সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্ঞানসৃষ্টি ও উদ্ভাবন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উন্নত হওয়ার পেছনে সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় ভূমিকা রেখেছে নতুন নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে। বিপরীতে অন্যান্য দেশের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার পেছনে বড় দায় রয়েছে মানহীন উচ্চশিক্ষা বা প্রতিষ্ঠানের। এ মানহীনতার অনেক নির্দেশক রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দ। যে কারণে নীতি আলোচনায়ও বরাদ্দ বৃদ্ধিতে বেশি জোর দেয়া হয়। তবে গবেষণা পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেও একমাত্র নয়। বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করা যায় যখন প্রতি অর্থবছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অপ্রতুল অর্থ ফেরত যায়। এছাড়া বরাদ্দ বৃদ্ধির পরও গবেষণার গুণগত মানে পরিবর্তন না আসার বহু নজির রয়েছে। এর মানে হলো, গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং একই সঙ্গে আগ্রহেরও ঘাটতি রয়ে গেছে। কিংবা উল্টোভাবে বলা যায়, পরিমিত আগ্রহ না থাকায় দক্ষ গবেষক তৈরি হচ্ছে না। অবশ্য আগ্রহ তৈরি না হওয়ার পেছনে আবার গবেষণায় বরাদ্দ একটি বড় কারণ হতে পারে। সুতরাং গবেষণা কার্যক্রমের পরিসর বাড়াতে হলে বরাদ্দের পাশাপাশি গবেষণা পরিচালনার দক্ষতা বাড়ানোয় নজর দিতে হবে।
গবেষণা অবকাঠামো থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অংকের অর্থ প্রয়োজন হয়। বিশ্বের উন্নত দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো একক নির্দিষ্ট গবেষণা বাজেট পায় না। বরং এটি সরকারি-বেসরকারি, বিশেষত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুদান দ্বারা পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং গবেষণায় বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের না হওয়ায় ও শিল্পের সঙ্গে একাডেমিয়ার স্বল্প সংযোগের কারণে সেভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে না। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে গড়ে মোট বাজেটের দেড় শতাংশ। এ অপ্রতুল বরাদ্দ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা বা নতুন জ্ঞান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন। গবেষণার জন্য প্রয়োজন আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি, তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। এজন্য বর্তমানে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।
এর বাইরে রয়েছে শিক্ষকদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষতার অভাব। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের সময় পিএইচডি ডিগ্রি বা অভিসন্দর্ভে গুরুত্ব না দেয়াকে প্রায় দায়ী করা হয়। এটা সত্য। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি বড় সত্য হলো এমফিল, পিএইচডি বা সমমানের ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষকদের মধ্যেও গবেষণা করার আগ্রহ কম। অনাগ্রহের পেছনে কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বাজেট স্বল্পতার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। তবে সময় স্বল্পতার বিষয়টিকে খুব কম আলোচনায় রাখা হয়। যেমন বিশ্বের বিভিন্ন মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বছরের একটি সময়ে ‘ছুটি’ দেয়া হয়, যেটাকে সামার বা ফল ভ্যাকেশন বলা হয়। তাদের ওপর নিয়মিত পাঠদানের চাপ কমাতে এ সময়টি দেয়া হয়, যেন তারা জ্ঞান অর্জন ও সৃষ্টিতে সময় ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু এর ঠিক বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। আবার এখানে একজন শিক্ষক কেবল এক/দুইটি কোর্সের ওপর নিয়মিত পাঠদান করছেন এমন নয়। শিক্ষক সংকটের কারণে একেকজন শিক্ষক অনেক সময় চার/পাঁচটা কোর্সও পড়াচ্ছেন। এর বাইরে থাকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অ্যাসাইনমেন্ট নেয়া থেকে বিভিন্ন কার্যকলাপ। ফলে বছরের পুরো সময়ে অবসর খুব একটা থাকে না। এর বাইরে শিক্ষকদের সম্মানীও তুলনামূলক কম। ফলে অনেকেই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন বা করতে বাধ্য হন। স্বাভাবিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে গবেষণার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। কিংবা গবেষণা পরিচালনার জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন তা অর্জনের দিকেও এগোন না অধিকাংশ শিক্ষক।
এছাড়া গবেষণা প্রকল্প নির্বাচন, গবেষণাবান্ধব নীতির অভাব, প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব এবং গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা কাঠামোর অনুপস্থিতির কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় হয় না। অনেক গবেষক প্রয়োজনীয় অর্থ দেরিতে পান, আবার অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার বাস্তব চাহিদা ও অর্থছাড়ের বিধিবিধানের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা যায়। ফলে গবেষণা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং বরাদ্দকৃত অর্থও যথাসময়ে ব্যবহার করা যায় না। এ বাস্তবতা দেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক অবস্থানেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের অন্যতম প্রধান সূচক গবেষণা। অথচ বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেশির ভাগই এখনো এ সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান করে নিতে পারেনি। গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, উদ্ভাবন ও গবেষণার প্রভাব—সব ক্ষেত্রেই দেশ পিছিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি গঠনের কথা বলছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা খাদ্যনিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শক্তিশালী গবেষণা পরিচালনা অপরিহার্য। এজন্য গবেষণাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। গবেষণা খাতে বরাদ্দ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে অন্তত আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা, আর্থিক শাসন ও জবাবদিহি ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আগ্রহ কীভাবে বাড়ানো ও বজায় রাখা যায় সেটি টেকসই পদ্ধতিতে নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি গবেষণায় অগ্রগতির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সেই অর্থের দক্ষ ও ফলপ্রসূ ব্যবহার। এ দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত অর্থে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব হবে না। দেশের উচ্চশিক্ষা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে তাই গবেষণায় অধিক বিনিয়োগের পাশাপাশি কার্যকর দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।










