কয়েক দিন ধরে পুরো দেশেই জেঁকে বসেছে শীত। পৌষের শুরু থেকেই সারা দেশে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। আর শীতের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দেহে বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ সময়ে অনেকেই সহজে নিজেকে ওই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। তাই এ সময়ে বেশকিছু বাড়তি রোগব্যাধি দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এ সময়টা বেশ জটিলতা তৈরি করে। রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়েছে শ্বাসতন্ত্র রোগের প্রাদুর্ভাব। ঠাণ্ডাজনিত রোগে কাবু হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় দেশের সব হাসপাতালের জন্য সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর প্রাদুর্ভাব এড়াতে হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

দেশের বহু জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের ভবন পুরনো, অনেক জায়গায় ভাঙা জানালা-দরজা, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব রয়েছে। শীতকালে এসব ফাঁকফোকর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে রোগীদের অসুস্থতা বাড়িয়ে দেয়। হাসপাতালগুলোয় ওয়ার্ড ও বেডের সংকট প্রকট। রোগীর তুলনায় বেড সংখ্যা কম হওয়ায় অনেক হাসপাতালে মেঝেতে বা বারান্দায় রোগী রাখতে হয়। এতে শীত, সংক্রমণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাসপাতালে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। উন্নত বিশ্বে যেখানে হাসপাতালগুলোয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থাকে, সেখানে আমাদের বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালে শীত নিবারণের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কম্বল বা গরম পানির সরবরাহও নেই বললেই চলে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশনের অভাব রয়েছে। অপর্যাপ্ত ও নোংরা টয়লেট, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক হাসপাতাল ভবন নির্মাণের পর নিয়মিত সংস্কার বা মেরামত করা হয় না। ফলে ছোট সমস্যাগুলো সময়ের সঙ্গে বড় আকার ধারণ করে। সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা শুধু শীতকালীন রোগ নয়, সারা বছরই স্বাস্থ্যসেবার মানকে প্রভাবিত করছে।

রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শীতজনিত কারণে নতুন রোগীর চাপ বেড়েছে। নিয়মিত যেসব রোগী থাকে—শীতের প্রকোপে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণে। আর যেসব রোগী আসছে, তাদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধ এবং বক্ষব্যাধিজনিত রোগীর উপস্থিতি বেশি। চিকিৎসকরা বলছেন, এ সময় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং অ্যালার্জিজনিত জটিলতা এখন শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীতে শিশুদের ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগ দেখা দেয়। চলতি বছরে তীব্র শীতে দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে ঠাণ্ডাজনিত রোগ। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগই শিশু। শিশুরা শ্বাসতন্ত্রের নানা ধরনের সংক্রমণ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার হারও বেড়েছে। শুধু রাজধানীতেই শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়েনি, বরং জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঠাণ্ডাজনিত রোগে গত ২০ দিনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু নয়জন ও বয়স্ক নারী-পুরুষ সাতজন।

দেশের চারটি বিভাগ ও ১২ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এতে জনজীবন অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পৌষের শেষে এসে জেঁকে বসা শীতে গতকাল নওগাঁর বদলগাছিতে মৌসুমের সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া সারা দেশে কুয়াশার দাপট থাকবে বলেও আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সবশেষ বুধবার দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে একঝলক রোদের দেখা মিলছে। তবে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কুয়াশা ছিল। শীত জানুয়ারিজুড়েই থাকবে। এদিকে তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ। যাদের বেশির ভাগকেই খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়।

দেশজুড়ে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতকালীন নানা রোগের প্রকোপও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী এ সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ বাস্তবতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেশের সব হাসপাতালের জন্য সাত দফা নির্দেশনা জারি করা একটি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। নির্দেশনাগুলোয় হাসপাতালের ভাঙা দরজা-জানালা মেরামত, রোগীদের জন্য কম্বল ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, শীতকালীন রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেনের মজুদ নিশ্চিত করার মতো বাস্তবসম্মত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে বাধ্যতামূলক বৈকালিক রাউন্ড এবং রোগীর স্বজনদের স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদানের নির্দেশনা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা

রাখতে পারে।

তবে এ নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই ভালো নির্দেশনা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ ঘটে না। জনবল সংকট, তদারকির অভাব ও প্রশাসনিক শৈথিল্য বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে হাসপাতাল প্রধানদের ওপর বিশেষ নজরদারির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে কেবল নির্দেশনা জারি করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সচেতন হতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাত দফা নির্দেশনা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে শীতকালীন রোগে ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।