মামুন রশীদ, প্রথিতযশা ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। প্রায় ৪০ বছর কাজ করেছেন তিনটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে, বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। বর্তমানে আর্থিক খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্সের চেয়ারম্যান। সম্প্রতি তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম।

বাংলাদেশ ব্যাংককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করার যে প্রস্তাব এসেছে, এটি কতটা সময়োপযোগী এবং প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন?

বাংলাদেশ ব্যাংককে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী জরুরি কাঠামোগত পদক্ষেপের অংশ। কিন্তু গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। এখন আমরা একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছার স্বপ্ন দেখি। এ লক্ষ্য অর্জনে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এখানে একটি শক্তিশালী, কার্যকর ও নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল মুদ্রানীতি তৈরি করে না—মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা, ব্যাংক খাতের তদারকি ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও এটি প্রধান নিয়ামক।

আজ যখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নানা দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে, তখন স্পষ্ট হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা না থাকলে আর্থিক খাত কখনই সুশাসনের আওতায় আসবে না। বর্তমান কাঠামোয় বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যত সরকারের একটি দপ্তরের মতো পরিচালিত হয়। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রাধান্য পায়।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংককে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি বাস্তবায়ন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। তবে শুধু আইন পাস করলেই হবে না—এটির বাস্তব প্রয়োগ, নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রূপায়ন জরুরি। না হলে এটি কেবল কাগুজে স্বাধীনতা হয়েই থেকে যাবে।

নতুন অর্ডার অনুযায়ী গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে সংসদের অনুমোদন এবং সার্চ কমিটি—এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকারিতায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

নিয়োগ প্রক্রিয়া যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি। বিশেষত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান যেখানে গভর্নর একজন প্রধান নির্বাহী এবং নীতিনির্ধারক—সেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতা ছাড়া অন্য কোনো বিবেচনায় নিয়োগ হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ২০২৫-এর খসড়ায় গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে সংসদের অনুমোদন ও সার্চ কমিটির পরামর্শ গ্রহণের যে প্রস্তাব এসেছে, তা একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়। এটি বাস্তবায়ন হলে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কিছুটা ভারসাম্য তৈরি হবে।

এটি কেবল কার্যকর হবে তখনই, যদি সার্চ কমিটি গঠন হয় স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। কমিটিতে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি নয়, বরং অর্থনীতি, ব্যাংকিং প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের রাখতে হবে।

আবার প্রধানমন্ত্রীর হাতে যদি সার্চ কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করার অধিকার থাকে, তবে এটি গৃহপালিত একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে। তাই আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা দরকার যে, সার্চ কমিটির বাইরে কাউকে নিয়োগ দেয়া যাবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, গভর্নর পদে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে যার শুধু কারিগরি জ্ঞান আছে তা নয়, একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ সামাল দেয়ার ব্যক্তিত্ব ও নীতিগত দৃঢ়তাও থাকতে হবে।

প্রস্তাবিত নতুন পরিচালনা পর্ষদে সরকারি কর্মকর্তাদের বাদ দেয়া কতটা যৌক্তিক এবং বাস্তবে এর প্রভাব কী হতে পারে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি আমলাদের সরাসরি অংশগ্রহণ একটি ‘দ্বৈতশাসন’ তৈরি করেছিল। আর্থিক খাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ ধরনের সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে।

নতুন খসড়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দেয়া অত্যন্ত সাহসী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কারণ একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের সহযোগী হতে পারে, তবে তার অনুগত নয়।

পর্ষদে অর্থনীতি, ব্যাংকিং, আইন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এখন একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক বোর্ড’ গঠনের প্রস্তাব এসেছে। এটি বাস্তবায়ন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মান বাড়বে।

বাস্তবায়নের সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন পেশাজীবী পরিচয়ের আড়ালে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেয়া না হয়। গভর্নরের দেয়া তালিকার বাইরে কাউকে নিয়োগ না দেয়ার শর্তটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা ইতিবাচক পদক্ষেপ।

সমন্বয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত? এতে মুদ্রানীতির স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে কিনা?

সমন্বয় পরিষদ—যার নেতৃত্বে থাকবেন অর্থমন্ত্রী এবং সদস্য হিসেবে থাকবেন বাণিজ্যমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর—এর ধারণাটি মূলত সামষ্টিক অর্থনীতিতে সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে গঠিত। বাজেট, মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার যেন পরস্পরবিরোধী না হয়—এ লক্ষ্য প্রশংসনীয়।

এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, যদি এ সমন্বয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আরেকটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কেননা একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মুদ্রানীতির স্বাধীনতা হারালে দেশ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশী বিনিয়োগে সংকটে পড়তে পারে।

তাই পরিষদের কাজ যেন শুধু পরামর্শ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে—এমন নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অর্থমন্ত্রী যদি গভর্নরের স্বাধীনতা খর্ব করেন, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা মুখস্থ নির্দেশ বাস্তবায়নের দপ্তরে পরিণত হবে।

বাধ্যতামূলক ব্যাংক রেজল্যুশনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কীভাবে আরো কার্যকর করতে পারে?

ব্যাংক রেজল্যুশন বলতে বোঝায় এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা ব্যর্থ ব্যাংকের ওপর দ্রুত হস্তক্ষেপ করে তাকে পুনর্গঠন, অধিগ্রহণ বা বন্ধ করে দেয়া যায়। বর্তমানে এ ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা বাংলাদেশে অনুপস্থিত বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত—এমনকি দুর্বল ব্যাংক খাতের ব্যাংকগুলোর অকার্যকারিতা সত্ত্বেও তারা টিকে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ২০২৫ সালে এ ক্ষমতা দেয়ার উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ একটি শক্তিশালী ব্যাংক তদারকি কাঠামো ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।

রেজল্যুশন ইউনিট গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও দ্রুত সংস্কারের সুযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দৃঢ়তা দেবে। তবে এ ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করার জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ থাকা দরকার।

আপনি কি মনে করেন, প্রস্তাবিত আইন বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারবে?

আইন স্বাধীনতার শর্ত নয়, স্বাধীনতার কাঠামো মাত্র। সত্যিকার স্বাধীনতা আসে প্রয়োগ ও রাজনৈতিক

সদিচ্ছা থেকে।

প্রস্তাবিত অর্ডারে অনেক ইতিবাচক দিক আছে: সংসদীয় জবাবদিহি, সার্চ কমিটি, পর্ষদে পেশাজীবী, বাধ্যতামূলক অপসারণের নিয়ম, রেজল্যুশন ইউনিট—সবই ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ আইন বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে?

গভর্নর পদে কি যোগ্য ও নীতিপরায়ণ ব্যক্তিকে বসানো হবে, না রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় হবে? সংসদীয় অনুমোদন কি রাবার-স্ট্যাম্পে পরিণত হবে?

সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপ করতে চায়, তবে সবচেয়ে শক্তিশালী আইনও অকার্যকর হয়ে পড়বে। অতীতে আমরা এর বহু উদাহরণ দেখেছি।

তাই আমি বলব, আইন এক শুরু মাত্র। সত্যিকার স্বাধীনতা তখনই আসবে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র এ আইনকে সম্মান জানাবে এবং বাস্তবে এর চর্চা করবে।