পরোক্ষ কর বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর প্রচেষ্টা নিয়ে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে এমন কর কাঠামোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সেজন্য এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি আবশ্যক। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়িয়ে কর কাঠামোকে সুদৃঢ় করতে হবে।
কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো জরুরি। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৪ লাখ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ছিলেন। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ। টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়লেও সেভাবে প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়েনি। অর্থাৎ নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়লেও রিটার্ন জমা দেয়া ব্যক্তির সংখ্যা সেই তুলনায় কম। কম সংখ্যক রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিই দায়ী। এছাড়া রিটার্ন দাখিলের প্রমাণও (পিএসআর) যথাযথভাবে তদারকি হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে দেশে কর আহরণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ কম।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে প্রত্যক্ষ কর আহরণের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম জটিলতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য পুরো সিস্টেম অটোমেটেড হওয়া দরকার। করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া করদাতাবান্ধব কিংবা সহজ করতে হবে। এতে করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে দূরত্বও কমবে। পাশাপাশি করজালের সম্প্রসারণ ঘটবে বলে আশা করা যায়। আয়করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব বহুগুণে বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে আবার ধার্য ও আদায়কৃত আয়কর যথাসময়ে ও প্রকৃত পরিমাণে কোষাগারে আসার ব্যাপারে নজরদারিও জোরদার করা জরুরি।
এদিকে এনবিআরের কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, ভ্যাট নিবন্ধনযোগ্য সব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো এসব ট্রেডার ও সেবা প্রদানকারীদের মার্কেট এবং এলাকাভিত্তিক সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। এসব সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশনের নানা কৌশলের কারণে নিবন্ধন দেয়া যায় না। ভ্যাটজাল সম্প্রসারণ করতে হলে এসব সমস্যাও চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগোনো প্রয়োজন। বিশেষ করে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা সশরীরে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে বেশি ইচ্ছুক। কারণ সেখানে তাদের নিজস্ব স্বার্থও জড়িত রয়েছে। অটোমেটেড হলে সেই কারচুপি করার সুযোগ কমে আসবে। আবার আইন অনুসারে ব্যবসায়ী নিজেই একজন স্বীকৃত ভ্যাট সংগ্রাহক। তিনি এনবিআরের পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ব্যবসায়ীরা এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না বা ক্রেতাদের কাছ থেকে ভ্যাট সংগ্রহ করলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেন না। ক্রেতা দিলেও তা সরকার পাচ্ছে না। এটি তখন জনগণের টাকা ‘আত্মসাতের’ পর্যায়ে পড়ে। এটি রোধ করতে হলে ভ্যাট কর্তৃপক্ষকে তা আইন অনুসারে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে খুচরা ব্যবসায়ীদের দোকান বা শপিং মল ও রেস্তোরাঁয় মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আহরণে থাকা ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ও সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (এসডিসি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রত্যেক ভোক্তাকে ভ্যাট চালান চাইতে হবে এবং এনবিআরের নিয়মিত ভ্যাট চালানের বিষয়ে নজরদারি রাখা আবশ্যক।
সুদৃঢ় নীতি কাঠামো ও কর আহরণের সক্ষমতা ছাড়া রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। পরোক্ষ বা বাণিজ্য করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোয় এনবিআর অগ্রণী হোক—এটিই প্রত্যাশা।










