বর্তমান যুগে নানামুখী শক্তি উচ্চশিক্ষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে, যা ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এখনো নিশ্চিত নয়, কোন মডেলটি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে বা কার্যকর হবে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাওয়া সমাজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এক অচিন্তনীয় রূপ নিয়েছে। আমরা আজ যে বিশ্বে বাস করছি, তা ১০ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। ঠিক সেইভাবে আগামী কয়েক বছরে আমাদের শেখার, পড়ানোর এবং এক জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে টিকে থাকার পদ্ধতিগুলোও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে।
ইতিহাস বলে, সমাজ যেমন দ্রুত পরিবর্তিত হয়, শিক্ষা ব্যবস্থা সাধারণত অনেক ধীরে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতি এতটাই দ্রুত ও শক্তিশালী যে এ ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে। আগের শিল্প বিপ্লবগুলো যেখানে যন্ত্র, কারখানা আর শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি হলো উন্নত প্রযুক্তি, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস, রোবোটিকস, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডাটা অ্যানালিটিকস। মূলত চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের ডিজিটাল, শারীরিক এবং জীববৈজ্ঞানিক জগৎকে এক সূত্রে গেঁথে দিচ্ছে।
তাহলে এ পরিবর্তনের অর্থ উচ্চশিক্ষার জন্য কী? সহজভাবে বললে, পরিবর্তনের চাপ দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিনের ব্যবধানে এআই আরো বেশি বুদ্ধিমান হচ্ছে, আর বিপুল তথ্য এখন হাতের নাগালে চলে এসেছে। তাই অনেকেই প্রশ্ন করছেন— প্রথাগত শ্রেণীকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কি টিকে থাকবে? এর সঠিক উত্তর এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে এটা স্পষ্ট যে দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সনাতন শিক্ষা মডেল ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
উন্নত অনেক দেশে এরই মধ্যে অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়েছে, যদিও সেগুলো এখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় একই প্রোগ্রাম অনলাইন এবং ইন-পারসন উভয়ভাবে পরিচালনা করছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজের সুবিধা ও পছন্দমতো পদ্ধতি বেছে নিতে পারে। বলা যায়, উচ্চশিক্ষা এখনো এক ধরনের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। হয়তো কয়েক দশক পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন মডেল বেছে নিতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কার্যকর হবে।
তাহলে কি ইন-পারসন উচ্চশিক্ষা হারিয়ে যাবে, নাকি এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে? যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু জ্ঞান তৈরি এবং বিতরণের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তাদের টিকে থাকা অবশ্যই কঠিন হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব হবে শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের এমন দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করা, যা বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়।
আজকের ও ভবিষ্যতের গ্র্যাজুয়েটরা এমন এক বিশ্বে প্রবেশ করছে, যেখানে কেবল পুঁথিগত জ্ঞানের চেয়ে দক্ষতার গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত নিজেদের এমন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা, যেখানে কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং দক্ষতা, সক্ষমতা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যুগে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অভিযোজন ক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হবে। আমাদের জানতে হবে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তিগুলো কীভাবে শিল্পক্ষেত্রকে বদলে দিচ্ছে, কীভাবে গ্র্যাজুয়েটরা চাকরিপ্রার্থী থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত হচ্ছে এবং তাদের কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যত এগোচ্ছে, শ্রমবাজারের চেহারাও বদলে যাচ্ছে। এর ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য নতুন নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। উদীয়মান পেশাগুলো বিস্তৃত ক্ষেত্রজুড়ে ছড়িয়ে আছে, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং, ডাটা সায়েন্স ও অ্যানালিটিকস, রোবোটিকস ও অটোমেশন, সাইবার সিকিউরিটি, ব্লকচেইন ডেভেলপমেন্ট, ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি ডিজাইন এবং উন্নত বায়োটেকনোলজির পাশাপাশি স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, গ্রিন ইকোনমি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই পরিকল্পনা, পরিবেশগত ডাটা বিশ্লেষণ এবং সার্কুলার অর্থনীতিতেও দক্ষ বিশেষজ্ঞের চাহিদা বাড়ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষের কেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে, যেন গ্র্যাজুয়েটরা উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হতে পারেন। যেমন সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ, নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা। পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করার দক্ষতা এখন প্রায় সবার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
এ পরিবর্তনগুলো আমাদের উচ্চশিক্ষার ভূমিকা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা-নেতাদের এমন পাঠ্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা আন্তঃবিভাগীয় শিক্ষা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা, উদ্যোক্তামূলক দক্ষতা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন সাপোর্টিভ ইকোসিস্টেম—যেমন ইনকিউবেটর, অর্থায়নের সুযোগ, শিল্পের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং উপযুক্ত নীতি। এতে গ্র্যাজুয়েটরা শুধু চাকরি খুঁজবে না, বরং নিজেরাও নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারবে এবং উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্রুত পরিবর্তনের যুগে জীবনব্যাপী শিক্ষা ও অভিযোজন ক্ষমতা হয়ে উঠছে অপরিহার্য। শিল্পক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদেরও নতুন নতুন দক্ষতা শিখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে নতুন ভূমিকায় যেতে হবে। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী দক্ষতা, আন্তঃবিভাগীয় বোঝাপড়া এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ অতিক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলা।
বহুমুখী দক্ষতা বিকাশের জন্য শিক্ষার্থীরা শুধু ডিজিটাল প্লাটফর্মের ওপর নির্ভর করতে পারবে না, যদি তারা শ্রেণীকক্ষের পরিবেশে না আসে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশে অংশ না নেয়। কাজেই ইন-পারসন শিক্ষা ব্যবস্থা টিকে থাকবে। তাই ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু অনলাইন নয়, আবার ইন-পারসনও নয়—বরং দুই পদ্ধতির সেরা অংশগুলোর সমন্বয়ই হবে মূল চাবিকাঠি। ব্লেন্ডেড বা হাইব্রিড লার্নিং মডেলই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সেরা উপায় হয়ে উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের দায়িত্ব ডিজিটাল এবং ইন-পারসন শিক্ষা অভিজ্ঞতাকে পরিকল্পিতভাবে একত্র করা, যাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং মানবিক দক্ষতা—দুটোই গড়ে তোলা যায়। লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে এটি প্রাসঙ্গিক, কার্যকর এবং এমন স্নাতক তৈরি করতে পারে, যারা প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং মানবিক গুণাবলিতেও সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশের তরুণ, উদ্যমী জনসংখ্যা দেশের জন্য বিশাল সম্পদ। তবে এ সম্পদ তখনই কাজে লাগবে, যদি তারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যুগের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং মানসিকতা অর্জন করতে পারে। এজন্য নীতিনির্ধারক, শিক্ষক এবং শিল্পনেতাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে উচ্চশিক্ষা এমনভাবে গড়ে ওঠে যেখানে ইন-পারসন ও ডিজিটাল শিক্ষার সেরা দিকগুলোর সমন্বয় থাকবে, উদ্যোক্তামূলক মানসিকতা গড়ে উঠবে এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারবে না, বরং বৈশ্বিক জ্ঞান-অর্থনীতিতেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অধ্যাপক (অব.), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়










