ট্রাম্প সরকার বাংলাদেশী পণ্য মার্কিন বাজারে প্রবেশের জন্য পাল্টা শুল্ক পূর্বনির্ধারিত ৩৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। আগের চেয়ে কমলেও বাড়তি শুল্কের হাত থেকে অর্থনীতির সুরক্ষায় তিনটি কাজ আবশ্যক। প্রথমত, ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে যাতে শুল্কহার আরো কমিয়ে আনা যায়। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য রক্ষা এবং চ্যালেঞ্জের মুখে বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম উপায় হলো উৎপাদনের জন্য অভিনব পদ্ধতি অনুসরণ ও উৎপাদন খরচ হ্রাস। শ্রমিকের বেতন না কমিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। গত বছরের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আমরা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ রফতানি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পেরেছি। এর কারণ আমাদের উদ্যমী জনশক্তি ও শ্রমিক রয়েছে। উদ্যোক্তারাও খুব পরীক্ষিত। চীনা পণ্যের ওপরও ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। চেষ্টা করা উচিত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো ক্রয়াদেশ আমাদের দিকে আনা যায় কিনা। সেজন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করতে হবে সক্ষমতা বাড়িয়ে উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধির।
এরই মধ্যে কিছু কারখানা উৎপাদনশীল ও উৎপাদন সক্ষম আধুনিক মেশিন এনে তিন-চার গুণ উৎপাদন বাড়িয়েছে। তাইওয়ানিজ ও ইতালির নতুন মেশিন আনার ফলে তাদের উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি সেসব পণ্যের জন্য বা ভিন্ন এইচএস কোডের পণ্যের জন্য তারা একটু বেশি দামও পাচ্ছে। এটা যদি আরো বাড়ানো যায়, পোশাক শিল্প খাতকে যদি আরো সক্রিয় করা যায় তাহলে আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে। সেই সঙ্গে ভ্যালু চেইনের বড় বাজারে পণ্য প্রবেশ করতে পারলে আমাদের আয় বাড়বে।
আরেকটি কথা বলতেই হয়, শুধু পোশাক শিল্প দিয়ে আমরা বেশি কিছু করতে পারব না। আমাদের প্লাস্টিকজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন ও রফতানিও বাড়াতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাস করা। তাই শুরুতে তারা যতটুকু বাণিজ্য বৈষম্য রয়েছে তার অর্ধেক শুল্ক ধার্য করেছিল। যে কারণে আমাদের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল প্রথমে। এখন যে এটি ২০ শতাংশে নেমে এসেছে তা অনেকটা স্বস্তির।
আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে পারি। সেটি সরকার বিবেচনাও করছে। উড়োজাহাজ, তুলা, গম ও ভোজ্যতেল আমদানির কথা চিন্তা করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে পাল্টা শুল্ক নিয়ে দরকষাকষির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। আর অভিনব শিল্প খাতের জন্য আমরা কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারি কিনা সেগুলো বিবেচনায় রয়েছে। তবে এটাকে বিবেচনার মধ্যে না রেখে সত্যিকার অর্থেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনকে আমাদের দেখাতে হবে আমরা সত্যিই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানো যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন আমাদের স্বার্থ চরমভাবে বিঘ্নিত না হয়।
ভারত, চীন কিংবা অন্যান্য অপরাপর পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমাদের আমদানি করার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামগ্রিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত নতুন শুল্কহার নিয়ে দরকষাকষির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভালো কাজ করেছে। তবে দরকষাকষির ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষতা আরো কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকেও নজর দিতে হবে। স্পষ্টভাবে আমাদের কথাগুলো বলা, শ্রমিকদের কথা বলা, শ্রমিকদের বিশেষ করে গরিব নারী শ্রমিকদের মাঝে আরো শান্তি-প্রশান্তি নিশ্চিত ও দক্ষতা বাড়ানোর দিকে জোর দেয়া প্রয়োজন।
আপাতত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি প্রধান উপদেষ্টাকে লিখিত ট্রাম্পের চিঠির দ্বিতীয় অংশে যা লেখা হয়েছে সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থবিরোধী কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর সঙ্গে যদি আমরা (বাংলাদেশ) বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে ফেলি, সেক্ষেত্রে তারা সে দেশ বা গোষ্ঠীকে বাধ্য করবে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের জন্য।
ট্রাম্প যদি শুল্ক কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেন তাহলে সেটি আমাদের পক্ষে থাকার কথা নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আগে চেয়েছিল আমরা যেন কোয়াডের সদস্য হই। আমরা কিছুটা হলেও কোয়াডভুক্ত এবং কোয়াড-বহির্ভূত দেশের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পেরেছি। অর্থাৎ ভারত হচ্ছে কোয়াড এবং নন-কোয়াড দেশ চীন। আবার কোয়াডের বৃহত্তর সদস্য রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। সেক্ষেত্রে আমরা ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়লে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাদের শাস্তি দেবেন কিংবা শুল্ক বাড়িয়ে দেবেন কিনা এবং এক্ষেত্রে আমরা কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখব সেটি ভাবতে হবে।
শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে চীনের ওপর আমাদের ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে। আবার আমাদের পাশের দেশ ভারতও আমদানি বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের জন্য। এছাড়া আমাদের শিল্প খাতের জন্য তাইওয়ানও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে আমাদের সর্ববৃহৎ রফতানি বাজার। তাই তাদের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সেজন্য বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দরকষাকষির সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। ভালো কর্মকর্তাদের আরো বেশি দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, তাদের প্রণোদিত ও উৎসাহিত করে আরো বেশি আলোচনা সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। জ্ঞানী ও যুক্তিশীল লোকজনকে এ ধরনের মন্ত্রণালয়ে যেন নিয়োজন করা হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের মন্ত্রণালয় যাতে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী স্বার্থ এমনকি গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
সর্বোপরি সবচেয়ে জরুরি হলো রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশ ও বৈচিত্র্যায়ণ। এজন্য প্রয়োজন রফতানিমুখী শিল্প কলকারখানা আরো আধুনিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, রফতানি ও আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনা, শ্রমিকের পেটে লাথি না মেরে দক্ষ শ্রমিককে আরো প্রণোদিত করা। পাশাপাশি কীভাবে শ্রমিকদের রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে উৎসাহিত করে উৎপাদনের চাকা সচল রাখতে সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করা যাবে সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এবং এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদেশী কর্মী এনে আমাদের নতুন মেলবন্ধন সৃষ্টি করতে হবে। এগুলো যদি আমরা করতে পারি তাহলে আশা করা যায় দেশের অর্থনীতি ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত উচ্চ শুল্কহারের হাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাবে। অপেক্ষাকৃত কম শুল্কের ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে আমরা আগেও প্রতিযোগিতা করেছি, এখন আরো জোরেশোরে এগিয়ে যেতে হবে।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক










