আবার অনেক দেশে সুপেয় পানির তেমন কোনো উৎস নেই বললেই চলে। এর উদাহরণ হলো কম বৃষ্টিপাত হওয়া এবং মরুভূমি ও সমুদ্রসংবলিত দেশগুলো। তাদের ভূগর্ভস্থ ও সুপেয় পানির উৎস তুলনামূলক কম থাকায় সমুদ্রের পানির ওপর নির্ভর করে। এজন্য এসব দেশে নানা সময়ে পানি শোধানাগারের মতো বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে ও বাস্তবায়ন করেছে। এমন দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, স্পেন, কুয়েত, কাতারসহ নানা দেশ। গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্সের তথ্যে দেখা গেছে গত বছর সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণে এসব দেশ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল। বিশেষত সৌদি আরব, কুয়েত, ওমানে বর্তমানে সরবরাহকৃত মোট পানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সমুদ্রের পানি অথবা আধা-লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি লবণমুক্ত করে পান উপযোগী করা হয়।
এর বিপরীতে রয়েছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ। স্বাদু ও মিঠা পানির উৎস পুরো দেশব্যাপী ছড়িয়ে আছে; রয়েছে সমুদ্রও। বছরজুড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও অধিক। এর পরও পান থেকে শুরু করে গৃহস্থালি, কৃষিতে সেচ, কলকারখানার উৎপাদনসহ নানা কাজের জন্য ভূগর্ভের পানিই ব্যবহার করা হয়। এতে সময়ের পরিক্রমায় জনসংখ্যা ও চাহিদা বাড়ার কারণে ভূগর্ভের পানির ওপর চাপও বেড়েছে। আবার অবকাঠামোগত পরিসর বাড়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগর্ভে পানি পুনর্ভরনের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এরই মধ্যে পানি সংকট তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এমন পরিস্থিতির বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে ঢাকা এবং ঢাকা ওয়াসা।
জানা যায়, বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ৬৫ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। এ কারণে ঢাকার পানির স্তর প্রায় সাত ফুট নিচে নেমে গেছে বলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এর কারণ হিসেবে সংস্থটাটি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পাশাপাশি ঢাকার অকাঠামোগত সম্প্রসারণকে চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘমেয়াদি রাজধানীবাসী পানির সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মূলত বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন এ বিষয়ে। অনেকটা এ প্রেক্ষাপটেই ঢাকা ওয়াসা রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে প্রায় এক দশক আগে দুটি বড় প্রকল্প হাতে নেয়। যদিও বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলো এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এমন এক প্রেক্ষাপটে ঢাকা ওয়াসা নতুন করে ভূগর্ভ থেকে দৈনিক আরো ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলনের পরিকল্পনা নিয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯২০ কোটি টাকা। এ নতুন পরিকল্পনা ঢাকার পানি সংকট ভবিষ্যতে আরো বাড়িয়ে তুলবে বৈ কমাবে না। ওয়াসার উচিত টেকসই সমাধানের পথে এগোনো। সেক্ষেত্রে সংস্থাটি পুরনো ও বাস্তবসম্মত প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে এমন দিকে এগোচ্ছে যা পানি নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, নতুন প্রকল্প প্রসঙ্গে ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এটা হবে ঢাকার জন্য জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পেলে বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে কম-বেশি চার বছর। অথচ বর্তমানে মেঘনা নদী থেকে ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহে যে প্রকল্পগুলো চলমান রয়েছে, সেগুলোর বর্ধিত মেয়াদও ২০৩০ সালের আগে শেষ হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, এসব প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে এবং ব্যয়ও বেড়েছে, যার কারণ ঢাকা ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি। এটাকে এক ধরনের অদক্ষতা ও সদিচ্ছার অভাব বললেও অত্যুক্তি হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা ওয়াসা যে নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে তা একেবারেই অযৌক্তিক এবং আশঙ্কা রয়েছে এ প্রকল্পের কাজও যথাসময়ে শেষ হবে না। কিংবা যদি হয়ও তাতে ঢাকায় পানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিই বাড়বে। সুতরাং একনেকের উচিত হবে ওয়াসার নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে গভীর পর্যালোচনা করা।
বাস্তবতা হলো ঢাকায় ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণ না হওয়ার সমস্যার মূলে রয়েছে ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্বলতা। যেসব প্রকল্প চালু হওয়ার কথা, সেগুলো এখনো নির্মাণাধীন। এর ফলে একটি কৌশলগত রূপান্তর থেমে গিয়ে আবার পুরনো নির্ভরতার দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রিতা, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণনির্ভরতা এবং বিদেশী অর্থছাড়ের অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলোও প্রাসঙ্গিক। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত টেকসই সমাধানের উপায় নিশ্চিত করা।
ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, চলমান ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও ব্যবহারের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়োজন, বিশেষত কলকারখানার পানি ব্যবহারের ওপর। তৃতীয়ত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলাধার পুনরুদ্ধারে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ঢাকার পানি সংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা থেকে উৎসারিত। স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পথে হাঁটলে এ সংকট তীব্রতর হবে; কখনই হ্রাস পাবে না।










