এসব দুর্ঘটনার খবর দেশের মানুষকে চমকে দেয়। অথচ প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর মেলে। তবে যে খবর পাওয়া যায় তা ক্ষুদ্র একটি অংশ। বাস্তবতায় এ সংখ্যা আরো বেশি। প্রাণহানি, আহতদের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতি এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের পর্যাপ্ত তথ্য কোথায় সংরক্ষিত থাকে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। তথ্যের ঘাটতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃতি ও কারণ প্রকৃত অর্থে বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার মতো বড় বোঝার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতাই চোখে পড়ে বেশি।
বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ঈদেই সড়কে চাপ থাকে বেশি। দীর্ঘ ছুটি পাওয়ায় অনেকে উৎসাহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। অথচ কয়েক বছর ধরেই এ আনন্দ বিষাদে পরিণত হচ্ছে সড়কের বিশৃঙ্খলায়। চলতি বছরেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। বরং অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো বীভৎস হয়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে দুর্ঘটনার ধরনের চেয়ে তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি একটি বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বিআরটিএর হিসাব এবং বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান পাশাপাশি তুলনা করা হয়েছে। এ তুলনা দেখলেই অসংগতিটুকু ধরা পড়ে। বিআরটিএর হিসাবে এবারের ঈদযাত্রায় যেখানে নিহতের সংখ্যা ১০০, সেখানে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী এ সংখ্যা ২৭০-২৮৫-এর ঘরে। পরিসংখ্যানের এ বিশাল ব্যবধান বা লুকোচুরি শুধু সংখ্যার লড়াই ভাবলে চলবে না। বরং এটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক গভীর উদাসীনতার প্রতিফলন।
একটি রাষ্ট্র দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করতে অনাগ্রহী হলে দুর্ঘটনাকেন্দ্রিক সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। সচরাচর বেসরকারি সংস্থাগুলো কিছুটা পরিশ্রমের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। তবে এসব তথ্য সংগ্রহে তারা সংবাদমাধ্যম কিংবা হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে। ফলে অধিকাংশ সময় তাদের পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ তথ্য তুলে আনতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে আহত ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারিভাবে অনেক সময় কেবল ‘অন স্পট’ বা ঘটনাস্থলে মৃত্যুকে হিসাবে ধরা হয়। এতে তথ্যের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। সরকারি সংস্থা হিসেবে বিআরটিএ শুধু পুলিশ কেসের ওপর ভিত্তি করে তথ্য দেয়। কিন্তু গ্রামীণ বা মফস্বল এলাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সালিশ বা আপসের মাধ্যমে মীমাংসা হয়ে যায় বিধায় পুলিশ কেস হয় না। হাসপাতালে নেয়ার পর মারা গেলে বা কয়েকদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে সে তথ্য অনেক সময় পুলিশ রেকর্ডে দুর্ঘটনার মৃত্যু হিসেবে যোগ হয় না। এভাবে বহু দুর্ঘটনা বা নিহতের হিসাব সরকারি খাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটি গঠন যেন দেশে একটি নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এসব কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফিটনেসবিহীন যান ও অদক্ষ চালকের দৌরাত্ম্য থামছে না। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য প্রাথমিকভাবে পুলিশই সংগ্রহ করে। এসব তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অ্যানালগ বা আংশিক ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয়ও নেই। এসবই আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার সিস্টেমেটিক ব্যর্থতা।
সড়ক ব্যবস্থাপনার এ ‘সিস্টেমিক’ ব্যর্থতা দূর করতে হলে কেবল উৎসবকেন্দ্রিক তৎপরতা নয়, বরং সারা বছর কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য সঠিক তথ্য ও উপাত্ত জরুরি। কেন, কীভাবে, কোন স্থলে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, তা পর্যবেক্ষণ করে পরিকল্পনা গোছাতে হবে। পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বের বেশকিছু দেশ আধুনিক প্রযুক্তি ও সুশৃঙ্খল নীতিমালার মাধ্যমে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সাফল্য দেখিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফারস (ফ্যাটালিটি অ্যানালিসিস রিপোর্টিং সিস্টেম) চালু করেছে। এ পদ্ধতিতে পুলিশ রিপোর্ট, হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রিপোর্ট, মৃত্যু সনদ, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ফাইল এবং ময়নাতদন্ত বা টক্সিকোলজি রিপোর্ট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে একজন ফারস বিশেষজ্ঞ কেন্দ্রীয় সিস্টেমে ইনপুট দেন। এভাবে যেকোনো জায়গা থেকেই দুর্ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে পারা যায়। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আইআরআইএস নামক এক ডিজিটাল প্লাটফর্ম রয়েছে। এখানে পুলিশ, হাসপাতাল ও আঞ্চলিক পরিবহন অফিসকে একসঙ্গে যুক্ত রাখা হয়। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লোকেশনসহ তথ্য দেয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরে পৌঁছে যায়। আমাদের সড়ক অবকাঠামো বিবেচনায় এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন কিছু নয়, কিন্তু কেন এমনটি করা সম্ভব হচ্ছে না তা সচেতন মহলের অনেকেরই জানা। এ সমস্যাগুলোর পেছনে একটি প্রধান কারণ প্রশাসনিক দুর্নীতি ও তদারকির অভাব। ট্রাফিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে জবাবদিহর ঘাটতি এবং ঘুসের বিনিময়ে নিয়ম ভঙ্গকারীদের ছাড় দেয়া—এসব প্রভাব সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা কেবল প্রশাসনিক সমস্যাই নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতি। প্রতিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসন, জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে ক্ষতি আমরা এখন সহ্য করছি, তা প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যে বড় ধরনের ঘাটতি থাকার পেছনে বেশকিছু কাঠামোগত ও প্রক্রিয়াগত কারণ রয়েছে। যেমন বিআরটিএর মূল কাজ হলো যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস প্রদান করা। সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করার মতো বিশেষায়িত জনবল বা আলাদা উইং তাদের জেলা পর্যায়ে নেই। তারা জেলা অফিসের সাধারণ কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করে, যাদের কাছে তথ্য সংগ্রহ করাটা একটি ‘বাড়তি চাপ’ হিসেবে গণ্য হয়। ফলে তথ্য সংগ্রহে এক ধরনের উদাসীনতা দেখা যায়। উন্নত দেশগুলোয় দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে তথ্য ইনপুট দেয়া হয় (যেমন জিআইএস ম্যাপিং)। বাংলাদেশে এখনো অ্যানালগ পদ্ধতিতে বা অনিয়মিতভাবে তথ্য আদান-প্রদান হয়। ফলে অনেক ছোট-বড় দুর্ঘটনা কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানে পৌঁছতে পৌঁছতে হারিয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করে যদি আমরা প্রকৃত সমাধান চাই, তাহলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তথ্যের ঘাটতি মেটাতে পুলিশ, হাসপাতাল ও বিআরটিএর মাঝে আন্তঃসংযুক্ত সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর দায়সারা তদন্ত কমিটি করলেই হবে না। বরং সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্থায়ী ডেটা অ্যানালিটিকস টিম গঠন করতে হবে। সড়কে যেন মর্মন্তুদ ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য নীতিনির্ধারকদের এখনই ঔদাসীন্য অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।










