ডেল এইচ খান, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, লেখক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। বর্তমানে জনতার দলের মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন। সমরবিদ্যা, শান্তি ও সংঘাত নিয়ে তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বেশকিছু মৌলিক বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন এবং বিদেশী ভাষার কিছু বই বাংলায় অনুবাদ করেছেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার পূর্বাপর নানা ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
বারবার কেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা ঘটছে? বেশির ভাগ দুর্ঘটনার পেছনে কারিগরি ত্রুটি ও পুরনো প্রযুক্তির কথা বলা হচ্ছে। আমরা কেন এখনো যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারিনি?
গত ২১ জুলাই ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩১ জনের মৃত্যু এবং ১৭০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পুরনো বিমানভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারো সামনে এসেছে। এই এফ-৭ বিজিআই আদতে ১৯৫০-এর দশকের সোভিয়েত মিগ-২১-এর চীনা সংস্করণ, যার উৎপাদন চীন ২০১৩ সালেই বন্ধ করে দিয়েছে বলে আমরা জানি। যদিও এ বিমানে কিছু আধুনিক আপডেট, যেমন গ্লাস ককপিট, মাল্টিফাংশন ডিসপ্লে, রাডার ইত্যাদি আছে, তবে এটি ইয়াক-১৩০ (Yak-130) বা কাই টি-৫০-এর (KAI T-50) মতো নতুন প্রজন্মের প্রশিক্ষণ বিমানের সেফটি ফিচার বা অ্যাভিওনিক্সের ধারেকাছেও নয়। দুই দশকে বাংলাদেশে অন্তত ১১টি বিমান দুর্ঘটনার মধ্যে সাতটিই হয়েছে এ ধরনের চীনা প্লাটফর্মে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের ঘটনাটি সবচেয়ে মর্মান্তিক।
বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে বেশকিছু বাধা আছে বলে মনে করা হয়। প্রথমত, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। যদিও ২০০৯ সালে করা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ অনুযায়ী একটি ত্রিমাত্রিক আধুনিক বিমান বাহিনী গড়ে তোলার কথা ছিল এবং ২০১৮ নাগাদ ১৬টি এফ-৭বিজিআই এবং ১৬টি ইয়াক-১৩০ কেনাও হয়। কিন্তু মোট বাজেটের মাত্র ৪-৬ শতাংশ আধুনিকায়নমূলক প্রকিউরমেন্টে ব্যয় হয়েছে, বাকিটা রক্ষণাবেক্ষণ ও বেতন-ভাতার পেছনে।
দ্বিতীয়ত, চীনের সাশ্রয়ী ঋণ এবং সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা বিমান বাহিনীকে চীনা বিমানের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল করে ফেলেছে। ২০১১ সালের একটি চুক্তির আওতায় চীন ২০১৩ সালে বাংলাদেশকে ১৬টি এফটি-৭বিজিআই যুদ্ধবিমান সরবরাহ করলেও ওই বছরই মডেলটির বিমান উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ এখন কার্যত একটি অপ্রচলিত বহরের ওপর নির্ভর করছে, যার রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকীকরণ ব্যয়বহুল ও জটিল।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তহীনতা এ সমস্যাকে আরো জটিল করেছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্রয়ে বিলম্ব ও আঞ্চলিক সেরা চর্চার (Refional Best Practices) সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব এখানে স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ ঢাকার কুর্মিটোলা এয়ার ফোর্স বেজে বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমান একই রানওয়ে ব্যবহার করে, যা ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইসিএও) নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঝুঁকি বাড়ায়। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো কঠোর পৃথক্করণ নীতি এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ বিমানে বিনিয়োগ করেছে, যা বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। এফ-৭ সিরিজ পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে আধুনিক প্রশিক্ষণ বিমানে বিনিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ জোরদার এবং ডেডিকেটেড ওভারহলিং সুবিধা স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। তবে এমন সংস্কারের জন্য বাজেট পুনর্বিন্যাস এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যা ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েই যাবে।
বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার তিনটিই চীনা নির্মিত এফ-৭। ১৯৬০-৯০-এর দশকে প্রচলিত এ যুদ্ধবিমানগুলো বাংলাদেশে এখনো কেন ব্যবহার হচ্ছে?
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে চীনা নির্মিত এফটি-৭বিজিআই সিরিজের যুদ্ধবিমান ব্যবহারের মূলত তিনটি কারণ রয়েছে: অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, অপারেশনাল বাস্তবতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগত জটিলতা। ২০১১-১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ১৬টি এফ-৭বিজিআই বিমান চীন থেকে ক্রয় করে, যার প্রত্যেকটির দাম ছিল আনুমানিক ৮-১০ মিলিয়ন ডলার। এ বিনিয়োগ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য এবং যুদ্ধবিমানের মতো সম্পদ সরাসরি বাতিল করা বাস্তবসম্মত নয়, যতক্ষণ না সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী প্রমাণ হয়। যেহেতু বিমান বাহিনীসহ সামরিক বাহিনীতে একটি প্রচলিত নীতি হলো ‘usable until unserviceable’, তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এ বিমানগুলো প্রশিক্ষণে ব্যবহার হচ্ছে। বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিরাপত্তার দিক থেকেও এখন নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
এক দশকে অন্তত তিনটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে এফটি-৭বিজিআই বিমানে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে। এফটি-৭বিজিআই প্লাটফর্মটি ১৯৬০-এর দশকের মিগ-২১-ভিত্তিক ডিজাইন, যা বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিকভাবে এ সিরিজের বিমানকে আজকাল ‘Flying Coffin’ বলেও অভিহিত করা হয়। তবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে একটি বিমানকে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করার আগে একটি বোর্ড অব অফিসার্স গঠন করে এর কারিগরি, কৌশলগত ও নিরাপত্তার দিকগুলো খতিয়ে দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আমার পরামর্শ, অবশিষ্ট এফটি-৭বিজিআই বিমানগুলোর একটি সমন্বিত কারিগরি নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। যেসব বিমান নিরাপত্তার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হবে, সেগুলো দ্রুত অপারেশনাল প্লাটফর্ম থেকে প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে ইয়াক-১৩০ বা কাই টি-৫০-এর মতো আধুনিক প্রশিক্ষণ বিমানের দিকে ধাপে ধাপে রূপান্তর করাই হবে একটি নিরাপদ ও কৌশলগতভাবে টেকসই পদক্ষেপ।
যুদ্ধবিমান ক্রয়ে আমাদের টেকসই প্রকিউরমেন্ট ও মেইনটেন্যান্স পলিসি আছে কিনা?
বাংলাদেশে যুদ্ধবিমান ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ, টেকসই নীতিমালার অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত। প্রতিরক্ষা ক্রয় ব্যবস্থাটি মূলত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিজিডিপির মাধ্যমে পরিচালিত হলেও একটি সুস্পষ্ট জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির অভাবে কোন ধরনের যুদ্ধবিমান আমাদের কৌশলগত প্রয়োজন মেটাবে, তা নির্ধারণে ঘাটতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যখন আধুনিক জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব করা হয়েছিল, তখন সম্ভবত প্রতিবেশী দেশের ভূরাজনৈতিক চাপ ও সাশ্রয়ী দামের বিবেচনায় আমরা ১৯৬০-৯০ দশকের পুরনো এফটি-৭বিজিআই সিরিজ কিনেছি।
প্রকিউরমেন্টে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। যদিও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কিন্তু নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তার কারণে অধিকাংশ পণ্যের দাম এবং চুক্তি জনসাধারণের অজানাই থাকে। এফলে দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়—বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সাবেক সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া দুর্নীতির ব্যাপারটি বেশ আলোচিত। এসব দুর্বলতা টেকসই ক্রয় নীতির প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণেও বাধা সৃষ্টি করে।
আমাদের যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায়ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে অনুমেয়। এফটি-৭বিজিআই বিমানগুলোর মতো পুরনো প্রযুক্তির প্লাটফর্মে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যেমন বেশি, তেমনি দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, যা সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোয়ও প্রমাণিত। রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেশনাল দক্ষতা যাচাইয়ে কোনো সর্বজনীন পারফরম্যান্স ডেটা প্রকাশিত হয় না, যা স্বচ্ছতা এবং মূল্যায়নকে ব্যাহত করে। সুতরাং বাংলাদেশে এখনো একটি সমন্বিত ও কৌশলভিত্তিক টেকসই প্রকিউরমেন্ট ও রক্ষণাবেক্ষণ নীতি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যা আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণত প্রশিক্ষণ বিমান ঘাঁটি জনবসতি থেকে দূরে হয়। আমাদের বিমান ঘাঁটি জনবসতির কাছাকাছি নাকি জনবসতি ধীরে ধীরে বিমান ঘাঁটির কাছাকাছি চলে এসেছে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিমান ঘাঁটি এবং জনবসতির নৈকট্যের বিষয়টি মূলত নগরায়ণের দ্রুত বিস্তারের ফলাফল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এর পাশাপাশি কুর্মিটোলা এয়ারবেস, যেখানে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালিত হয়, এই রানওয়ে ১৯৪০-এর দশকে ব্রিটিশ আমলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশলগত প্রয়োজনে নির্মিত হয়েছিল। তখন এ এলাকা ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশ থেকে অনেক দূরে ছিল এবং উত্তরার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৮০-এর দশক থেকে ঢাকার জনসংখ্যা এবং নগর বিস্তার ৬-৮ শতাংশ বার্ষিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে উত্তরার মতো এলাকা বিমান ঘাঁটির কাছাকাছি চলে এসেছে। এটি বিমান ঘাঁটির স্থান নির্বাচনের সমস্যা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণহীন নগরায়ণ এবং জোনিং নীতির অভাবের ফলাফল।
স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে, বিমান ঘাঁটির আশপাশের জনবসতি এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ও জোনিং নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (ICAO) নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরের রানওয়ে এবং ফ্লাইট পাথের আশপাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে উচ্চতা সীমাবদ্ধতা (height restriction) এবং নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ (building regulation) আরোপ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এ নীতিমালা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উত্তরার মতো এলাকায় স্কুল ও হাসপাতালের মতো গণজমায়েতের স্থান গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, মাইলস্টোন স্কুল দুর্ঘটনা, রানওয়ে থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তাই রাজউক ও সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে যৌথভাবে ‘high-risk buffer zone’ চিহ্নিত করে নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিমান ঘাঁটি বা বন্দরের স্থানান্তর বিবেচনা করা যেতে পারে, যদিও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৯৯৮ সালে শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে সেপাংয়ে সরানো হয় এবং ইন্দোনেশিয়া জাকার্তার পরিবর্তে নুসানতারায় নতুন রাজধানী গড়ে তুলছে। বাংলাদেশে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্যক্রমও আংশিকভাবে গাজীপুরে সরানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল এক সময়। এ ধরনের স্থানান্তরে বহু বছরের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ফ্লাইটগুলো চট্টগ্রামের জহুরুল হক এয়ারবেসে সরিয়ে নেয়া যেতে পারে, যেখানে ঘনবসতি তুলনামূলক কম। জানমালের নিরাপত্তা বিবেচনায় দুটি পদক্ষেপের যেকোনো একটি বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে মাইলস্টোনের মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো যায়।
আমাদের উদ্ধার তৎপরতা, মব হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন জরুরি সেবায় দুর্বলতা লক্ষণীয়। তার উত্তরণে করণীয় কী?
বাংলাদেশের উদ্ধার তৎপরতা, মব হ্যান্ডলিং এবং জরুরি সেবায় যে দুর্বলতা প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি, তা কাঠামোগত প্রস্তুতির অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং অভ্যাসগত অনিয়মের বহিঃপ্রকাশ। মাইলস্টোন স্কুলের ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক শিশুদের অনেকের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি, কারণ তাদের আইডি কার্ডে অভিভাবকের মোবাইল নম্বর বা রক্তের গ্রুপ লেখা ছিল না। অথচ এ দুটি তথ্য যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষা করতে পারে। এ ঘাটতি শুধু একটি স্কুলে নয়, এটি আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে নিরাপত্তা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, বাস্তব প্রয়োগ নেই।
সমাধানের প্রথম ধাপ হলো, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে স্টুডেন্ট আইডি কার্ডে অভিভাবকের মোবাইল নম্বর, রক্তের গ্রুপ ও জরুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, জাতীয়ভাবে একটি স্ট্যান্ডার্ড ‘স্কুল সেফটি প্রটোকল’ প্রণয়ন করা উচিত, যার মধ্যে থাকবে ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ, ফায়ার ও ইমারজেন্সি ড্রিল এবং সাইকোসোশ্যাল রেসপন্স ট্রেনিং। শিশুদের শুধু ক্লাসরুমে জ্ঞান দিলেই হবে না, তাদের ক্রাইসিস রেসপন্সে দক্ষ করে তুলতে হবে। স্কুলগুলোকে বছরে অন্তত দুবার মব ড্রিল পরিচালনায় বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেয়া উচিত, যেমনটা জাপান বা সিঙ্গাপুরে করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘ডিজাস্টার ট্যুরিজম’ নামক ভয়াবহ সামাজিক রোগ থেকে তরুণদের সরিয়ে আনা। ডিজিটাল ক্লিক-বেইটের লোভে কেউ যেন বিপদের সময় সাহায্য না করে শুধু ভিডিও করে—সেই মানসিক পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ও ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে যদি আমরা কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করি, তাহলে প্রতিবারই আমরা একই দুঃখজনক বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি দেখব—নতুন কিছু শেখার পরিবর্তে শুধু কষ্ট এবং দায় চাপানোর খেলা চলবে। এখন সময়, প্রতিটি ট্র্যাজেডিকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা এবং নীতিগত পরিবর্তন আনার।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে কোন কোন পদক্ষেপ নিতে হবে?
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে প্রথমেই চীনা নির্মিত এফ-৭ সিরিজের বিমানগুলোর ওপর স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিরীক্ষা (safety audit) পরিচালনা করতে হবে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-২৫ সাল পর্যন্ত এফ-৭ সিরিজের অন্তত তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থার নিরাপত্তা মানদণ্ডে”উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এই বিমানগুলোর প্রযুক্তিগত অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস এবং পাইলট প্রশিক্ষণের মান পরীক্ষা করে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলোর প্রশিক্ষণ ফ্লাইট স্থগিত করা উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে প্রশিক্ষণ ফ্লাইট নিষিদ্ধ করার জন্য বিমান চলাচল নীতিমালা (Civil-Military Airspace Rules) পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যাতে উত্তরার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে, নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ সহনশীলতা (disaster resilience) নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ‘high-risk urban buffer zone’ চিহ্নিত করে স্কুল, হাসপাতাল এবং গণজমায়েতের স্থানগুলো স্থানান্তরের পরিকল্পনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে, নেপালের পোখারা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২০২৩ সালে শহরের বাইরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং জাপানে ফ্লাইট পাথের নিচে ঘনবসতি নিরুৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশে রাজউক ও স্থানীয় প্রশাসনকে এ ধরনের জোনিং নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া বিমান বাহিনীকে এফ-৭-এর মতো পুরনো প্রযুক্তির বিমান প্রতিস্থাপনের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ বিমানে (যেমন, এফ-১৬ বা সমতুল্য) বিনিয়োগ করতে হবে, যা জ্বালানি দক্ষতা ও নিরাপত্তা বাড়াবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহির অভাব দূর করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা। মাইলস্টোন স্কুলের দুর্ঘটনার পর হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন ও ক্ষতিপূরণের রুল জারি করা হয়েছে, কিন্তু বিগত দশকে বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ হয়নি। এটি সিস্টেমিক জবাবদিহির ঘাটতি এবং জনগণের আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর স্বাধীন তদন্ত, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শাস্তি এবং নীতিগত সংস্কার বাধ্যতামূলক করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিরক্ষা ক্রয়ে দুর্নীতি রোধে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর পূর্ণ প্রয়োগ ও স্বাধীন নিরীক্ষা চালু করা উচিত। এ পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।










