সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গন্তব্য দেশগুলোর অনেকেই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে। এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম অবৈধ অভিবাসন। অবৈধ পথে কর্মী পাঠানোসহ মানব পাচারের মতো অপরাধগুলো মূলত সংঘটিত হয় বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্রের মাধ্যমে। আবার অনেকেই রিক্রুটিং এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশে গিয়েও কাজ পান না। পরে দেশে ফিরে আসেন কিংবা বাধ্য হয়ে এমন কোনো কাজে যুক্ত হন, যা ওই দেশ কর্তৃক অনুমোদিত নয়। একের পর এক শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে এটিও বড় ভূমিকা রেখেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রয়োজন ছিল অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিত করা। এর অংশ হিসেবে সবচেয়ে জরুরি ছিল রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ ও দৌরাত্ম্য বন্ধে বিশেষ মনোযোগ দেয়া। কিন্তু এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বরং নতুন করে আরো ২৫২ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দিয়েছে। যদিও দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারকাজের অংশ হিসেবে এ সরকারেরই গঠন করা শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমিয়ে আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সরকারের সেদিকে অগ্রসর হওয়ায় সমীচীন ছিল।
অতীতে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অনিয়ন্ত্রিত হারে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেয়ার ফলে বর্তমানে দেশের অভিবাসন খাত বহুমুখী সমস্যার মধ্যে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নানা অপরাধের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের আমলে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে খোদ দলটির নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। এ কারণে কেউ কেউ বিদেশে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। এছাড়া জনশক্তি রফতানিতে সিন্ডিকেট গড়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনুমান করা যায়, তৎকালীন সরকারের অংশীজনরা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতেই সময়ে সময়ে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়েছে।
জনশক্তি রফতানির জন্য বাংলাদেশের মতো বিপুল পরিমাণ রিক্রুটিং এজেন্সি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশের নেই। এর পরও সেসব দেশের অভিবাসন খাত বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের চেয়ে এগিয়ে আছে। উদাহরণ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ ভারতের কথাই বলা যায়। দেশটিতে জনশক্তি রফতানি খাতে রিক্রুটিং এজেন্সি আছে ১ হাজার ৯৮৮টি। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে এমন রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬টি বলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি তুলনামূলক কম সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সি দিয়েও ভারতের প্রবাসীয় আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে প্রবাসীরা ভারতে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই সময়ে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলার।
বিপুলসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিশেষ কোনো উপকার তো হয়ইনি, বরং তাদের অননুমোদিত কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অভিবাসন খাত। অবৈধ পথে অভিবাসনসহ নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিএমইটির তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ করে ২০২৪ সালে। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার আনুষ্ঠানিভাবে বন্ধ না হলেও ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কিছু শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য হারে কর্মী পাঠানোর কথা থাকলেও সেখানে অনেক কমসংখ্যক কর্মী পাঠানো গেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে এক প্রকার একক গন্তব্যনির্ভর হয়ে পড়েছে জনশক্তি রফতানি খাত।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যমতে, গত বছর ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তবে মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। সৌদি আরবের পর কাতারে ১০ শতাংশ, ৬ শতাংশ সিঙ্গাপুরে, কুয়েতে ৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৪ শতাংশ কর্মী গেছেন। এসব তথ্যই বলে দিচ্ছে যে জনশক্তি রফতানি প্রধানত পাঁচটি দেশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। অভিবাসন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা প্রয়োজন। আর এর জন্য জরুরি হলো রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা না বাড়িয়ে বিদ্যমান এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস এবং জাতীয় প্রবাসী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিজেও বলেছিলেন যে দালাল চক্রের জালিয়াতির কারণে বিদেশে শ্রমবাজারের ক্ষতি হচ্ছে। অথচ দালাল চক্রের লাগাম টানতে তেমন কোনো পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান নয়। বরং দিন দিন বিদেশ গমন কঠিন হয়ে উঠছে। বৈধ পথে বিদেশ গমনের পরিসরও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দেয়ার নজির বাড়ছে এবং এটিও চক্রাকারে শ্রমবাজারকে প্রভাবিত করছে। এর ফল হিসেবে বন্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া।
দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যমান বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো ধরে রাখতে হলে রিক্রুটিং এজেন্ট, দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। এজন্য রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশ বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের অধিকাংশকে জিটুজি পদ্ধতিতে পাঠায়। কিংবা অনেক ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীরা বিদেশে যান। কিন্তু এজেন্সির মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশ গমন, বিদেশে পৌঁছে প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া, আকামা না হওয়া, এমনকি কাজ ছাড়া বসিয়ে রাখার অর্থ হলো এক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। এ ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। সরকারের উচিত আর কোনো নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন না দিয়ে বরং এর সংখ্যা যৌক্তিক মাত্রায় নামিয়ে আনা। এতে এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমের প্রতি নজর রাখাও সহজ হবে। প্রতি বছর নির্দিষ্টসংখ্যক এজেন্সির কার্যক্রম মূল্যায়ন করে তাদের লাইসেন্স নবায়ন বা বাতিল করার উদ্যোগ নেয়া। মোট কথা, সরকারকে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্বচ্ছ, নিরীক্ষিত করার দিকে যেতে হবে। প্রতিটি শ্রমিক যেন নিজের ভিসা, চাকরির চুক্তি, রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্য এবং খরচ যাচাই করতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশে কাজের নিশ্চয়তা ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোকে আরো সক্রিয় হতে হবে।










