রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলাধার। রাজধানীর অন্যতম জলাধার হাতিরঝিল ও পার্ক পান্থকুঞ্জের ওপর দিয়ে নির্মাণ হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি সংযোগ সড়ক (র্যাম্প)। চলমান সংযোগ সড়ক নির্মাণ উদ্যোগের শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন করছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য পলাশী পর্যন্ত চলমান সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ হাতিরঝিল প্রকল্পের সার্বিক লক্ষ্য ও উপযোগিতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এ প্রক্রিয়া এখনই থামানো উচিত। তা না হলে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্ক নষ্ট করার পাশাপাশি পলাশী পর্যন্ত বিদ্যমান রাস্তার উপযোগিতাও নষ্ট হবে। এ এলাকার মানুষজনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সামগ্রিক পরিবেশ বিনষ্ট করার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় যানজট বাড়াবে। মেগা প্রকল্পের বিনিয়োগ ফেরত আনা ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দেয়ার এ আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকার পরিবেশকে আরো ঝুঁকিতে ফেলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন নগর সংস্থাসহ নাগরিকরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবেশ ধ্বংস করে বিগত সরকারের নেয়া জনবিরোধী ও পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে বলে মনে করছেন নগরবিদরা।
এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত সড়কপথের মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এছাড়া ৩১টি র্যাম্পসহ ২৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ওভারপাসসহ মোট ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটারজুড়ে এ পথ নির্মাণ হচ্ছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্প পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। বণিক বার্তার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন ৩২ দিন ধরেই এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের র্যাম্পটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছে।
শুধু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জ পার্ক নয়, উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি লাইন-৬) মাধ্যমে ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যান দখলে নিয়েছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে দুটি পাতাল মেট্রোরেলের কাজ চলমান। এর মধ্যে হেমায়েতপুর-ভাটারার মধ্যে নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-৫, নর্দান রুটের গতিপথে রয়েছে দুটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এ মেট্রোরেলের গতিপথ পড়েছে গুলশান-বারিধারা লেক ও তুরাগ নদে। গুলশান-বারিধারা লেক ২০০১ সালে এবং তুরাগ নদকে ২০০৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরিবেশবিদরা বলছেন, গুলশান-বারিধারা লেক ও তুরাগ নদের নিচ দিয়ে যখন পাতাল রেল চলবে, তখন যে কম্পন হবে এবং শব্দ উৎপন্ন হবে তা এই লেকের জীববৈচিত্র্য ও জলজ বাস্তুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কিছু ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্পগুলো থেকে সরে এলেও এখনো অনেকগুলো প্রকল্প চলমান রয়েছে। এগুলোর বিষয়ে সরকারের পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
গত কয়েক দশকে এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ঢাকার পরিবেশগত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছুটির দিনগুলোয়েও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোয় অন্যতম অবস্থানে থাকে ঢাকা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের বায়ুমান সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর মধ্যে ঢাকার নাম সবসময় ওপরের দিকেই থাকছে। বায়ুর এ মানকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঢাকার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ২ দশমিক ৫-এর উপস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত বেশি। তথ্যমতে, ঢাকার বাতাসে পিএম ২ দশমিক ৫-এর গড় উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহনীয় মানমাত্রার চেয়ে ২৮ গুণ। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় নেই পর্যাপ্ত জলাধার ও সবুজের উপস্থিতি। নদী ও খাল দখল করে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে অবকাঠামো। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে যেটুকু জলাধার বা নদী রয়েছে সেগুলোও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
কারওয়ান বাজার থেকে পলাশী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে, তা হাতিরঝিল প্রকল্পকে নষ্ট করছে। হাতিরঝিলে এক্সপ্রেসওয়ের একের পর এক পিলার প্রকল্প এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলাধারের পানিপ্রবাহ ও সার্বিক উপযোগিতা ধ্বংস করছে। পৃথিবীর উন্নত ও আধুনিক শহরগুলো নগর এলাকায় ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক পরিবহন সমস্যা সমাধানের কৌশল থেকে সরে এসেছে। অথচ বাংলাদেশ এখন পরিবহন সমস্যার সমাধান কৌশল হিসেবে নগর এলাকায় ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক পরিকল্পনা করে যাচ্ছে, যা ব্যক্তিগত গাড়িকে উৎসাহিত করে। পরিবহন-ভূমি ব্যবহারের পারস্পরিক সম্পর্কজনিত প্রভাব বিশ্লেষণ না করেই অধিকাংশ পরিবহন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, যা প্রায়ই সামষ্টিক জনকল্যাণের অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে। এছাড়া গণপরিসরে ব্যবহার্য অবকাঠামোসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে জনগণের মতামত গ্রহণ, গণশুনানির আয়োজন করার প্রয়াস একেবারেই অনুপস্থিত। ট্রাফিক সমস্যার সমাধানে অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনাগত প্রভাব যথাযথ বিবেচনায় না নিয়েই মেগা প্রকল্পে সব সংস্থার অতি আগ্রহ।
বিগত সরকারের শাসনামলে দেশীয় স্বার্থান্বেষী মহলের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র ও বিদেশী ঠিকাদারদের প্রভাবে অতি ব্যয়বহুল এবং কম উপযোগী পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা শ্বেতহস্তী প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া এ ধরনের পরিকল্পনা জনগণের প্রকৃত চাহিদাভিত্তিক সমাধানের সঙ্গে অনেক সময়ই সম্পৃক্ততাবিহীন। সাধারণ মানুষের অধিকাংশই এ ধরনের অন্যায্য বিষয় সমর্থন করছেন না। তার পরও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশের বিপর্যয় ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঢাকা মহানগরীর জন্য অশনিসংকেত। হাতিরঝিলের জলাধার ভরাট ও পান্থকুঞ্জ পার্কের মধ্য দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে সম্প্রসারণ এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার ফুসফুস হাতিরঝিলকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকার অন্যতম কম তাপীয় এলাকা হাতিরঝিলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত আগে নেয়া হয়, তারপর সেটাকে বৈধ করার জন্য সমীক্ষা বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। রাজধানী ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ৫ শতাংশ মানুষ চলাচল করে, তাদের জন্যই বড় বড় মেগা প্রকল্প নেয়া হয়। অথচ তার কুফল ভোগ করে বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষ। এ প্রবণতা থেকে বের হয়ে কম ব্যয়ে ও সহজে বাস্তবায়নযোগ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য পরিবহন ও নগর পরিকল্পনার কর্মকৌশল তৈরি করা প্রয়োজন।
এক্সপ্রেসওয়ের অপরিণামদর্শী সম্প্রসারণ থেকে হাতিরঝিল, পান্থকুঞ্জ পার্কসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাকে সুরক্ষা দিতে এখনই এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। হাতিরঝিল জলাধারকে রক্ষা করা দরকার এবং পান্থকুঞ্জ পার্ককে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা ও দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পাশাপাশি হাতিরঝিল থেকে পলাশী পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ বন্ধ করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পান্থকুঞ্জ পার্কসংলগ্ন এলাকা ঘনবসতি ও জনঘনত্বপূর্ণ। আশপাশে কোনো খোলা বা উন্মুক্ত জায়গা নেই। আর হাতিরঝিল এ অঞ্চলের সর্বশেষ বড় জলাধার। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এ জলাধার খুব দরকারি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক বানিয়ে পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল প্রকল্প ধ্বংস করা মোটেই ঠিক হবে না। পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস করে অবকাঠামো উন্নয়নের আত্মঘাতী দর্শন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।










