বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পাল্টা শুল্ক’ শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর মোট ৩৫ শতাংশ শুল্ক আদায় করা হবে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ হলো পারস্পরিক বা পাল্টা শুল্ক এবং বাকি ১৫ শতাংশ গড় শুল্ক—যা আগে থেকেই কার্যকর ছিল। পাল্টা শুল্ক আরোপের পর কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদসহ সচেতন মহলে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটি কমেছে। বাংলাদেশী পণ্যে নতুন করে যে পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর সমান বা কাছাকাছি। যদিও চীনের পাল্টা শুল্কহার এখনো চূড়ান্ত করেনি ট্রাম্প প্রশাসন। তার পরও বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক কমানোর ঘোষণা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রফতানি পণ্যের প্রতিযোগীসক্ষমতা বজায় রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন, শুল্কহার কমিয়ে আনার ব্যাপারে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাল্টা শুল্কের হ্রাস করা হারে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, প্রতিযোগীদের তুলনায় সহনীয় শুল্কহার আদায়ের বিনিময়ে বেশি দামে হলেও দেশটি থেকে পণ্য আমদানিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের আওতায় থাকা পাল্টা শুল্ক চুক্তিতে অনেক বিধিনিষেধ ও শর্তের বিষয় আছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা সুসংহত বা স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত, সেসব বিষয় বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। একটি বৈচিত্র্যময়, প্রতিযোগিতামূলক ও সহনশীল বাণিজ্য কৌশল প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রে পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এ হিসাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার। এ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেই বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। যদিও পাল্টা শুল্কহারের সংশোধন স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবু একটি প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কি দিয়েছে। কিছু প্রতিশ্রুতি যেমন গম, তুলা ও উড়োজাহাজ আমদানির বিষয়টি এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তবে আরো কিছু প্রতিশ্রুতি গোপনীয়তা চুক্তির আওতায় দেয়া হয়েছে, যা সহসাই জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণে বাংলাদেশের গম, তুলা ও উড়োজাহাজ আমদানি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের একটি সম্ভাব্য উপায়। তবে এত উচ্চমূল্য ক্রয়ের ওপর নির্ভর করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের জন্য টেকসই বা কৌশলগতভাবে সর্বোত্তম নাও হতে পারে। পরিবর্তে প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতার মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলা এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা যেতে পারে।

তবে পাল্টা শুল্ক কমানোয় বাংলাদেশ উপকৃত হয়েছে। কিন্তু এ উপকার বাংলাদেশ কতটুকু কাজে লাগাতে পারবে কিংবা অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনতে পারবে সেটি নির্ভর করছে দেশের ব্যবসায়ী ও সরকারের ওপর। আমাদের শিল্প-কারখানায় কতটুকু দক্ষতা বাড়ছে সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গুটিকয়েক ছাড়া অধিকাংশ শিল্পই উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তাছাড়া শিল্পগুলোয় ঘণ্টাপ্রতি উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ায় আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেশি। তবে আমরা একটি সুবিধা ভোগ করি সেটি হলো আমরা কম দামে শ্রম পাই। তবে শিল্প-কারখানায় যদি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ে তাহলে শুল্কের বাড়তি চাপ কমানো সম্ভব। অর্থনীতিবিদররা বলেছেন, এরই মধ্যে কিছু কারখানা উৎপাদনশীল ও উৎপাদন সক্ষম আধুনিক মেশিন এনে তিন-চার গুণ উৎপাদন বাড়িয়েছে। তাইওয়ানিজ ও ইতালির নতুন মেশিন আনার ফলে তাদের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি সেসব পণ্যের জন্য বা ভিন্ন এইচএস কোডের পণ্যের জন্য তারা একটু বেশি দামও পাচ্ছে। এটা যদি আরো বাড়ানো যায়, পোশাক শিল্প খাতকে যদি আরো সক্রিয় করা যায় তাহলে আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে। সেই সঙ্গে ভ্যালু চেইনের বড় বাজারে পণ্য প্রবেশ করতে পারলে আমাদের আয় বাড়বে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একের পর এক চাপ আসছে। এসব চাপ মোকাবেলায় আমরা এখনো সক্ষমতা অর্জন করতে পারছি না। আমাদের শিল্প-কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার সুযোগ খুবই কম। তাই দক্ষভাবে ইউটিলিটি ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও লজিস্টিক ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি—এ তিনটি কাজই আমাদের অব্যাহতভাবে করে যেতে হবে। তাছাড়া আমাদের স্থানীয় কোনো কাঁচামাল নেই। আমরা সবচেয়ে সুলভ উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানি করি। এগুলোর সমন্বয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয়ে থাকে। উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে আমাদের জোর দিতে হবে।

আমরা এখনো কম মূল্যের পণ্য উৎপাদন করি। অথচ প্রতিযোগী অনেক দেশই বেশি মূল্যের পণ্য উৎপাদন করছে। ফলে তারা আমাদের চেয়ে কম পরিমাণ পণ্য রফতানি করেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। তাই বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বেশি মূল্যের পণ্য উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে আমাদের। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো—এদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বড় অংশীদার হতে আগ্রহী। তারা এরই মধ্যে উৎপাদন দক্ষতা, দ্রুত ডেলিভারি ও বৈচিত্র্যময় পণ্য সরবরাহে অগ্রসর। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে। বাংলাদেশকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। বাণিজ্য নীতিমালা ঢেলে সাজানো, উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া বাংলাদেশের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক। এছাড়া অন্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হেডগিয়ার, জুতা, অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, পালক ও পালক দ্বারা তৈরি সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, মাছ, শস্যদানা, আসবাব প্রভৃতি। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশী রফতানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। পোশাক শিল্প খাতের সিংহভাগ পণ্য আবার রফতানি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। অর্থমূল্য বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের রফতানি বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। রফতানি বাজারেও বৈচিত্র্যতা আনতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে এখনকার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য রফতানি পণ্য ও রফতানি গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনার দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হবে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য খাতেও সংস্কার জরুরি। এর মধ্যে আছে শুল্ক কমানো, অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা হ্রাস ও আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ। এসব সংস্কার কেবল বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে না; বরং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও খাতভিত্তিক বৈচিত্র্যকরণেও সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আমাদের শিল্প ও রফতানিমুখী খাতকে কীভাবে টেকসই করা যায় তার পথ অনুসন্ধান করতে হবে।