শিশুদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম খেলনা। শিশুর মানসিক বিকাশেও খেলনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের প্লাস্টিক খেলনা দেয়া হয়। এর প্রধানতম কারণ প্লাস্টিক খেলনা অভঙ্গুর হয়। কিন্তু টেকসই হলেও এ জাতীয় খেলনা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকারক। কেননা এসব খেলনা তৈরিতে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে বিশেষত শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের মধ্যে মুখে খেলনা দেয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। মুখে দেয়ার কারণে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ তাদের শরীরে প্রবেশ করে। সম্প্রতি বিষয়টি পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) পরিচালিত ‘টক্সিক প্লে টাইম: আনকভারিং হেভি মেটালস ইন চিলড্রেনস প্লাস্টিক টয়েজ’ শীর্ষক এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া শিশুদের প্লাস্টিকের খেলনার ৭০ শতাংশেই রয়েছে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু। এমনকি খেলনায় স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ এসব উপাদানের মাত্রা ছাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়ে ১০-৭০ গুণ পর্যন্ত। গবেষণায় লাল, হলুদ, কমলা রঙের খেলনা নমুনা হিসেবে ব্যবহার করে দেখা গেছে, এসব রঙের খেলনায় অতিমাত্রায় বিষাক্ত রঞ্জকের উপস্থিতি রয়েছে। উজ্জ্বল রঙের ২০ শতাংশ খেলনায় বিপজ্জনক মাত্রায় ক্লোরিন ও ব্রোমিন পাওয়া, যা পিভিসি প্লাস্টিক ও ফ্লেম রিটার্ডেন্ট উপকরণ দিয়ে তৈরি। অথচ এসব রাসায়নিক উপাদানের প্রতি শিশুর দেহ বেশ সংবেদনশীল।
এসব বিষাক্ত পদার্থ শিশুর শরীরে প্রবেশ করে নানা রোগ সৃষ্টি করে। বিশেষত সিসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক শিশুদের জন্য। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এরই মধ্যে সিসাদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটির বেশি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সিসা শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যা তাদের মানসিক এবং শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সিসাদূষণ শিশুদের বুদ্ধিমত্তা হ্রাস, আচরণগত সমস্যা এবং শেখার অক্ষমতার মতো দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেখানে বর্তমানে দেশে সিসাদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, সেখানে শিশুদের প্লাস্টিক খেলনায় অতিমাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়াটা বড় ধরনের শিশুস্বাস্থ্য ঝুঁকির সংকেত দিচ্ছে। আর শুধু সিসা নয়, যে কোনো ভারী ধাতুর অতিমাত্রায় উপস্থিতিই শিশুর জন্য ক্ষতিকারক। এতে কিডনি রোগ থেকে শুরু করে ক্যান্সারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এসব ঝুঁকি থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে হলে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে নিরাপদ খেলনা। দেশে অনিরাপদ খেলনার উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। আমদানীকৃত খেলনার বিষয়েও সতর্ক থাকা আবশ্যক। এসডোর আগের এক গবেষণায় ৮০ শতাংশ খেলনায় ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যায়, যার বেশির ভাগই চীন থেকে আমদানি করা হয়েছিল। তাই খেলনা আমদানির ক্ষেত্রেও সেটি কতটা নিরাপদ তা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে অনিরাপদ খেলনা আমদানি বা তৈরির অন্যতম কারণ এখানে খেলনার জন্য কোনো বাধ্যতামূলক রাসায়নিক নিরাপত্তা আইন নেই। কোনো লেবেলিং, পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা কিংবা রিকল (প্রত্যাহার) ব্যবস্থাও নেই। বরং অনেক খেলনা তৈরি হয় পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে। আর আমদানীকৃত খেলনার সঙ্গেও থাকে না কোনো রাসায়নিক নিরাপত্তা রিপোর্ট বা ট্রেসেবিলিটি। ফলে এসব খেলনা মুখে দেয়ার মাধ্যমে শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দীর্ঘ সময় খেলনা মুখে দেয়ার ফলে বিপাক সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে পড়তে হয় শিশুদের। শিশুস্বাস্থ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিষাক্ত ভারী ধাতুর খেলনা যেমন বড় ঝুঁকি, তেমনি শিশুদের অধিকারেও লঙ্ঘন। শিশুদের স্বাস্থ্যসম্মত ভবিষ্যৎ উপহার দিতে হলে নিরাপদ খেলনার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের বিকাশ যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে সেটি জাতির জন্যও হুমকিস্বরূপ। কারণ তারাই আগামীতে দেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরবে। তাদের বিকাশ সুষ্ঠুভাবে না হলে এক সময় কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা নিম্নমুখী হতে পারে। সুতরাং এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থমুক্ত খেলনা তৈরিতে সরকারকে তৎপর হতে হবে।
খেলনা তৈরির ক্ষেত্রে ভারী ধাতুর ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। শুরুতে উল্লিখিত গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, খেলনা টেস্টের স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হয়েছে। মান তৈরির ক্ষেত্রে চারটা প্যারামিটার তৈরি করা হয়েছে। এসব পণ্য টেস্ট করারও সক্ষমতা সংস্থাটির রয়েছে। তারা তাদের সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার করবে প্রত্যাশা রয়েছে। নিরাপদ সীমার অতিরিক্ত রাসায়নিক যেন ব্যবহার না হয় সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। এছাড়া খেলনা বাজারে প্রবেশের আগে পরীক্ষা বাধ্যতামূলক এবং সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খেলনা নিশ্চিত হয়। এছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত খেলনা নিশ্চিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে—গবেষণায় যাদের উৎপাদনকৃত খেলনায় অতিমাত্রায় বিষাক্ত ভারী ধাতু পাওয়া গেছে তাদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা। বলা বাহুল্য, উৎপাদক শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে উৎপাদিত খেলনার মান নিশ্চিত করা কঠিন হবে। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও, বিশেষত অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। অভিভাবকদের সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে কিছু কার্যক্রম হাতে নেয়া যেতে পারে। যেমন এলাকাভিত্তিক সভা-সেমিনার। আবার প্লাস্টিকের বাইরেও নানা ধরনের খেলনা বাজারে পাওয়া যায়, যেমন মাটি ও বাঁশের নির্মিত খেলনা। সেগুলোও শিশুকে দেয়া যেতে পারে।
তবে দেশে প্লাস্টিক খেলনার চাহিদা গুণগত মানের জন্য কমে গেলে সেটি দেশের জন্যই ক্ষতিকর হবে। বর্তমানে দেশের প্লাস্টিক শিল্পের দ্রুত বিকাশমান উপখাত হলো খেলনা উৎপাদন। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি এর রফতানিও ক্রমবর্ধমান। দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও বিদেশের খেলনার বাজার ধরে রাখতে হলে গুণগত মান নিশ্চিতের বিকল্প নেই।










