চলতি বছরের দাভোস সম্মেলনে, বিশেষ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অধিবেশনে, এআইয়ের শ্রমবাজার প্রভাব নিয়ে যে সতর্ক সুর শোনা গেছে, তা এ উদ্বেগকেই আরো দৃশ্যমান করেছে। উন্নত অর্থনীতিতে হোয়াইট-কলার খাতে ছাঁটাইয়ের সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলোও অনেকের কাছে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
কিন্তু আলোচনার এ প্রবল কেন্দ্রচ্যুতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে: এআই কেবল চাকরি নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরের কাঠামো, সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে কীভাবে পুনর্গঠন করবে? কারণ এআই মূলত তথ্যপ্রযুক্তির এমন এক উন্নত স্তর, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় এবং কর্তৃত্বের বিন্যাসে।
প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ইতিহাস এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার—কম্পিউটেশনাল শক্তির বৃদ্ধি, ইন্টারনেটের সম্প্রসারণ, পরবর্তীকালে স্মার্টফোন ও বেতার নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির আবির্ভাব—ব্যবসা-সংগঠনের প্রকৃতিকে আমূল বদলে দেয়। উল্লম্বভাবে সমন্বিত উৎপাদন কাঠামো ভেঙে যায়; তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খল। করপোরেট স্তরবিন্যাস সংকুচিত হয়; ‘ডিলেয়ার্ড’ সংগঠন কাঠামো গুরুত্ব পায়। সীমান্ত-পার বাণিজ্যের বিস্তার এবং উপাদানভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার উত্থান অবশ্য নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনের ফলেও ত্বরান্বিত হয়েছে; তবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ছাড়া এ রূপান্তর কল্পনাতীত ছিল।
একই সময়ে ডেটা ও অ্যালগরিদমভিত্তিক প্লাটফর্ম ব্যবসা-মডেলের উত্থান ঘটে। ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে সরবরাহকারী ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্লাটফর্মগুলো যে বাজার-প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, তা শুধু কর্মসংস্থান নয়, ভোগ ব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতার চরিত্রও বদলে দিয়েছে। এ অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি যখন তথ্যপ্রবাহের খরচ কমায়, তখন সংগঠনের ভেতর ও বাইরের সীমানা নতুনভাবে নির্ধারিত হয়।
এখন প্রশ্ন, জেনারেটিভ এআই সেই প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে?
গত বছর ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনে এক আলোচনায় ডেল টেকনোলজিসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বিবেক মাহিন্দ্র যুক্তি দেন—প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার উৎস তার ‘সাংগঠনিক সক্ষমতা’। ডেলের ক্ষেত্রে সরবরাহ-শৃঙ্খলই প্রধান অদৃশ্য সম্পদ। কিন্তু এআই সেই সক্ষমতার ধরন বদলে দিচ্ছে এবং তা পরিমাপের প্রচলিত পদ্ধতিকে অপ্রতুল করে তুলছে।
বিভিন্ন খাতে এর প্রাথমিক লক্ষণ দৃশ্যমান। আইন, হিসাবরক্ষণ ও অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে প্রবেশ-স্তরের কাজ স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজস্ব এআই মডেল ব্যবহার করে সফটওয়্যার উন্নয়নের সময় ও ব্যয় কমাচ্ছে। এতে করে প্রোগ্রামারদের চাহিদা কমতে পারে—এমন পূর্বাভাসও উচ্চারিত হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সাংগঠনিক প্রশ্ন উঠে আসে: যদি প্রতিষ্ঠানের নিম্নস্তর সংকুচিত হয়, তবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতা তৈরি হবে কীভাবে? কাজের মধ্য দিয়েই দক্ষতা অর্জন—এ ঐতিহ্যগত পথটি যদি সংকুচিত হয়, তবে মানবসম্পদ উন্নয়নের বিকল্প কাঠামো কী হবে? এরই মধ্যে কিছু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কোড লেখায় অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা মানবকর্মীর দক্ষতা সঞ্চয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা-লাভ দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
করপোরেট কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। একদল মনে করেন, এআই সমন্বয় ও দরকষাকষির ব্যয় কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আরো সমতল ও বিকেন্দ্রীভূত করবে। কাজের বড় অংশ আউটসোর্স করা সম্ভব হবে। ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান এমনকি এক ব্যক্তির বিলিয়ন-ডলার স্টার্টআপের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।
অন্যদিকে কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, জেনারেটিভ এআই যদি মানব অভিজ্ঞতায় ‘নিহিত জ্ঞান’ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়, তবে সংগঠন আবার কেন্দ্রীভূতও হতে পারে। ব্যবসা অনেকাংশেই নির্ভর করে এমন জ্ঞানের ওপর, যা লিখিত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত নয়; বরং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে একটি ছোট উদাহরণ শিক্ষণীয়। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের ভিক্টোরিয়া লাইনে কর্মরত এক রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী লক্ষ করেছিলেন, ওই লাইনের অস্বাভাবিক বাঁকানো ট্র্যাকের কারণে বগির চাকা বেশি ক্ষয়প্রবণ; তাই অতিরিক্ত গ্রিজ প্রয়োজন। তার অবসরের পর সেই জ্ঞান হারিয়ে যায় এবং ট্রেন বিকল হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকে।
এ ধরনের নিহিত জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ না হলেও প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতায় তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই যদি পুনরাবৃত্ত তথ্য ও আচরণ বিশ্লেষণ করে এই জ্ঞানকে শনাক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে, তবে সিদ্ধান্ত ক্ষমতার কেন্দ্র ও প্রান্ত—উভয়ের ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারিত হবে।
এ প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বের জন্য করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, এআই-প্রণোদিত সাংগঠনিক পরিবর্তনকে কেবল শ্রমবাজারের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; বরং প্রতিষ্ঠান কাঠামো, সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার রূপান্তর বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমবাজারে সম্ভাব্য বড় ধাক্কা মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। ১৯৯০-এর দশকে উৎপাদন খাতে স্বয়ংক্রিয়তার ঢেউ যে বহু উন্নত অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী শিল্প-অবক্ষয়ের ক্ষত তৈরি করেছিল, সেই অভিজ্ঞতা স্মরণীয়। অপ্রতুল নীতিপ্রতিক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি এড়ানো জরুরি।
সবশেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অপরিহার্য একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা। জেনারেটিভ এআই কীভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে, কোন ধরনের নিহিত জ্ঞানকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করবে, সিদ্ধান্তগ্রহণের দায়িত্ব কীভাবে পুনর্বিন্যস্ত হবে—এসব প্রশ্ন এখনই বিবেচনায় আনতে হবে। প্রযুক্তি গ্রহণ কেবল ব্যয় হ্রাসের কৌশল নয়; এটি সাংগঠনিক সক্ষমতা পুনর্নির্মাণের প্রক্রিয়া।
এআই যে কাজের ধরন বদলাবে সে বিষয়ে সন্দেহ কম। তবে আরো গভীর সত্য হলো—এটি ব্যবসার ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস, ক্ষমতার কাঠামো এবং প্রতিযোগিতার ভিত্তিকেই পুনর্গঠন করবে। আগামী দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তর তাই কেবল শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যাবে না; বুঝতে হবে প্রতিষ্ঠান-সংগঠনের ভেতরের পরিবর্তনকে। প্রস্তুত থাকতে হবে সেই নতুন বাস্তবতার জন্য।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ডায়ান কোয়েল: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক। তিনি ‘কগস অ্যান্ড মনস্টারস: হোয়াট ইকোনমিকস ইজ, অ্যান্ড হোয়াট ইট শুড বি’ (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২১) এবং ‘দ্য মেজার অব প্রগ্রেস: কাউন্টিং হোয়াট রিয়েলি ম্যাটারস’ (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২৫) গ্রন্থদ্বয়ের লেখক










