আপনার কি কখনো পরীক্ষার আগে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের সময় পেটে একটা অস্বস্তি বা প্রজাপতি ওড়ার মতো অনুভূতি হয়েছে? অথবা কোনো লোভনীয় খাবারের বিজ্ঞাপন দেখে হঠাৎ করে খুব খিদে পেয়েছে? এই অনুভূতিগুলো আসলে আপনার মস্তিষ্ক এবং পেটের বা অন্ত্রের মধ্যকার গভীর যোগাযোগেরই ফল। আমাদের অন্ত্রে থাকে কোটি কোটি অণুজীবের এক বিশাল পরিবার, যাদের একসঙ্গে ‘গাট মাইক্রোবায়োম’ বা ‘অন্ত্রের অণুজীবসমগ্র’ বলা হয়। এই আণুবীক্ষণিক অতি ক্ষুদ্র সদস্যরা কিন্তু শুধুই ব্যাকটেরিয়া নয়, এদের মধ্যে রয়েছে ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীও। তবে এক্ষেত্রে ব‍্যাকটেরিয়া সংখ‍্যা ও বৈচিত্র্যে সর্বোচ্চ। মানবদেহে শুধু অন্ত্রেই নয়, শ্বাসযন্ত্র, ত্বক, মূত্রনালি, অভ‍্যন্তরীণ অঙ্গ এবং মুখেও মাইক্রোবায়োম থাকে। এ সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় আমাদের মানব মাইক্রোবায়োম, যা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীবের এক জটিল জগৎ। নেক্সট জেনারেশন সিকুয়েন্সিং ডাটা বিশ্লেষণের ফলাফলে দেখা যায় যে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানবদেহে ৩-৬ পাউন্ড অদৃশ্য মাইক্রোবায়োম থাকে। সংখ্যায় এরা দেহের মোট মানব কোষের প্রায় ১০ গুণ, কিন্তু আণুবীক্ষণিক বিধায় খালি চোখে আমরা এদের দেখতে পাই না। যদি কোনো ব্যক্তির মাইক্রোবায়োমের পরিমাণ ৩ পাউন্ডের নিচে নেমে যায়, তবে ওই ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল বা অকার্যকর হয়ে পড়ে। সুতরাং আপনার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য এবং পরিমাণ অপরিহার্য। আমাদের গাট বা অন্ত্রের অদৃশ্য মাইক্রোবায়োম কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, ব‍্যক্তিত্ব এবং ব‍্যক্তির সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করে, তা হালনাগাদ বিজ্ঞানভিত্তিক আলোকপাত করাই এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ‍্য।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজির অধ্যাপক জাস্টিন সনেনবার্গ এ মাইক্রোবায়োমকে একটি ছোট রেইনফরেস্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি যেন এক রেইনফরেস্ট, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির, নানা আকার ও আকৃতির অণুজীব একসঙ্গে মিলে শরীরের বিভিন্ন অংশে জটিল সম্প্রদায় তৈরি করে। মানবদেহে বাস করা মাইক্রোবায়োম প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য অনন্য। ভাবুন যেমন আমাদের প্রত্যেকের আঙুলের ছাপ আলাদা, ঠিক তেমনি আপনার মাইক্রোবায়োমও শুধু আপনারই নিজস্ব। একটি গবেষণায় ৮৬ জন মানুষের অন্ত্র, মুখ, নাক ও ত্বকের মাইক্রোবায়োম ছয় বছর ধরে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটি ব্যক্তির দেহে যে ব্যাকটেরিয়াগুলো সবচেয়ে স্থায়ীভাবে টিকে থাকে, সেগুলোই সেই ব্যক্তির জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। অর্থাৎ মানবজাতির জন্য কিছু সাধারণ ব্যাকটেরিয়া থাকলেও আপনার ব্যক্তিগত অনন্য ব্যাকটেরিয়াই আপনার স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্য এক সাম্প্রতিক গবেষণা পত্রে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্নাইডার বলেন, প্রত্যেকের দেহেই একটি অনন্য মাইক্রোবায়োম রয়েছে, যা শুধু সেই ব্যক্তির জন্যই নির্দিষ্ট। আপনার জিনগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সবকিছুই এই বিশেষ বাস্তুতন্ত্রকে গড়ে তোলে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মাইক্রোবায়োম এবং স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন টাইপ ২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাইক্রোবায়োম তুলনামূলকভাবে কম স্থিতিশীল এবং বৈচিত্র্যহীন হয়। এর কারণ হলো ইনসুলিন প্রতিরোধের কারণে রক্তে লিপিড, প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদানের পরিবর্তন ঘটে, যা মাইক্রোবায়োমের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ ব্যাহত করে এবং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

আমাদের অন্ত্রনালি, বিশেষ করে কোলনে থাকা ক্ষুদ্র অণুজীবেরাই গাট মাইক্রোবায়োম গঠন করে। এই অণুজীবেরা, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া, শর্করা, প্রোটিন এবং চিনিকে পুষ্টিতে ভাঙতে এবং কোলনে ফাইবার (আঁশজাতীয় খাবার) পরিপাক করতে শরীরকে সাহায্য করে। মজার ব‍্যাপার হচ্ছে আমরা যা খাই এবং পান করি, তার যে অংশ হজম বা শোষণ হয় না, তা আমাদের অন্ত্রনালির শেষ প্রান্তে, অর্থাৎ কোলনে পৌঁছায়। সেখানেই বেশির ভাগ অণুজীব বাস করে এবং সেই অপাচ্য অংশ তাদের খাদ্যে পরিণত হয়। সেজন‍্য দেহের মাইক্রোবায়োমের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ রেখে আমাদের খাবারে পর্যাপ্ত উদ্ভিজ্জ আঁশজাতীয় খাবার যেমন শাকসবজি ও ফলমূল ইত‍্যাদি গ্রহণ করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি বা কম হলে ডায়াবেটিস ও অন্যান্য মারাত্মক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ফাইবারযুক্ত খাবার খেলে মাইক্রোবায়োটার বৈচিত্র্য বাড়ে, যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে সংখ‍্যায় নগণ্য হেলিকোব‍্যাকটার পাইলরিসহ কিছু কিছু ক্ষতিকর অণুজীব আমাদের দেহের গাট বা কোলনে বা অন‍্য অংশে কলোনি বা বায়োফিল্ম তৈরি করে নানা রকম রোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু উপকারী মাইক্রোবায়োমের উপস্থিতি এদের প্রতিরোধ বা দমন করে আমাদের সুস্থ রাখে।

যখন অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম সুস্থ থাকে, তখন ব্যাকটেরিয়াসহ অন‍্যান‍্য অণজীব শরীরের জন্য সহায়ক অনেক উপকারী নানা অণু এবং মেটাবোলাইট উৎপাদন বা তৈরি করে। যেমন ভিটামিন কে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে, মূলত অন্ত্রের অণুজীবরাই তৈরি করে। একইভাবে ফলিক অ্যাসিড, যা ত্বক, চুল ও নখের মতো নতুন কোষ তৈরিতে জরুরি, সেটিও অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম থেকে উৎপন্ন হয়।

প্রত্যেকের সুস্থ অন্ত্রের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। যদিও একটি সুস্থ অন্ত্রে বেশি সংখ্যক বৈচিত্র্যময় মাইক্রোবায়োট থাকে, তবে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। আপনার জন্য যা ‘স্বাভাবিক’, তা অন্য কারো জন্য নাও হতে পারে। যেমন, ইশেরিশিয়া কোলাই (Escherichia coli) নামক ব্যাকটেরিয়াম খাদ্য বিষক্রিয়া ঘটাতে পারলেও এর বেশির ভাগ স্ট্রেইন শুধু নিরীহ নয়, বরং উপকারীও। ইশেরিশিয়া কোলাই আমাদের অন্ত্রে বাস করে এবং ভিটামিন কে ও বি১২ তৈরি করা, এমনকি রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে ঠেকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে।

মানুষের অন্ত্রে বসবাসকারী অসংখ্য অণুজীবের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী ভূমিকা পালন করে। এদের মধ্যে বিফিডোব্যাকটেরিয়াম (যেমন: বিফিডোব্যাকটেরিয়াম ল্যাকটিস, বিফিডোব্যাকটেরিয়াম বিফিডাম) এবং ল্যাকটোব্যাসিলাস (যেমন: ল্যাকটোব্যাসিলাস অ্যাসিডোফিলাস, ল্যাকটোব্যাসিলাস প্ল্যান্টারাম) প্রজাতিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিফিডোব্যাকটেরিয়াম প্রজাতিগুলো শিশুদের অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য এবং অ্যাসিটেটের মতো শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (এসসিএফএ) উৎপাদন করে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় ও রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে। অন্যদিকে ল্যাকটোব্যাসিলাস প্রজাতিগুলো ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে অন্ত্রের pH কমিয়ে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে, পুষ্টি শোষণকে সমর্থন করে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এছাড়া ফেক্যালিব্যাকটেরিয়াম প্রুসনিটজি (Faecalibacterium prausnitzii) এবং রোজবুরিয়া (Roseburia) প্রজাতিগুলো বিউটারেট নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ এসসিএফএ উৎপাদন করে, যা অন্ত্রের কোষের জন্য শক্তির প্রধান উৎস এবং অন্ত্রের প্রাচীরের অখণ্ডতা বজায় রেখে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। আকারম্যানসিয়া মিউসিনিফিলা (Akkermansia muciniphila) অন্ত্রের শ্লেষ্মা স্তরকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক। উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো সম্মিলিতভাবে একটি সুস্থ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ অন্ত্রের পরিবেশ তৈরি করে, যা সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মস্তিষ্কের সঙ্গে এর সম্পর্ক, যা ‘গাট-ব্রেন অ্যাকসিস’ নামে পরিচিত। অন্ত্র শরীরের ৯০-৯৫ শতাংশ মহামূল্যবান হরমোন সেরোটোনিন তৈরি করে। এ সেরোটোনিন স্নায়ুকোষের মধ্যে বার্তা পাঠায় এবং ঘুম, মেজাজ ও হজমের মতো শারীরিক কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটা ডোপামিন এবং ট্রিপটামিন হরমোনের মতো অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটার এবং রাসায়নিক উৎপাদনেও সাহায্য করে, যা উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো মানসিক অবস্থায় ভূমিকা রাখে। হরমোনের ক্রিয়া মানুষের আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ট্রিপটামিন একটি মনোঅ্যামিন অ্যালকালয়েড, যা সেরোটোনিন ও মেলাটোনিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটারের বায়োকেমিক্যাল পূর্বগামী হিসেবে কাজ করে। এটি মেজাজ, ঘুম ও স্মৃতিশক্তি ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অধ্যাপক সনেনবার্গ বলেন, আমাদের অন্ত্রে যেন একটা ছোট ওষুধের কারখানা আছে, যা শত শত, এমনকি হাজার হাজার, ওষুধসদৃশ যৌগ তৈরি করে, যা আমাদের রক্ত সঞ্চালনে মিশে যায়।

মজার বিষয় হচ্ছে আমাদের অন্ত্রের নিজস্ব একটি স্নায়ুতন্ত্র আছে, যাকে এন্টারিক সিস্টেম বলা হয়। একে প্রায়ই শরীরের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয়। এ সিস্টেমে মস্তিষ্কের মতো অনেক নিউরোট্রান্সমিটার থাকে, যা ব্যথা অনুভব করতে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সক্রিয় করতে সাহায্য করে। এটি হজমতন্ত্রের মাধ্যমে খাদ্য চলাচলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজনে এটি মস্তিষ্কের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। যদি আপনার পুরো অন্ত্র শরীর থেকে আলাদা করে টেবিলে রাখা হয়, তাও এটি নড়াচড়া করবে। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক মানুষ অনেক আগে থেকেই জানত। যেমন অনেকে নার্ভাস হলে ডায়রিয়া বা বিষণ্ন হলে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন।

সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, অটিজম, পারকিনসন্স রোগ এবং আলঝেইমারসহ বিভিন্ন স্নায়ু অবক্ষয়জনিত রোগের সঙ্গে ডিসবায়োসিস বা অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটার ভারসাম্যের অভাবের সম্পর্ক রয়েছে। তবে গবেষকরা এখনো বোঝার চেষ্টা করছেন যে অন্ত্র ও মস্তিষ্কের এ যোগাযোগ কীভাবে কাজ করে এবং এ সম্পর্কগুলো কার্যকারণ নাকি নিছকই সহ-সম্পর্ক। যেমন আমরা জানি যে বিষণ্নতা বা অন্যান্য মেজাজজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। কিন্তু অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটার ভারসাম্যের অভাব কি এটি ঘটায়, নাকি মেজাজজনিত রোগ অন্ত্রের ডিসবায়োসিস সৃষ্টি করে, এ বিষয়টি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম পোষকের জিনের প্রকাশ ঘটিয়ে নতুন প্রোটিন সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি আজ প্রমাণিত সত‍্য। সেজন্য প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট কিংবা প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার যেমন টাটকা সালাদ, ফল, দই ইত্যাদি গ্রহণ করে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র‍্য এবং পরিমাণ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যের প্রভূত উন্নতি করা যায়।

অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম যেহেতু আমাদের শারীরিক সুস্থতার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে কীভাবে আমরা একে সুস্থ রাখব বা খারাপ হলে পুনরায় ভারসাম্য আনব? আপনার খাদ্যাভ্যাস আপনার অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে সরাসরি প্রভাবিত করে। যেমন বেশি চিনি এবং কম ফাইবারযুক্ত খাবার আপনার শরীর দ্রুত হজম করে, ফলে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটার জন্য খুব কম পুষ্টি অবশিষ্ট থাকে।

উল্টোদিকে হজম না হওয়া চিনি বরং রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্ট করতে পারে। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিক ভালো ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি খারাপ ব্যাকটেরিয়াকেও মেরে ফেলে। তবে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম খুব স্থিতিস্থাপক। যদি আপনি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আবার শুরু করেন বা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করেন, তবে এটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়। এর মানে হলো শুধু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই আপনার পেটের মাইক্রোবায়োমকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার যেমন শস্য, শাকসবজি এবং ডাল (লেগুম) থেকে পাওয়া জটিল কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার পরামর্শ দেন। আপনার খাদ্যতালিকায় কিমচি, দই, কেফির এবং সওয়েরক্রাউটের মতো গাঁজানো খাবারও যোগ করা উচিত। এগুলোয় নিজস্ব প্রোবায়োটিক থাকে, যা অন্ত্রে মাইক্রোবায়োটার বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। এছাড়া চিনির পরিমাণ কমিয়ে ফাইবারযুক্ত খাবারের সঙ্গে মেশানো উচিত; যেমন ফলের রস না পান করে আস্ত ফল খাওয়া।

মানুষ ছাড়াও গবাদিপশু, পোলট্রি, মাছ এবং এমনকি উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পশুপালন ও মৎস্য চাষে, প্রোবায়োটিকগুলো পশুর অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে পুষ্টি শোষণ বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং বৃদ্ধির হার উন্নত করতে সাহায্য করে। এর ফলস্বরূপ মাংস ও ডিম উৎপাদনও বাড়ে। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে, রাইজোস্ফিয়ার মাইক্রোবায়োম (শিকড়ের চারপাশে থাকা অণুজীব) উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং পরিবেশগত চাপ সহনশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাটিতে উপকারী অণুজীব (যা এক প্রকার প্রোবায়োটিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে) প্রয়োগ করে উদ্ভিদের পুষ্টি এবং সুরক্ষা উভয়ই উন্নত করা যায়, যা ফসলের উৎপাদন বাড়ায় এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমায়।

মাটির স্বাস্থ্য এবং উচ্চ ফসল উৎপাদনে মাইক্রোবায়োমের ভূমিকা অপরিসীম। মাটির অণুজীব সম্প্রদায়, যেমন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক, মাটির গঠন উন্নত করে, পুষ্টির প্রাপ্যতা বাড়ায় এবং উদ্ভিদকে রোগ থেকে রক্ষা করে। এ অণুজীবগুলো নাইট্রোজেন সংবন্ধন প্রক্রিয়ায় (nitrogen fixation) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেখানে বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন উদ্ভিদের ব্যবহার উপযোগী রূপে রূপান্তরিত হয়। ফলে কৃষিতে উপকারী অণুজীবভিত্তিক বায়োফার্টিলাইজার এবং বায়োপেস্টিসাইড একটি বিকাশমান ও প্রতিবেশগতভাবে টেকসই শিল্প। এছাড়া মাটির মাইক্রোবায়োম কার্বন চক্রে অংশ নিয়ে কার্বনকে মাটিতে আবদ্ধ করতে সাহায্য করে, যা গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতেও সহায়ক। মাটির মাইক্রোবায়োমকে প্রকৌশলীকরণের (engineering soil microbiome) মাধ্যমে আমরা নির্দিষ্ট উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়াতে পারি, যা ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাতে এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই কৃষিকে উৎসাহিত করতে সাহায্য করবে। এই প্রক্রিয়া গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন প্রশমনে এবং নাইট্রোজেন ও কার্বন সংবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

ধানের বীজের ভেতরে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়া উদ্ঘাটন করে তা প্রোবায়োটিক হিসেবে ব্যবহার করে আমরা ধান চাষে রাসায়নিক সারের চাহিদা শতকরা প্রায় ৫০ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছি। অনুরূপভাবে গমের বীজ থেকে আবিষ্কৃত কিছু ব্যাকটেরিয়া মহামারী সৃষ্টিকারী গমের ব্লাস্ট রোগ মাঠ পর্যায়ে শতকরা ৮০ শতাংশের বেশি দমন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। ইলিশ মাছ কখনো রোগাক্রান্ত হয়েছে এমন কোনো রিপোর্ট নেই। নেক্সট জেনারেশন সিকুয়েন্সিং এবং মেটাজিনোমিক্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে বেশ কয়টি নতুন উপকারী গাট ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছি, যা ইলিশে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং স্মার্ট পারফরম্যান্সের জন্য দায়ী। এসব প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া মৎস্য চাষে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব উপকারী নবায়নযোগ্য অণুজীবকে আমি বাংলাদেশের ‘জৈবসোনা’ নামে অভিহিত করছি। বাংলাদেশের মৃত্তিকার মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি যে যেসব এলাকার মাটি অনুর্বর এবং কম উৎপাদনশীল, সেসব মাটিতে মাইক্রোবায়োম বৈচিত্র্য এবং সংখ্যা উর্বর ও উৎপাদনশীল এলাকার চেয়ে অনেক কম। মৃত্তিকার স্বাস্থ্য জানা এবং টেকসই খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বিশদ অধ্যয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ মৃত্তিকা মাইক্রোবায়োম মানচিত্র তৈরি করা এবং প্রয়োজনে মাইক্রোবায়োম প্রকৌশলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মাটির উন্নয়ন করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক গবেষণায় অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের স্বাক্ষর (signature) ব্যবহার করে রোগ ও সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য অবস্থা নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন বিভিন্ন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট মাইক্রোবায়োম প্রোফাইল শনাক্ত করতে পারছেন। যেমন আলঝেইমার, পারকিনসন্স ডিজিজ, ক‍্যান্সার ও অটিজমের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ ডিসঅর্ডারগুলোর সঙ্গে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটার ভারসাম্যহীনতার (ডিসবায়োসিস) সম্পর্ক দেখা গেছে। এ অগ্রগতি ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার (personalized medicine) পথ খুলে দিচ্ছে, যেখানে ব্যক্তির মাইক্রোবায়োম প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে।

তোফাজ্জল ইসলাম: ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি, অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়