‘ সোজা রাজকুমারী সো জা...’
বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে পাস্ট টেন্সে লিখতে পারবো না।
তিনি আমার শ্রেণী, আমার শ্রেণীর রুচি, বাঙালি ডিগনিটি, মুঘল আউটপোস্ট থেইকা আধুনিক রাজধানী হয়ে ওঠা ঢাকা শহরের মেট্রোপলিটানিজম, আর একটা হারিয়ে যাওয়া দুনিয়া ও ক্ষীয়মাণ সময়ের শেষ পাবলিক প্রতিনিধি। একই সাথে ১৯৪৭-পরবর্তী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান, শীতল যুদ্ধের সমীকরণ এবং তৃতীয় পৃথিবীর উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের জটিল আখ্যানে ইন্দিরা গান্ধী বা সিরিমাভো বন্দরনায়েকের থেকে বেগম জিয়ার অবস্থান ও অবদান আলাদা ও বিশিষ্ট।
এ কথা আমি বলতেসি, কয়েক প্রজন্ম ধরে ঢাকার অধিবাসী, একজন ডিফেন্স পরিবারের সন্তান হিসেবেই। আমার জীবনের প্রথম অধ্যায় ক্যান্টনমেন্টে কাটসে এবং আমার মায়ের মতো ডিফেন্স ওয়াইফরা যেভাবে নিজেদের ক্যারি করতেন, তাদের সংযত, মার্জিত আচরণ, পরিশীলিত কনভার্সেশন, প্রপার সামাজিক কেতা, এমনকি কোন পার্টিতে কাঁটা চামচ দিয়ে খাবার বিশেষ ভঙ্গির সাথে আমি পরিচিত। এইখানেও ১৯৭০ দশকের শেষ ও ১৯৮০-র শুরুর ঢাকায় বেগম খালেদা জিয়ার বিশিষ্টতা, আজকের পরিবর্তিত ঢাকায়, বোঝাই সম্ভব না। কারণ আমাদের পুরনো সমাজ কাঠামো ও মূল চেতনা তখনো পুরাপুরি ভেঙে পড়ে নাই। আমাদের পুরনো রঈস ও আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মিশ্র ভদ্রলোকি ঢাকাইয়া জগতে, যেখানে শৃঙ্খলা, শিষ্টতা, নীরব আত্মাভিমান আর মর্যাদাবোধ তখনো ছিল জীবনের মূল সুর, যেখানে বাংলা কথা বলার একটা নির্দিষ্ট পরিশীলিত ভংগিমা ও একসেন্ট ছিল, ভদ্রপরিবারের পোশাক পরার একটা নির্দিষ্ট স্টাইল ছিল, ভদ্রপরিবারের মানুষের অন্য মানুষের সাথে মেশার একটা আদব ছিল; আর বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন আমাদের এ পৃথিবীরই মানুষ। আমাদের চেনা মানুষ। আমাদের মানুষ।
ছোটবেলায় বিমান বাহিনীর অফিসার্স ক্লাব ছিল আমার কাছে বাড়ির উঠোনের মতো। ওই ক্লাবের পুকুরে আমি বাবা বা বাবার বন্ধুদের কোলে বসে মাছ ধরসি। এ ক্লাবে, পিচ্চি কালেই, আমি বিলিয়ার্ড খেলা শিখসি। আমার পিতা বিমান বাহিনীতে যোগদানের পূর্বে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়েছেন এবং বিমান বাহিনীর অফিসার্স ক্লাবে তাদের, ওল্ড ফৌজিয়ানদের, রিউনিয়ন বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে, কর্নেল জিয়া ও বেগম জিয়া আমাকে আদর করসেন। অনেকেই করসেন, আমার মতো পিচ্চিদের সবাইকেই করসেন, আর এইটা বলতেসি, সেই সময়ের ঢাকাকে বোঝাইতে, আমাদের পূর্বতন সমাজের মনোরম সিভিক ও সোসাইটাল বন্ধনের সৌন্দর্যকে বোঝাইতে। আমাদের শ্রেণীর মধ্যে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্কের অপূর্ব মিঠাপন বুঝাইতে।
ফৌজি বা বিভিন্ন বাহিনীর অফিসাররা তখন কঠিন সময় অতিক্রম করতেসেন। একটি মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও দুর্নীতির মোচ্ছবের পর দেশে তখনো নিত্যব্যবহার্য ও খাদ্যদ্রব্যের অভাব; যতদূর মনে পড়ে অফিসারদের বেতন স্কেলও তখনো এক জায়গায় নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে (১৯৭৭ ঈসায়ীতে, জিয়াউর রহমানের শাসনকালে, ন্যাশনাল পে স্কেল রিভাইজড হয়েছে)। গণতন্ত্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রায়। একটার পর একটা ক্যু হইতেসে; নদী দিয়া ভাইসা যায় অনাম্নী বিপ্লবী আর তরুণ অফিসারদের লাশ। আমাদের সমাজ, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, তখনো অটুট এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রের থেকে অধিক কার্যকর; সমাজের, বিভিন্ন স্তরেই, বিভিন্নভাবে নূতন দেশ গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাঁচা মানুষগুলো সক্রিয়। বিভিন্ন বাহিনীর দেশপ্রেমিক বাঙালিদের অনমনীয়, দৃঢ় মনোবল ও ব্রাদারহুড, বিশেষত জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ছিল অব্যাহত। এই প্রক্রিয়ায়, সে সময়ের অগ্নিপুরুষদের তরুণী, অনিন্দ্যসুন্দরী ভার্যাদের যে কি ত্যাগ স্বীকার করতে হইসে, তাদের যে কী অপরিসীম অবদান, আমরা সেইটা নিয়ে কোনো গবেষণা বা কাজই করিনি। এই ফ্রন্টেও বেগম জিয়ার নীরব কিন্তু প্রবল উপস্থিতি নিয়ে কোনো আলাপ আমাদের রাজনৈতিক বা একাডেমিক জগতে জারি নাই।
সাউথ এশিয়া জার্নালের একটা লেখায় পড়সিলাম, ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নূতন অফিসার্স ক্লাবের উদ্বোধনে যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা স্মৃতিচারণ করসেন: ‘অন্য সব ডিফেন্স ওয়াইফরা ম্লান হয়ে গেসিলেন, যখন বেগম জিয়া ঘরে প্রবেশ করলেন কর্নেল জিয়ার সাথে। অন্য কেউ তার সৌন্দর্য, কমনীয়তা আর ব্যক্তিত্বের কাছাকাছিও কখনো আসতে পারেনি।’ ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমেদ, যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধা, তার সাথে বসা এক বন্ধুকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে বলসেন, ‘Others finished, totally eclipsed.’ এ যেন এক ফ্যাশন প্যারেড ছিল; যেখানে সব আর্মি ওয়াইফরা নিজেদের সেরা ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করতেসেন। কিন্তু বেগম জিয়া যখন ঘরে প্রবেশ করলেন, সব স্তব্ধ হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে এক বিমানবালা লিখেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়া খুব কম মেকআপ ব্যবহার করতেন, কিন্তু তার উপস্থিতি ছিল জাদুর মতো—সবসময় মার্জিত, সবসময় গ্রেইসফুল। ১৯৭৩ সালে এক অফিসার তার নববিবাহিতা স্ত্রীকে জিয়া দম্পতির সাথে পরিচয় করাইতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে স্ত্রী বলসেন, ‘আমার মনে হইসিল আমি কোন প্রতিমা দেখতেসি।’ দেখা করবার পুরো সময় তিনি বেগম জিয়ার ওপর থেকে চোখ সরাইতে পারেন নাই। এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করতে চাই, এই ঘটনার প্রায় দুই যুগ পর, ১৯৯১ ঈসায়ীর, ১২ এপ্রিল, মোজাম্মেল বাবু ও আনিসুল হক সম্পাদিত,“পূর্বাভাস”পত্রিকায়, দুর্মুখ ও কুচুটে হুমায়ুন আজাদ, বেগম খালেদা জিয়াকে আর্জেন্টিনার রূপসী ও অসম্ভব জনপ্রিয় ফার্স্ট লেইডি ইভা পেরোনের সাথে তুলনা করেন। হুমায়ুন আজাদ লেখেন, “খালেদা এখন প্রধানমন্ত্রী, এটা তার রাজনীতিক ও দ্বিতীয় পরিচয়; তার সহজাত ও প্রথম পরিচয় সে রূপসী।” তিনি তারপর একদম স্পষ্টাস্পষ্টি লেখেন, “বাঙলাদেশ পৃথিবীকে গণতন্ত্র দিতে পারবে কিনা, তা অনিশ্চিত; তবে বাঙলাদেশী গণতন্ত্র পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে রূপসী প্রধানমন্ত্রী...
আমি বেগম খালেদা জিয়াকে এভাবেই মনে রাখতে চাই: তিনি এক আরবেইন গ্রেইস, আমাদের মহানগরীয় রুচি, আর মর্যাদার শান। তাকে আমি কখনই দিনাজপুরের ‘পুতুল’ হিসেবে চিনতে পারি নাই, বরং তিনি ছিলেন সেই সফিস্টিকেটেড মুসলিম ভার্যা, যিনি করাচি থেকে ঢাকা, ক্যান্টনমেন্ট থেকে গণভবন, সর্বত্র নিজের একটা আলাদা ‘প্রেসেন্স’ তৈরি করসেন। ১৯৬০ সালের আগস্টে, মাত্র পনেরো বছর বয়সে, তিনি বিয়ে করেছেন পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানকে। ১৯৬৫ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান স্বামীর সাথে, করাচিতে থাকেন ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। মনে রাখতে হবে, করাচি সেসময় তেহরান বা বেইরুটের থেকেও পেল্লায় আধুনিক শহর। সেই মেট্রোপলিটন জীবন, সেই এক্সপোজার তার ব্যক্তিত্বে এক আলাদা মাত্রা যোগ করসে।
তার অসামান্য গ্রেইসের আরেকটা অভিক্ষেপ দেখব ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। তার স্বামী চট্টগ্রামে স্বাধীনতার ঘোষণা পড়তেসেন; খালেদা জিয়া ঢাকায়, জিম্মায় দুই ছোট্ট ছেলে, পাঁচ বছরের তারেক আর দেড় বছরের আরাফাত। ২ জুলাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে এবং তার ছেলেদের গ্রেফতার করে সিদ্ধেশ্বরীর এক বাড়ি থেকে এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখে। পাঁচ মাস/সাড়ে পাঁচ মাস—জীবন ও ইজ্জত রক্ষার রাহ-এ-জুনুন, স্বামীকে হারানোর আতঙ্ক, সন্তানদের ভবিষ্যতের উদ্বেগ নিয়ে কাটসে তার দিন। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তাকে মুক্তি দেয়া হয়; ১৬ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিন—সকালে তাকে পুরানা পল্টনে তার আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাবতে পারেন, কেমনে তিনি ম্যানেজ করসেন এই অসম্ভব স্ট্রেস, অনিশ্চয়তা; কি অদম্য মনোবল ছিল এই তরুণীর যে তিনি এই সব কিছু সহ্য করসেন এবং কখনো ভেঙে পড়েন নাই। ১৯৭৭ সালে যখন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হইসেন, তখনো তিনি খুব কম পাবলিক ইভেন্টে যোগ দিতেন। কর্নেল হারুনুর রশিদ খান, যিনি ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের এডিসি ছিলেন, তিনি বলেছেন, ‘বেগম জিয়া নিজেই ঘর সামলাইতেন, অতিথিদের স্বাগত জানাইতেন, পরিবারের বিষয়গুলো ম্যানেজ করতেন।’ ৬ শহীদ মইনুল রোডের সেই সাদামাটা সামরিক বাসভবন ছিল তার পৃথিবী। রাজনীতি তার কাছে আসে নাই, তিনি রাজনীতির কাছে যান নাই।
আমি রাজনীতির গবেষক নই। আর রাজনীতি নিয়ে কথা বলার কোনো রুচি আজকে নাই। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেইকা ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তার অমানুষিক জার্নিটা খালি কল্পনা করেন। চট্টগ্রামে, সামরিক ক্যুর সময়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দুই ছেলের মা একা হয়ে গেলেন; আর, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল এক শূন্যতা। এ ক্রান্তি-কুটিল সময়ে, এই দেশের রাজনীতি তাকে খুঁজতে এসেছিল, তিনি রাজনীতি বা ক্ষমতা খুঁজতে যান নাই। আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি, কি ভয়ংকর শোক-শীতল, কি ছোট আর অনাড়ম্বর তার ছিল তার রাজনৈতিক শুরুয়াত।
২ জানুয়ারি, ১৯৮২—তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিলেন। মার্চ ১৯৮৩—সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন হইলেন। ১০ মে ১৯৮৪—দলের চেয়ারপারসন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে সামরিক শাসন শুরু হয়ে গেসে। মার্শাল ল’; সংবিধান স্থগিত। অতঃপর আরম্ভ হইল বেগম খালেদা জিয়ার সেই মহাকাব্যিক সংগ্রাম: ১৯৮২ থেকে ১৯৯০। তাকে সাতবার গৃহবন্দি করা হইসিল ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত, কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে আসতেন আন্দোলনে, আরো দৃঢ়, আরো অটল। ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে। তারপর, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে, টিভিতে দেয়া বেগম খালেদা জিয়ার সেই বিখ্যাত ভাষণটা মনে আছে? আর একই সময় দেয়া শেখ হাসিনার ভাষণ? ওই এক ভাষণে বুঝা যায় নাই বেগম খালেদা জিয়ার ক্লাস? তার ইন্টিগ্রিটি? ওই এক ভাষণে কি তিনি ইলেকশন জিতার থেকে বেশি বাঙলার মানুষের মন জয় করে নেন নাই? ততদিনে বুদ্ধিজীবীরা ধরেই নিসেন আওয়ামী লীগ জিতবে। ২০ মার্চ ১৯৯১, খালেদা জিয়া শপথ নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে; বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হলো।
তার প্রথম সরকারের সময় তিনি শিক্ষা খাতে যুগান্তকারী সংস্কার এনেছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্য করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেন; আমি যদি ভুল না করে থাকি, তবে মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্য করেও দেন। ১৯৯০ সালে প্রায় ৩১-৩২ শতাংশ ছাত্র এসএসসি পাস করে, ১৯৯৫ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়াল ৭৩.২ শতাংশ। তিনি ভ্যাট চালু করসেন, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করসেন, বাংলাদেশের গার্মেন্টস এক্সপোর্ট মিরাকলের ভিত স্থাপন করসেন।
কিন্তু আমার সবচেয়ে বেশি মনে আছে সেই সময়ের উচ্চ পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের বিভিন্নমুখী সংক্রান্তি। তার মন্ত্রিসভায় যারা ছিলেন, তাঁদের শিক্ষা ও কখনো ইন্টেলেকচুয়াল সাবস্ট্যান্স ছিল। কিন্তু তার থেকে বেশি যা হইলো সমাজে ইন্টেলেক্ট প্রয়োগের, প্রসারের একটা পরিসর তৈরি।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতেন, তেমনি মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি একবার বলসেন, আমি প্যারাফ্রেজ করতেসি, আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু যদি কেউ বন্ধুর ছদ্মবেশে এসে প্রভু হিসেবে আচরণ করে, আমরা কখনই তাদের আধিপত্য মেনে নেব না। এই সেই মর্যাদাবোধ, যা তার চরিত্রের মূল ভিত্তি ছিল। তিনি বিশেষ ভাবে সার্ক-কেও এম্পাওয়ার্ড করসেন, তিনি বুঝতেন যে বাংলাদেশকে শুধু ভারত-পাকিস্তানের মধ্যখানে একটা দেশ হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটাকে হতে হবে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটা সেতু।
যাক, আর বেশি কথা না বলি। আমার এই বিক্ষিপ্ত ইম্প্রেশনিস্ট লেখায়, এইটাই বুঝাইতে চাইসিলাম যে, বেগম খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশেষ রাজনৈতিক ঘরানা এবং একটি বিলুপ্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পৃথিবীর শেষ পাবলিক প্রতিনিধি। তার না থাকা, আমার মতো অনেকের জন্য, আমাদের মুমলিকাত-এ-খুদাদাত-এর একটা চিহ্ন, অবসিত হয়ে যাওয়া। তার সাথে সাথে আধুনিক বাঙালি মুসলিম সমাজের মূল্যবোধের (অব) চেতন আধার অনেকটাই হারায় গেলো। আমাদের নিজস্ব পৃথিবীর ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য ধরে রাখার সিলসিলা ছিঁড়ে গেল। আমরা উম্মুল হয়ে গেলাম অনেকটাই।
লিখতে লিখতে কল্পনা করতেসি তার শয্যাপাশে কুন্দনলাল সায়গল বসে আছেন, বিমর্ষ। সায়গল গাইতেসেন সেই ঘুম পাড়ানি গান, যা এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর আবেশ জাগায়:
সো জা রাজকুমারী সো জা/ সো জা মিঠে সপনে আয়ে/ সপনো মে পিয়া দরশ দিখায়ে/উড় কর রূপনগর মে জায়ে/ সো জা রাজকুমারী সো জা...
ঘুমাও রাজকুমারী, ঘুমাও। এই ঘুমে মধুর স্বপ্ন আসবে, স্বপ্নে তোমার প্রিয়জনরা ফিরে আসবেন। উড়ে যাও সেই সৌন্দর্যের নগরে, যেখানে আর কোনো কষ্ট নাই, কোনো বেদনা নাই, কোনো অবমাননা নাই। দুঃখিনী মায়ের সন্তানদের ইনসাফের জন্য, আমাদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জং জারি রাখসিলা—তুমি প্রচণ্ড মর্যাদার সাথে বাঁইচা ছিলা এই দুনিয়ায়, আর দেশবাসীকে কান্দাইয়া, সবার কাছ থেকে সন্মান ও ভালোবাসা আদায় কইরাই ওফাত বরণ করলা।
সো জা রাজকুমারী সো জা। আমাদের দুঃখিনী বাংলার, শেষ রাজকুমারী, চিরনিদ্রায় শান্তিতে সমাহিত থাকো। আমিন।
এবাদুর রহমান: লেখক, তাত্ত্বিক ও নির্মাতা










