পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড, অপঘাত, বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ও সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন নিয়মিত চিত্র। কেন্দ্রীভূত সরকার ও অর্থনীতির কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকায় জনস্রোত অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এ মেগাসিটি প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিতে রীতিমতো ‘টাইম বম্ব’ হয়ে আছে। যেকোনো ভূরাজনৈতিক হুমকি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে শহরটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ঢাকার বিশৃঙ্খলার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে সড়কে। পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় গণপরিবহনের অভাবে শহরের যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক বিশৃঙ্খল ও ব্যয়বহুল। এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেল কিছুটা স্বস্তি দিলেও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সংকট সামলাতে যথেষ্ট হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতির আশি ভাগের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাত হওয়ায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে চলে ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাকাটা। আবার বেশির ভাগ ফুটপাতই ব্যবহারের অনুপযোগী কিংবা নির্ধারিত মানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ফুটপাতের দুরবস্থায় মূল সড়ক দিয়েই বেশির ভাগ নগরবাসীকে চলাচল করতে হয়। এতে বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

‘ঢাকায় সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৫৬ শতাংশই পথচারী। এছাড়া ২৪ শতাংশ মোটরসাইকেল আরোহী ও ৮ শতাংশ রিকশা ব্যবহারকারী। নিহতদের মধ্যে ৮০ শতাংশ পুরুষ এবং বয়সভিত্তিক হিসাবে ২০-৪৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুহার বেশি। দিনের তুলনায় রাতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া বাস-ট্রাক চলাচল।

অথচ একটি কার্যকর নগর ব্যবস্থায় ফুটপাত শুধু হাঁটার জায়গা নয়, এটি মানুষের মৌলিক চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার অবকাঠামো। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতায় ফুটপাতের চিত্র ভিন্ন। কোথাও দখল হয়ে গেছে হকার ও দোকানে, কোথাও নির্মাণসামগ্রী বা পার্ক করা যানবাহনে। অনেক জায়গায় ফুটপাত ভাঙাচোরা, অসমান বা ব্যবহারের অযোগ্য। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটে, যেখানে প্রতিনিয়ত দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি হতে হয়। এ অবস্থায় পথচারীর মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা বলা বিভ্রান্তিকর। বরং এটি একটি পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল। যখন একজন মানুষ ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়, তখন দায় কেবল চালকের নয়—দায় নগর কর্তৃপক্ষেরও।

পথচারীদের নির্বিঘ্নে হাঁটাচলার জন্য একটি ফুটপাতের আদর্শ প্রশস্ততা ধরা হয় অন্তত দুই মিটার। যদিও ঢাকা মহানগর এলাকায় যত ফুটপাত আছে, তার প্রায় ৬৮ শতাংশেই এ ন্যূনতম প্রশস্ততা নেই। অবৈধ দখল, পার্কিং, ভাঙাচোরা দশা আর অপরিচ্ছন্নতার কারণে ঢাকার ফুটপাতে হাঁটা কঠিন। উন্নত পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তুলনা দূরে রেখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর শহরের দিকে তাকালেও দেখা যায় পরিচ্ছন্ন, সমতল, নিরাপদ ফুটপাতে হেঁটে চলেছে হাজারো নারী-পুরুষ ও শিশু। ঢাকার নানা জাঁকজমক বাড়লেও ফুটপাত দিন দিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে বাড়ছে পথচারীর সংখ্যা। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্য বলছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগর এলাকার ৩৮ শতাংশ মানুষ হেঁটে গন্তব্যে যায়। ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ। অর্থাৎ গত দেড় দশকে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মূলত যানজট ও গণপরিবহন সংকটে মানুষ বাধ্য হয়ে ‘খারাপ’ ফুটপাত দিয়েই হাঁটাচলা করছে বলে জানিয়েছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীবাসীর ফুটপাতে হাঁটার এ প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে এবং যানজট নিরসনের টেকসই সমাধানের অংশ হিসেবে ফুটপাত উন্নয়নসহ পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।

ফুটপাত পথচারীবান্ধব করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দখলমুক্ত করা। এটি নতুন কোনো আলোচনা নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা নেই। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও তা টেকসই হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা না গেলে অন্য কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না। দ্বিতীয়ত, ফুটপাতের মান উন্নয়ন জরুরি। প্রশস্ততা, সমতলতা, প্রতিবন্ধীবান্ধব র‍্যাম্প, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ট্যাকটাইল পথ—এসব নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ফুটপাত এতটাই সরু যে সেখানে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাই কঠিন। ফলে মানুষ বিকল্প হিসেবে সড়কই বেছে নেয়। তৃতীয়ত, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। জেব্রা ক্রসিং, সিগন্যাল ও ফুটওভার ব্রিজ সবকিছুর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, তা ব্যবহারযোগ্য ও সুবিধাজনক হতে হবে। অন্যথায় মানুষ ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হবে। চতুর্থত, সড়ক ব্যবস্থাপনায় ‘পথচারী অগ্রাধিকার’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। উন্নত নগরগুলোয় এখন ‘কমপ্লিট স্ট্রিটস’ ধারণা অনুসরণ করা হয়, যেখানে পথচারী, সাইকেল আরোহী ও গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ঢাকায়ও এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। সড়ক শুধু যানবাহনের জন্য নয়, মানুষের জন্যও। পঞ্চমত, আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। চালকদের মধ্যে পথচারীর প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে, একই সসঙ্গে পথচারীদেরও নিরাপদ আচরণে উৎসাহিত করতে হবে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে দায়বদ্ধতার ভার সমান নয়। শক্তিশালী ও দ্রুতগতির যানবাহনের চালকদের দায়িত্ব বেশি।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যারা সড়ক ব্যবহার করেন পথচারী, যাত্রী, চালক সবাই সড়ক ব্যবহারে সচেতন হলে এবং আইন মেনে চললে সড়ক অনেকাংশে নিরাপদ হয়ে উঠবে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় অবকাঠামোগত পরিবর্তন এবং যথাযথভাবে সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিএমপি ও ডিএনসিসির উদ্যোগে ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল উপযোগী করা হচ্ছে। এ উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক, তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে তাদের জীবনজীবিকা হুমকিতে না পড়ে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ প্রণীত হয়েছিল। তার আওতায় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারবিষয়ক গাইডলাইন, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো যায়। ট্রাফিক চলাচল ও ফুটপাত ব্যবহার নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে।

সবশেষে, ডেটাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। কোন এলাকায় বেশি পথচারী নিহত হচ্ছেন, কোথায় ফুটপাত অকার্যকর—এসব তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। ঢাকা একটি জনবহুল শহর, যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। ফুটপাত পথচারীবান্ধব করা মানে শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; এটি একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলার অঙ্গীকার। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়—ঢাকার সড়ক কি শুধু গাড়ির জন্য থাকবে, নাকি মানুষের জন্যও নিরাপদ হবে?