তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, বিশেষত গত বছর ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের একাংশের পক্ষ থেকে এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা ও এর সময়সীমা পেছানোর জোর দাবি ওঠে। তবে সেসময় অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থেকেছে। নির্বাচিত সরকার এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়। এদিকে নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরই এলডিসির তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার জন্য জাতিসংঘে আবেদন করেছে। জাতিসংঘ আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে এ সময়সীমা পিছিয়ে দিলে সেটি দেশের জন্য ইতিবাচক হবে বলেই প্রতীয়মান হয়।
তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এ তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কিনা। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড অবশ্য পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। যদিও করোনার কারণে সেই সময়সীমা দুই বছর পেছানো হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে যোগ্যতা বিচারে বাংলাদেশে এলডিসি উত্তরণে কোনো বাধা নেই। তবে উত্তরণের প্রস্তুতি ও টেকসই উত্তরণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে এলডিসি-উত্তরণ পরবর্তী ঝুঁকিগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষত যখন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) উত্তরণের মাপকাঠিগুলো বিবেচনার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনীতির কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ, উত্তরণ মসৃণ ও টেকসই হবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ও উত্তরণ চূড়ান্ত করার আগে পর্যালোচনা ও বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এদিকে গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সিডিপির বার্ষিক প্লেনারি সভা শুরু হয়েছে, যা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এ সভার এক সেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বলা বাহুল্য, উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর বিষয়টি এ আলোচনার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করবে। এখানে আবেদনের যৌক্তিকতাগুলো দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন আবশ্যক, নয়তো সময়সীমা পেছানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী সংকট দেশের অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ও দামে অস্থিরতা, ডলার ও রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুর দশা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতাও। স্বাভাবিকভাবেই এসব পরিস্থিতি এলডিসি উত্তরণে সে ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে।
অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ঝুঁকির মুখে পড়বে। এটি এখনো দেশের রফতানির অন্যতম প্রধান উৎস। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুল্ক সুবিধা হারালে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা, নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে প্রবেশ এবং রফতানি বৈচিত্র্য তৈরি—এসব প্রস্তুতি পুরোপুরি সম্পন্ন না হলে উত্তরণ অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে সময় বাড়ানোর আবেদনকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ সলোমন দ্বীপপুঞ্জ রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদন করে এবং তা অনুমোদন পায়। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে উত্তরণ করতে পারেনি। একইভাবে সুনামির অভিঘাতে মালদ্বীপের উত্তরণ সময়সীমায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এসব উদাহরণ দেখায়, জাতিসংঘের কাঠামোতে উত্তরণকে যান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল্যায়ন করা হয়।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর আবেদন বর্তমানে সিডিপি-ইকোসকের মূল্যায়ন এবং পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়; কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতিও জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সময়সীমা বৃদ্ধিই কি এলডিসি উত্তরণসংশ্লিষ্ট ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে?
অতীতে দেখা গেছে, সময়সীমা বাড়িয়েও এলডিসি উত্তরণকে বিবেচনায় রেখে তেমন কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। এ ধারা যদি সামনেও অব্যাহত থাকে তাহলে ভবিষ্যতে এ উত্তরণ আরো কঠিন হবে। বিশেষ করে, উত্তরণ মসৃণ ও টেকসই হবে না। এজন্য নবনির্বাচিত সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনয়ন অপরিহার্য। তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, আইসিটি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই এ খাতের ভিতও মজবুত করতে হবে। তৃতীয়ত, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং রাজস্ব প্রশাসন আধুনিকায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানি ও লজিস্টিক অবকাঠামোর সংকট ও অব্যবস্থাপনা দূর না করলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। সর্বোপরি এলডিসি উত্তরণকে মর্যাদা অর্জনের চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের আবশ্যকতা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।









