মুহাম্মদ রুহুল কাদের, সম্পাদক, ফিউচার স্টার্টআপ। তিনি জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটাস সেন্টারের ইমার্জেন্ট ভেঞ্চার্স ফেলোশিপ ও গ্রান্ট প্রোগ্রাম ২০২২-এর বিজয়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। গবেষণা ও লেখালেখি করছেন ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাত নিয়ে বাংলাদেশকে নতুন রূপান্তরের পথে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে। তার কাজে প্রাধান্য পেয়েছে প্রযুক্তি ব্যবসা, অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ, ব্যবসায়িক কৌশল, প্রযুক্তি ও সমাজ। স্টার্টআপের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আপনি ‘ফিউচার স্টার্টআপের’ সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। ‘ফিউচার স্টার্টআপ’ মূলত কী কী বিষয় নিয়ে কাজ করে সংক্ষেপে যদি বলেন?

ফিউচার স্টার্টআপকে যদি এক লাইনে বলি তাহলে এটা একটা ‘ব্যবসায়িক নলেজ প্লাটফর্ম’। আমাদের আকাঙ্ক্ষা হলো, আমরা বাংলাদেশের জন্য ব্যবসায়িক জ্ঞানের একটা অবকাঠামো বানাতে চাই। এর চিন্তাটা আসে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলে পড়াশোনা করেছি, তখন দেখা যেত আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশী কনটেক্সটে পড়াশোনা করছি, এখানকার শিক্ষার সঙ্গে যেটার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। তখন আমরা বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, সামাজিক উদ্যোগের, সিইও, ফাউন্ডারদের এবং উল্লেখযোগ্য ভালো কাজ করছে এমন মানুষের ইন্টারভিউ নিতে শুরু করলাম। এভাবে চিন্তাটা বিকশিত করতে করতে একটা সময়ে এসে মনে হলো, এটা অন্য একটা মাত্রায় করা সম্ভব। সেখান থেকেই শুরু। তখন মনে হলো যে বাংলাদেশ বিজনেস কীভাবে করতে হয়, লোকাল ব্যবসা, মার্কেট কীভাবে কাজ করে, ওভারঅল মার্কেট এবং কালচারাল কনটেক্সট সম্পর্কে এখানে নলেজের যে গ্যাপটা আছে সেটাকে আমরা সমাধান করতে পারি কিনা সে জায়গা থেকেই আমরা কাজ করতে পারি। সময়ের পরিক্রমায় আমাদের অনলাইন পাবলিকেশন ব্যবসা, অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ, আর টেকনোলজি সেক্টরের ওপর নলেজ এবং রিপোর্টিংয়ের জন্য পরিচিত হয়। আমরা বাংলাদেশে স্টার্টআপ, উদ্যোক্তাদের জন্য একটা নলেজ হাব হয় উঠি। আমি বলব বাংলাদেশে যে এখন উদ্যোক্তা বানানো এবং উদ্যোক্তা হওয়ার ব্যাপারে একটা কালচারাল আলোচনা, সচেতনতা এসেছে এর পেছনে আমাদের লেখালেখির কিছুটা হলেও ভূমিকা আছে। আমরা এখন গবেষণার কাজেও এগিয়েছি। আমাদের ফিউচার রিসার্চ নামে ছোট একটি উইং আছে। যেখান থেকে আমরা মার্কেট রিসার্চ, বিজনেস অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ, টেকনোলজি এগুলোকে ভিত্তি করে কিছু রিসার্চ করছি। কমিউনিকেশন এবং নেরেটিভ বিল্ডিং নিয়েও আমরা কিছু কাজ করছি আলাদাভাবে। আমরা মনে করি আমাদের কাজের ক্ষেত্র বেশ বড় এবং এখানে বেশ ইম্পেক্টফুল কাজ করার সুযোগ আছে। আমরা সে হিসেবে মাত্র শুরু করছি।

গত দুই-তিন দশকে আমরা দেখলাম, বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং সেটার হাত ধরে সারা বিশ্বে অনেক স্টার্টআপ দেখছি, ইউনিকর্ন প্রতিষ্ঠান দেখছি। কিন্তু বাংলাদেশে তো আমরা সেই অর্থে তেমন কোনো ইউনিকর্ন পাইনি। আমাদের স্টার্টআপের ইকোসিস্টেমের মধ্যে আপনি আসলে কী ধরনের সমস্যা দেখছেন?

আমার কাছে মনে হয় চ্যালেঞ্জটা অনেক রকমের। এটা খুব সহজে সমাধানযোগ্য এ রকমও না। আপনার বিজনেস হবে কি হবে না এটার ক্ষেত্রে পলিসি, ফাইন্যান্স এ জিনিসগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের সমাজের নরম্যাটিভ সেটিংটা কী রকম তার ওপর এটা অনেকটা নির্ভর করে। সে হিসেবে আমি দুটি সমস্যার কথা বলব। একটা কালচারাল, নরম্যাটিভ। অন্যটা পলিসি এবং রেগুলেটরি।

কালচারাল ব্যাপারটা হলো একটা সমাজ কতটা আশাবাদী, আমরা মেরিটোক্রেটিক কিনা, পরিশ্রমকে আমরা কতটা ভ্যালু দেই, ব্যবসা করাকে আমরা কীভাবে দেখি, আমরা কতটা একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করি, কলাবোরেট করি, লোকাল নলেজ সহজে পাওয়া যায় কিনা, ফেল করাকে আমরা কীভাবে দেখি, লোকাল ধনীরা বা সফল ব্যবসায়িক গ্রুপরা নিজের বাইরে মিনিংফুল ফিলানথ্রফি করছে কিনা যা নতুন উদ্যোক্তা বানাতে সহায়ক, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কী রকম, এ রকম অনেক নরম্যাটিভ বিষয় কিন্তু জড়িত।

আর পলিসি যদি এক কথায় বলি, ব্যবসা করাটা কতটা সহজ এবং কতটা কম খরচে করা যায়।

এ বিষয়ে আমরা অনেকদিন ধরে লিখছি। কিছুদিন আগেও আমি নিজে একটা পত্রিকায় লিখলাম কীভাবে আমরা উদ্যোক্তা বাড়াতে পারি।

আমাদের দেশে স্টার্টআপ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, সরকার ফান্ডও করে কিন্তু আপনি যদি অবজেক্টিভলি দেখেন, তাহলে আসলে কোনোটা কোনোটার সঙ্গে যুক্ত না। অনেকটা দান্তের সেই বাণীর মতো—‘ইন হেল নাথিং কানেক্টস উইথ নাথিং’। যেমন আইসিটি মন্ত্রণালয় একটা করছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরেকটা করছে, অর্থ মন্ত্রণালয় হয়তো অন্যটা করছে। যদিও আমরা ১৩ বছর ধরে স্টার্টআপ নিয়ে কথা বলছি কিন্তু বেসিক যে পলিসি থিংকিং ওই জায়গায় কিন্তু আমরা কাজ করছি না। স্টার্টআপে কিন্তু এ ধরনের সমস্যাগুলো রয়েছে। আমাদের মেজর পলিসি সিদ্ধান্তগুলো এম্পেরিক্যাল বেসিসে হয় না, ইচ্ছামতো, ব্যক্তির স্বার্থের খাতিরে হয়। ফলে দেখবেন অনেক নয়েজ হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে কম। আমাদের পলিসি চিন্তায় পরিবর্তন দরকার।

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই স্টার্টআপের ক্ষেত্রে জরুরি বিষয়। কিন্তু আমাদের স্টার্টআপগুলো কেন এফডিআই পাচ্ছে না, যদিও আমাদের এখানে অনেক উদ্যমী তরুণ আছে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথাও বলে থাকি আমরা?

এ বিষগুলো নিয়ে ঢালাও একটা কথা বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা কিন্তু অতটা সাদাকালো না।

আমি বিস্তৃত চ্যালেঞ্জের কথা যদি বলি, এটার সঙ্গে আমাদের ওপরের আলোচনা, কেন আরো বেশি ভালো স্টার্টআপ হচ্ছে না, এটা বুঝতে হবে। স্টার্টআপকে লংটেইল ব্যাপার বলা হয়। আপনার সফল ব্যবসার সংখ্যা আপনার টোটাল ব্যবসার সংখ্যার সঙ্গে জড়িত। পরেরটা যত বেশি আগেরটা তত বেশি। কেন ফান্ড রেইজ করতে পারছে না—এটা কিন্তু এ বিষয়ের ওপর নির্ভর করে যে আপনার কত বেশি ফান্ডেবল স্টার্টআপ আছে। এর সঙ্গে আরো অনেক বিষয় জড়িত।

আমাদের আরো সক্ষম লোকবলের দরকার আছে। আমাদের আরো সুযোগের সুষমবণ্টন দরকার আছে। এজন্য আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিটির প্রতিও আমাদের নজর দিতে হবে। আমাদের লোকজন কিন্তু অনেকেই বাইরের দেশে গিয়ে বেশ ভালো করছেন। সেই দিক থেকে আমাদের সক্ষম লোকের যে অভাব বিষয়টা সে রকম না। আমরা যে পারি না তা নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে ওই লেভেলের একটা প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করতে পারে, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাতার কথা যদি বলি তাহলে এই লেভেলে আমদের কিছুটা ঘাটতি আছে।

দ্বিতীয়ত, ফান্ডিংয়ের বিষয় আছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে স্টার্টআপের জন্য আসলেই বিশ্বব্যাপী একটা খারাপ সময় যাচ্ছে। আমাদের জন্য একটু বেশিই খারাপ যাচ্ছে, কিন্তু সবার জন্যই সময়টা অতটা সহজ নয়।

আমাদের জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজার আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালের (ভিসি) জন্য অনেকটা বিচ্ছিন্ন। তারা যেটা করে তা হলো, তাদের একটা চিন্তা থাকে কোথায় বিনিয়োগ করবে। অনেক ভিসি রিজিওনালি ফান্ড ম্যান্ডেড করে, যেমন সাউথ ইস্ট এশিয়া, মিনা ইত্যাদি। বাংলাদেশ এ রকম কোনো জোনের মধ্যে পড়েনি। তার ওপর আমাদের দেশটা ছোট। আবার ভারতের প্রতিবেশী, যাদের বিশাল জনসংখ্যা (ভোক্তা)। এ কারণে আমাদের বিদেশী ফান্ড আকর্ষণ করাটাও একটা কঠিন ব্যাপার যদি আমরা ওভারঅল কম্পিটিশনের কথা বলি।

আমাদের লোকাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) কিন্তু গ্রো করিনি। ফলে লোকালি বিনিয়োগ হচ্ছে। এটা বিদেশী ভিসিদের জন্য একটা সিগনাল কিন্তু। আর তাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জও বটে। লোকাল অ্যাকটিভ ভিসি থাকলে বিদেশীরাও বিনিয়োগ করার জন্য লোকাল কারো সঙ্গে কাজ করতে পারত অথবা কো-ইনভেস্ট করতে পারত। এইটা এখন হচ্ছে না।

এছাড়া আমাদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (রেগুলেটরি রেজিম) আসলে কতটা বিদেশী ভিসি বিনিয়োগ ইভেন লোকাল ভিসিদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক, বিনিয়োগ করা কতটা সহজ তাও একটা বিষয়। এগুলো নিয়েও আমাদের দেশে বিস্তর আলোচনা হয়েছে যে এখানে বিনিয়োগ করাটা অত সহজ না।

আবার স্টার্টআপে যদি আপনি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চান, তাহলে তো আপনার কিছু দেশীয় বিনিয়োগও দেখাতে হবে। কারণ আপনার যদি স্থানীয় সক্রিয় বিনিয়োগ না থাকে তাহলে বিদেশীরা কেন আসবে?

স্টার্টআপ সাধারণত উদ্ভাবনী জিনিস নিয়ে আসে। কিন্তু দেখা যায়, কোথাও একটা সেবা সফল হলে আমরা সবাই ওইদিকে যাই। যে কারণে ই-কমার্সের বন্যা ছিল গত পাঁচ-দশ বছর। সেদিক থেকে চিন্তা করলে আমাদের কী আসলে মৌলিক চিন্তার স্বল্পতা আছে?

এখানে আসলে অনেকগুলো ফোর্সেস আছে। সাদামাটাভাবে যদি সমালোচনা করি তাহলে বলব, আমরা অনেক অনুকরণপ্রিয়, অনেক কপি করি—এটাই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত উত্তর। তবে এখানে অনেকগুলো তাড়না (ফোর্সেস) আছে। যেমন আমি যদি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাই, তাহলে বিদেশীরা কী ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে চায় আমাকে সে ধরনের কোম্পানিই বানাতে হবে। ফলে আমরা একই ধরনের কোম্পানি দেখছি যেগুলো মার্কেট ট্রেন্ডের কারণে হচ্ছে। এক সময় রাইড হেইলিং হয়েছে, ই-কমার্স হয়েছে, এখন এআই হচ্ছে। মৌলিক চিন্তা করাটা কিন্তু সহজ নয়। আবার মৌলিক চিন্তাকে আপনার কালচার মার্কেট সাপোর্ট করছে কিনা সেটাও কিন্তু আমাদের দেখতে হবে।

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, আমাদের লোকাল বিজনেস ইকোসিস্টেমে লোকাল নলেজের ঘাটতি আছে। শুধু তা-ই নয়, কালচারাল কনটেক্সটও একটা ভূমিকা রাখছে। আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা সেখানে এ প্রয়োজনীয় পড়াশোনা তুলনামূলক কম হয়। বিজনেস স্কুলে বিদেশী কেস স্টাডিগুলোই পড়ানো হয়। সেজন্য আমাদের এখানের ছেলেরা যখন বের হয়, তারা অ্যাপল সম্পর্কে জানে, আরেকটা অ্যাপল তৈরি করতে চায়।

এর বাইরেও অনুকরণের একটা ব্যাপার তো আছেই। আমরা তো অনুকরণের মাধ্যমে শিখছি। মানুষ তো মিমেটিক। কিন্তু এটার অতিরিক্ত উপস্থিতি সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

তবে আরেকটা বিষয় হলো, এখানে যে একেবারেই চমৎকার আইডিয়া হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। কিছু হলেও হচ্ছে। আমরা যারা অ্যাটেনশন দিই, আমরাও কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে বায়াসড। আমরা হয়তো বেশি ই-কমার্স কোম্পানিগুলো দেখছি, কিন্তু হয়তো কেউ সিলেটে বসে কিছু একটা করেছে, সেটা আমরা দেখছি না। হয়তো হচ্ছে, সে ক্রাউডের মধ্যে নেই অথবা সে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না। আমরা দেখেছি বৃহৎ কিংবা মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অভিযোগের জায়গা হলো আমাদের ট্রেড পলিসি ও ট্যারিফ। স্টার্টআপদের তো সরকার প্রচুর প্রণোদনা দিচ্ছে, অনেকগুলো উইং খোলা হয়েছে, নিয়মিত আমরা প্রচুর বিবৃতি, ঘোষণা দেখতে পাচ্ছি। আসলে তারা কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে?

স্টার্টআপ তো একটা ব্যবসাই। আমাদের আসলে স্টার্টআপের জন্য আলাদা কিছু করার প্রয়োজন নেই। আপনার যদি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ হয় তাহলে কিন্তু যেকোনো ধরনের ব্যবসাই এখানে উন্নতি করবে। প্রতিষ্ঠিত বিজনেসগুলোর অভিযোগও কিন্তু প্রায় একই ধরনের। যেমন ধরুন ট্যাক্সেশনের যে সমস্যা, ভ্যাটের যে পদ্ধতি আছে, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া যেগুলো আছে, অথবা বিরোধ বা বিবাদ মীমাংসার প্রক্রিয়া যেটা আছে, অথবা মূলধন প্রাপ্যতার যে সমস্যা আছে—এগুলো সব ব্যবসার জন্যই চ্যালেঞ্জ, এ কারণে স্টার্টআপের জন্যও এগুলো চ্যালেঞ্জ।

আমাদের সব বিষয়ে রেগুলেটরি রেজিমই কিন্তু জটিল ও অনেক ব্যয়বহুল। এটি এমন জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়ার কারণেই কিন্তু অনেক দুর্নীতি হয়। একটা দেশে যখন পলিসি রেজিম (নীতি ব্যবস্থা) অনেক জটিল, সেখানে হয় অনেক বেশি দুর্নীতি হয় কিংবা নীতিগুলো বাস্তবায়ন হয় না। আমার মনে হয়, আমাদের দেশে বিজনেস এনভারনমেন্টে প্রধান সমস্যা এটাই। একটা হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ আছে। অর্থাৎ যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করার কথা এর চেয়ে বেশি করা হচ্ছে। ফলে সরকারের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্যাক্সেশনে, যে কারণে বেশি রাজস্ব সংগ্রহের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এ কারণে সরকারের উচিত এ জিনিসগুলোকে সহজ ও মিতব্যয়ী করা।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ দৃশ্যপট কল্পনা করলে সফল কোন তিনটি কোম্পানির কথা আপনার মাথায় আসে। সেগুলোর সফলতার পেছনে কী কারণ আছে বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে ব্যবসা করা অনেক কঠিন। পলিসি রেজিমটা যদি আরেকটু সহজ করা হতো তাহলে ব্যবসার জন্য ভালো হতো। আমি সফল ব্যবসার নাম না বলে যদি সাধারণ প্যাটার্ন বলি, যেসব ব্যবসা ভালো করে তাহলে মনে হয় ভালো হয়।

সাধারণভাবে বললে কোনো কোম্পানিকে ভালো করতে হলে তার প্রতিষ্ঠাতাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বা অনড় হতে হয়। প্রতিকূল পরিবেশে ন্যাভিগেট করার সক্ষমতা থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অনেকটা এরকম আপনি যদি সবকিছু করেন, সবকিছু চেষ্টা করেন, আপনি জিতবেন। আরেকটা বিষয় হলো লম্বা সময় কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করা। এইটার কারণ দুটি। একটা কারণ যেকোনো মিনিংফুল কাজ করতে অনেক সময় লাগে। আরেকটা কারণ হলো ব্যবসা করার মূল বিষয় হলো লার্নিং, শেখা। আর ব্যবসায়ের মূল মন্ত্রগুলো শিখতে অনেক সময় লাগে। এটা অনেকটা সাইকেল চালানোর মতো, টেসিড নলেজ। করে আপনাকে শিখতে হবে। এগুলো হলো সাধারণ বিষয়।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, বিজনেসের কালচারাল কনটেক্সটটা বোঝা দরকার। এটা না বুঝলে আপনি ব্যবসাটা করতে পারবেন না। এর দুটি দিক রয়েছে। একটা হচ্ছে, আপনি যে ব্যবসাটা করছেন এটা বাংলাদেশের কোন জায়গায় আছে, কোন সময়ে আপনি ব্যবসা করছেন যে কারণে এটা বড় হবে। কথায় আছে যে আইডিয়ার সময় এসেছে সেটাকে আটকানো যাবে না। ব্যবসায়ও একই ব্যাপার। টাইমিং মিলতে হয়। আপনার আইডিয়া আর মার্কেটের টাইমিং মিলতে হবে। আরেকটা দিক হলো, আপনি যে পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপে অপারেট করছেন সেটাতে নেভিগেট করতে জানতে হবে। আমাদের কন্টিনেন্টে ব্যবসা আর পলিটিক্স অনেকভাবে সম্পর্কিত। সেটা বুঝতে হবে। এখানে আপনাকে অতি আশাবাদী হলে হবে না, বাস্তববাদী হতে হবে। যদি এখানে ব্যবসা বড় করতে হয়, তাহলে কীভাবে প্রতিকূলতা জয় করে টিকে থাকতে হবে সে বিষয়ে জানতে হবে।

উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বর্তমান ও আগামীর সরকারের কোন কোন জায়গায় হাত দেয়া উচিত বলে মনে করেন?

শুরুতেই কালচারাল কনটেক্সটের কথা বলেছিলাম। উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টি একটা নরম্যাটিভ ব্যাপার। আপনার সমাজ কতটা আশাবাদী, মানে বাবা-মা যদি মনে করেন আমার ছেলে ব্যবসা করতে চায়, করুক। সে মনে হয় সফল হবে, আমরা অনেক বড়লোক হব। কিন্তু বাবা-মা তো এ স্বপ্নই দেখতে পারে না। কারণ তারা জানে যে এখানে ব্যবসা করাটা এত সহজ বিষয় না, সাহায্য পাওয়াটা অত সহজ না। কালচারাল কনটেক্সটা একটা বড় ফ্যাক্টর। কালচারালি আমাদের মেরিটোক্রেসি এবং পরিশ্রমকে উৎসাহিত করতে হবে।

আর বিজনেসের ক্ষেত্রে সরকারের অনেকটা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আমার কাছে মনে হয় সরকারের উচিত হচ্ছে কম রেগুলেশন করা, কম পলিসি বানানো, কম চোর ধরার চেষ্টা করা। এর বিপরীতে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা করা, পলিসি বানানোর কাজটা গুড ফেইথ থেকে করা। সরকারের উচিত হচ্ছে যদি সেখানে কিছু একটা কাজ হয় তাহলে তাদের আগ বাড়িয়ে কিছু না করা। তার উচিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা। এতগুলো ডিপার্টমেন্ট বানাবে, এতগুলো মন্ত্রণালয় বানাবে—এগুলো কম করা উচিত। এগুলো করলে অহেতুক জটিলতা বাড়ে, অহেতুক টাকা-পয়সা নষ্ট হয়। এর বিপরীতে সরকারের আরো প্রচেষ্টা চালানো দরকার যে মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বয় করে কীভাবে মাঠটাকে আরো মসৃণ করবে, সহজ করবে, যাতে অন্যরা ফান্ডিং করতে পারে। আর যদি ফান্ড করতে না পারে তাহলে কীভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সাপোর্ট দিতে পারে, যারা ফান্ড করতে চায় তাদের, যেন তারা বিনিয়োগ করতে পারে—সে বিষয়গুলোয় আরো মনোনিবেশ করা উচিত। আমাদের রেগুলেটরি ওভাররিচ আছে। যেমন ফিনটেকে যদি দেখেন। কোনোকিছু করাই মুশকিল নতুনদের জন্য। একটা রিস্ক ফ্যাক্টর আছে যে টাকা নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিচার বিভাগ, প্রতারণার বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনি ম্যাকানিজম আছে। সরকারকে প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে প্রাইভেট সেক্টরকে এমপাওয়ার করতে হবে। আমার মনে হয়, সরকারের উচিত অতি রেগুলেশন না করে পথ আরো মসৃণ ও সহজ করা।