সড়কে নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সড়ক দুর্ঘটনা দেশে এক গুরুতর জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল ও বাড়ছে পঙ্গুত্ববরণ করা মানুষের সংখ্যা। ঘর থেকে বের হলেই সড়কে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মে সীমাহীন দুর্ভোগ-ভোগান্তি মানুষের নিত্যসঙ্গী। ফুটপাত দখল, সড়ক-মহাসড়কে বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের মাধ্যমে রাস্তাকে সংকুচিত করা, অদক্ষ চালক ও সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া মহাসড়কে থ্রি-হুইলার জাতীয় যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত গতি, ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ যান চলাচল বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন না মানা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার এবং সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতায় সড়কে প্রাণহানি বাড়াচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকার। তখন জনমানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সড়ক নিরপত্তা ও শৃঙ্খলায় উন্নতি হবে। কমে আসবে প্রাণহানি। বাস্তবতা হলো, এ সরকার এক বছরে দেশের সড়ক পরিবহন খাতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফেরেনি ট্রাফিক শৃঙ্খলা। কমেনি যানজট ও দুর্ঘটনাও। প্রাণহানিও কমেনি।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে আন্দোলন হয়েছিল। ফুটপাতে বাসচাপায় সহপাঠীর মৃত্যুর পর কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমেছিল। ধীরে ধীরে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত হয় সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮। এ আইনে দুর্ঘটনার জন্য চালকের শাস্তি, ফিটনেসবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন যান চলাচল রোধ, নির্ধারিত গতিসীমা, ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য জরিমানা ও জেলসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান থাকলেও বাস্তবে আইনটির প্রয়োগ সীমিত। প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রতিরোধের কারণে এ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন খাতটি যেভাবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে, তাতে এ আইনের প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নিলেই আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়। সরকার আইন প্রয়োগে বারবার পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা যেমন কমছে, তেমনি সড়কে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা আরো বেড়েছে।

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাত মালিক-শ্রমিকের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে আছে, তা আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার বক্তব্যে। তিনি বণিক বার্তার কাছে স্বীকার করেছেন, সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাইলেও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সহযোগিতা না পাওয়ায় তেমন কিছুই করতে পারেনি। এ অকপট স্বীকারোক্তি কেবল সরকারের সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে না, বরং সড়ক খাতে বিদ্যমান দুর্বৃত্তায়নের একটি নির্মম চিত্রও তুলে ধরছে।

উপদেষ্টার বক্তব্য অনুসারে, বাংলাদেশের পরিবহন মালিকদের বড় অংশই রাজনীতিবিদ, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা উচ্চপদস্থ আমলা। তারা আইন প্রয়োগের পথে প্রধান অন্তরায়। ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন তুলে দেয়ার মতো স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও এখানে বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক সভায় ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন তুলে নিতে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত পরিবহন মালিকদের সময় দিয়েছিল সরকার। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। সরকার যখন অভিযান শুরু করতে চায়, তখন একের পর এক অজুহাত—রোজার মাস, ঈদ, জনদুর্ভোগ ইত্যাদির দোহাই তুলে তা ঠেকিয়ে দেয়া হয়। এরপর যখন কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন আসে হরতালের হুমকি। এ পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রের নীতিগত দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ। যেখানে আইন প্রয়োগের চেয়ে মালিকদের সুবিধা ও রাজনৈতিক স্থিতির চিন্তা বেশি প্রাধান্য পায়, সেখানে সড়কনিরাপত্তার প্রশ্ন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপত্তাহীনতার চক্রে আটকে পড়ে। রাষ্ট্র যখন নিজেই জনগণের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন জনগণের আস্থা রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর থেকে সরে যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত কর্মসূচিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়কনিরাপত্তা জোরদারে ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে আসছে। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো তিন বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা করে সরকার। এখন পর্যন্ত পাঁচটি কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হলেও সেগুলো দুর্ঘটনা কমাতে পারেনি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, ২০১২ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছিল ২ হাজার ৫৩৮ জনের। ২০২৪ সালে দেশে প্রাণহানি হয়েছে ৫ হাজার ৩৮০ জনের। বিআরটিএর হিসাবে, গত এক যুগে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে জাতিসংঘ ঘোষিত কর্মসূচিতে সড়কনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা, নিরাপদ যানবাহন প্রবর্তন, চালক ও যাত্রীদের সিট বেল্ট ব্যবহার, মাদকাসক্ত অবস্থায় ড্রাইভিং প্রতিরোধ, দুর্ঘটনা-পরবর্তী পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এসব পদক্ষেপের কোনোটাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি, ফলে দেশে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও হতাহত বাড়ছে।

বর্তমানে নিরাপদ সড়ক বিশ্বব্যাপী একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর পরিণতি ও বিপুল ব্যয়ের বিষয়ে সমাজে জনসচেতনতা বাড়ছে। সড়কনিরাপত্তার উন্নয়ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মোটরযানের ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে ভিন্ন। এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জনসংখ্যাপ্রতি মৃত্যুহার অনেক বেশি। ইইউভুক্ত দেশগুলো সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে সড়কে শূন্য মৃত্যুহারের লক্ষ্য অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় মৃত্যুহার বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোয় সড়কনিরাপত্তায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে উন্নত দেশগুলো সড়কনিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও একই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন সরকারের বাস্তবসম্মত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আসে। পরিবহন মালিক পক্ষের হুমকির মুখে সরকারের পিছু হটা যাবে না। অনিয়মকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ম রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনের বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে পরিবহন খাতকে চিরাচরিত নৈরাজ্য থেকে মুক্ত করতেই হবে। জাতিগত শক্তির নিদারুণ অপচয় রোধে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে—এটিই কামনা করছি।